সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বুয়েটে ছাত্রলীগের প্রস্তুতি, না-তে অটল শিক্ষার্থীরা

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৪, ০২:০১ এএম

হাইকোর্টের আদেশে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্ররাজনীতিতে বাধা কাটার পরদিনই কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ছাত্রলীগ। বুয়েট শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ইমতিয়াজ হোসেন রাহিম রাব্বীর হলের আবাসিকতা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে বুয়েট শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচিসহ গতকাল মঙ্গলবার চারটি কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনটি। অন্যদিকে ক্যাম্পাসকে ছাত্ররাজনীতিবিহীন রাখতে এখনো অনড় অবস্থানে বুয়েটের সাধারণ  শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়কে ছাত্ররাজনীতি মুক্ত রাখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর খোলা চিঠি দিয়েছেন তারা। যাতে প্রয়োজনে আইন সংস্কার করে হলেও বুয়েটকে ছাত্ররাজনীতির বাইরে রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মধুর ক্যান্টিনে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসাইন বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি ফেরানো সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তাদের বাকি তিন কর্মসূচি হলো আধুনিক, স্মার্ট, পলিসিনির্ভর নিয়মতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতি প্রতিষ্ঠার কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণে বুয়েট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতামত আহ্বান ও আলোচনা; সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী-জঙ্গি কালো ছায়া থেকে বুয়েটকে মুক্ত করতে সেমিনার ও সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজন এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে বুয়েটে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা। তবে এসব কর্মসূচির নির্ধারিত কোনো তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে সাদ্দাম হোসাইন বলেন, ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ গভীরভাবে মনে করছে, বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে আজকের দিনটি একটি ঐতিহাসিক দিন। বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি পুনরায় শুরু হবে। কিন্তু সেটি কোন ছাত্ররাজনীতি তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। এ রাজনীতি অবশ্যই ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ, সেশনজট, র‌্যাগিং-বুলিং, দখল-বাণিজ্য, হত্যা-সন্ত্রাসের ছাত্ররাজনীতি নয়। এই ছাত্ররাজনীতি হবে আধুনিক, যুগোপযোগী, বৈচিত্র্যময়-সৃষ্টিশীল, জ্ঞান-যুক্তি-তথ্য-তত্ত্বনির্ভর। আমাদের সামগ্রিক ছাত্ররাজনীতি কোনোভাবেই পশ্চাৎপদ ধারায় পরিচালিত হতে পারে না। আধুনিক নিয়মতান্ত্রিক ধারার ছাত্ররাজনীতির সূচনা যে বুয়েট থেকেই শুরু হতে যাচ্ছে, বুয়েটের শিক্ষার্থীরাই যে পুরো ছাত্ররাজনীতির খোলনলচে বদলে যাওয়ার পথ দেখাতে যাচ্ছে, আজ সেই শুভ উপলক্ষের উদ্বোধন।’

ছাত্ররাজনীতির মডেল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ছাত্রলীগ বুয়েটকে গ্রহণ করবে উল্লেখ করে সংগঠনটির সভাপতি বলেন, ‘বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি ফিরিয়ে এনেই শুধু ছাত্রলীগ তার দায়িত্ব শেষ করবে না। দেশরত্ন শেখ হাসিনার পরিকল্পিত আগামী দিনের উন্নত, স্মার্ট বাংলাদেশে উন্নত ও স্মার্ট ছাত্ররাজনীতি উপহার দেওয়ার জন্য মডেল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ছাত্রলীগ বুয়েটকে গ্রহণ করবে। এই ঐতিহাসিক যাত্রায় বুয়েটের সব শিক্ষার্থীকে সহযোগিতার সংকল্প নিয়ে পাশে থাকার আহ্বান জানাচ্ছে ছাত্রলীগ। একই সঙ্গে ছাত্রলীগ প্রগতিশীল সব ছাত্র সংগঠনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে, আসুন গৎবাঁধা ধারা বাদ দিয়ে আধুনিক, উন্নত ছাত্ররাজনীতির চর্চা শুরু করুন বুয়েট থেকেই। সুন্দর, স্বনির্ভর, সম্মানজনক ভবিষ্যৎ গড়তে আজকের প্রজন্ম আর কালক্ষেপণ করবে না, এটিই ছাত্রলীগের আহ্বান।’

এদিকে আগের কয়েক দিনের ধারাবাহিকতায় গতকালও ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত ছিলেন বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বিকেলে বুয়েট প্রশাসনিক ভবনের সামনে ছাত্ররাজনীতি না ফেরাতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর খোলা চিঠি পড়ে শোনান তারা।

ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি আমাদের অভিভাবক। যারা নিজেদের মেধা ও শ্রমের সবটুকু দিয়ে বিজ্ঞানের অবাক করা দুনিয়ার একটা অংশের নেতৃত্বে বাংলাদেশকে দেখতে চায়, আমরা ত্রাসের রাজনীতির মারপ্যাঁচ বুঝি না, আমরা শুধু দেশকে, দেশের মানুষকে ভালোবাসতে জানি। নিজেদের কাজ দিয়ে তা আমরা প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর। বিগত বছরগুলোতে আমরা বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির নামে ক্ষমতার নেতিবাচক দিকগুলোই প্রত্যক্ষ করেছি। র‌্যাগিং, শিক্ষকদের অপমান, চাঁদাবাজি, শিক্ষার্থী নিপীড়ন, খুনোখুনিতে মেতে ওঠার মতো ঘটনা এবং এর ব্যাপ্তি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, এর চরমতম মূল্য হিসেবে আমরা আমাদের সাবেকুন্নাহার সনি আপু, আরিফ রায়হান দ্বীপ ভাই এবং সর্বশেষ আবরার ফাহাদ ভাইকে হারিয়েছি। শুধু আবরার ফাহাদ ভাই হত্যাকাণ্ডই নয়, এর পূর্ববর্তীতেও অসংখ্য শিক্ষার্থী র‌্যাগিংয়ের দ্বারা কিংবা ছাত্ররাজনৈতিক দাপটের দ্বারা অমানুষিকভাবে নিপীড়িত হওয়ার ঘটনা রয়েছে। কিন্তু ছাত্ররাজনীতিবিহীন বুয়েটের পরিবেশ ছিল সর্বোচ্চ নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব। মৌলবাদী শক্তিকেও রুখে দিতে আমরা ঐক্যবদ্ধ।’

চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হওয়ার পর থেকে আজ অবধি প্রতিটি জাতীয় দিবস সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনপূর্বক আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করে আসছি। আমরা ছাত্ররা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের জাতীয় মূল্যবোধ ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মনে-প্রাণে ধারণ করি। দেশের গৌরবময় ইতিহাস, ত্যাগ-তিতিক্ষা আমরা অন্তরে লালন করি, ভবিষ্যতে পথচলায় অনুপ্রেরণা নেই। আমরা বিশ্বাস করি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতীয় মূল্যবোধ, দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ আমাদের সবার জন্যই প্রযোজ্য এবং একান্ত পালনীয়। আমরা সাংগঠনিক রাজনীতির ঊর্ধ্বে এসেই এ সচেতনতা রাখি। অথচ অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কতিপয় ব্যক্তি বা গণমাধ্যমের তৎপরতায় ছাত্ররাজনীতিবিহীন বুয়েট ক্যাম্পাসকে জাতীয় চেতনার বিরোধী মতাদর্শের স্থান হিসেবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। বিষয়টিতে আমরা অত্যন্ত ব্যথিত।’

প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়ে শিক্ষার্থীরা চিঠিতে বলেন, ‘আমাদের চাওয়া, বুয়েটকে ঘিরে আমাদের জাতির পিতার যে ভিশন (স্বপ্ন) ছিল, তা বাস্তবায়ন করা হোক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন বুয়েটের প্রকৃতি ভিন্ন। তাই তিনি নিজে রাজনীতির আওতা থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে বাইরে রেখেছিলেন। আজ যখন তারই গড়ে তোলা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা বুয়েটের মতো বিশেষায়িত একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে যেকোনো মূল্যে রাজনীতির আওতায় আনার কথা বলে, আমরা বিশ্বাস করি তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও সিদ্ধান্তকে অপমান করা হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার প্রতি আমাদের আকুল আবেদন, বুয়েটকে নিয়ে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, যে পলিসি (নীতি) গ্রহণ করেছিলেন, তার বাস্তবায়ন করুন। বুয়েটকে ছাত্ররাজনীতির বাইরে রাখুন, প্রয়োজনে আইন সংস্কার করে হলেও। কারণ সুবিচারের জন্যই আইনের সৃষ্টি। আমাদের অনুরোধ, আপনি দয়া করে আমাদের ক্যাম্পাসে আসুন; ছাত্ররাজনীতিহীন বুয়েট গত কয়েক বছর ধরে শিক্ষার্থীদের জন্য আদর্শ ক্যাম্পাস হয়ে উঠেছে, সেটা আমরা আপনাকে দেখাতে চাই। আমরা আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আমরা প্রযুক্তিবিদ্যায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পেছনে ফেলে দেব খুব শিগগিরই।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত