শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কাঠগড়ায় ঘরোয়া ক্রিকেট

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৪, ০১:৪৩ এএম

ঘরোয়া ক্রিকেটের না আছে মান। নেই কোনো জৌলুশ। তাই দর্শকদের মধ্যেও দেখা যায় না কোনো আগ্রহ। তেমনি ক্রিকেটারদের কাছেও তা দায়সারা নিয়মরক্ষার প্রতিযোগিতা। ক্রিকেটাররা শুধু খেলেই নিজের দায়িত্বটা শেষ বলে ধরে নেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বাড়তি কোনো চাপ কাজ করে না। ফলে পারফরম্যান্সের উন্নতিতেও খুব একটা প্রভাব ফেলে না তা। টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের মান বাড়াতে কিংবা অবস্থান শক্ত করতে হলে, এখানেই জোর দিতে হবে। বাড়াতে হবে আকর্ষণ। যেন ক্রিকেটাররাও খেলতে নেমে চাপ অনুভব করেন। ক্রিকেটার-সংগঠক ও কোচদের সঙ্গে আলোচনা করে এমন প্রেসক্রিপশনই পাওয়া গেছে।

হঠাৎ করে ঘরোয়া ক্রিকেটের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কারণ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে ঘরের মাঠে বাংলাদেশের হতশ্রী পারফরম্যান্স। দুই টেস্টের কোনোটিতেই লড়াই করতে পারেননি ব্যাটসম্যানরা। বোলাররা তাও একটু লড়াইটা জমিয়ে তুলেছিলেন, তবে ফিল্ডারদের ব্যর্থতায় সেখানের পরিসংখ্যানটাও হতাশার। স্বাগতিক ক্রিকেটারদের দেখে যেন মনে হয়েছে মানসিকভাবে দুর্বল একটি দল। টেস্ট ক্রিকেট খেলার মানসিকতা তাদের নেই।

নতুন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকে দেখে মনে হয়েছে হালভাঙা জাহাজের নাবিক।

দুই টেস্টের চার ইনিংসের একটিতেও নেই উল্লেখযোগ্য কোনো অবদান। সবশেষ ৬ টেস্ট ইনিংসে তার সাকুল্যে সংগ্রহ ৫৬। অথচ তার আগের চার ইনিংসের তিনটিতেই ছিল সেঞ্চুরি। শুধু তিনি একাই নন, বাকিরাও একইভাবে করেছেন হতাশ। মাহমুদুল হাসান জয়, জাকির হাসান, শাহাদাত হোসেন দীপুরা। প্রায় এক বছর পর টেস্ট খেলতে নামা সাকিব আল হাসানও করতে পারেননি নামের প্রতি সুবিচার। শেষ ইনিংসে মেহেদী হাসান মিরাজ ৮১ রানের একটা অপরাজিত ইনিংস খেলেছেন। তবে যোগ্য সঙ্গী না থাকায় ইনিংসটা বড় করতে পারেননি। যদিও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ফিফটিকে সেঞ্চুরিতে রূপ দিতে পারেননি মুমিনুল হক। ৫৬ বলে ৫০ করে ফিরে গিয়েছিলেন তিনি।

চতুর্থ দিনেই থেমে গিয়েছিল তার ইনিংস। পরে সংবাদ সম্মেলনে এসে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের প্রসঙ্গ টেনে আনেন মুমিনুল। যার ধারা গতকাল ম্যাচ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও। সেদিন মুমিনুল বলেছিলেন, ‘আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেট ও টেস্ট ম্যাচ খেলার মধ্যে অনেক পার্থক্য। আকাশ-পাতাল তফাৎ। আমি নিজেও জাতীয় লিগ খেলি। এখানে (টেস্টে) যে ধরনের চ্যালেঞ্জ সামলাতে হয়, সেখানে তা হয় না। আমি সততার জায়গা থেকে কথাগুলো বলছি।’

শান্ত গতকাল বললেন, ‘একজন খেলোয়াড় হিসেবে আমাদের যেকোনো পরিস্থিতির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। তবে আমরা যদি আরও বেশি প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেট খেলি তাহলে তা আমাদের কাজে আসবে।’

যদিও বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডের একটা ক্যালেন্ডার আছে। নিয়ম করে প্রতি বছর আয়োজিত হয় জাতীয় ক্রিকেট লিগ (এনসিএল)। সেটার পর আবার আয়োজন করা হয় লাল বলের ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট। বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ (বিসিএল) নামের সেই টুর্নামেন্টও হয় নিয়মিত। তাহলে বেশি খেলার তাগিদ কেন শান্তর? কারণ ম্যাচ সংখ্যাটা যে বছরে মাত্র ২৪টি। তাও আবার দুটি প্রতিযোগিতা মিলিয়ে।

এসব প্রতিযোগিতায় আবার ক্রিকেটারদের দেখা যায় দায়সারা মনোভাব নিয়ে খেলতে। দেখে মনে হয়, তারা ধরেই নেন উইকেট হবে স্পিন সহায়ক। ম্যাচের ফল স্পিনাররাই গড়ে দেবে। ব্যাটারদের কাজ শুধু যেন যাওয়া-আসা। শুধু বাজে বল পেলে কয়েকটা চার-ছক্কা মেরেই অবিবেচক শটে আউট হয়ে ফিরে আসা। ব্যাটারদের মধ্যে সেই চাপটাই দেখা যায় না। যে স্পিনাররা এত এত উইকেট শিকার করেন, তাদেরও তেমন কোনো ভেলকি দেখাতে হয় না।

মুমিনুলের এই কথার সূত্র ধরেই ক্রিকেটারদের গুরু ও বিকেএসপির ক্রিকেট উপদেষ্টা নাজমুল আবেদীন ফাহিম মনে করেন ক্রিকেটারদের চাপ নেওয়ার মানসিকতাই তৈরি হয়নি। ‘পুরো সিরিজেই ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স হতাশাজনক। বিশেষ করে ব্যাটসম্যানরা। তাদের শট সিলেকশন, খেলার ধরন সবকিছু দেখে মনে হয়েছে টেস্ট ক্রিকেট খেলার যে মানসিকতা, সেটায় দুর্বলতা রয়েছে তাদের মধ্যে।’

এর কারণ জানতে চাইলে তিনিও বলেন, ‘প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের এই পরিবেশটা তারা পায় না। সেখানে ম্যাচ খেলে তারা যে যার মতো বাড়ি ফিরে যায়। কেউ খবরও রাখে না। তাই তাদের মধ্যে ঐ অ্যাকাউন্টেবিলিটি জাগ্রত হয় না। কিন্তু জাতীয় দলে তো সেই সুযোগ নেই। এখানে চুন থেকে পান খসলেই চারদিক থেকে ধেয়ে আসবে সমালোচনা। ঘরোয়া ক্রিকেটের মান ঐ পর্যায়ে নিয়ে গেলে ক্রিকেটাররাও চাপ নিতে শিখে যাবে।’

টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের অভিষেকের দুই যুগ হতে চলেছে। এখনো ঘরোয়া ক্রিকেটের মান নিয়ে তোলা হয় প্রশ্ন। বাইরে থেকে কোচ সংগঠকরা সবসময় কথা বলেন, যদিও তা বিসিবি খুব একটা গায়ে মাখে না। তবে এবার মুখ খুলেছেন টেস্ট ক্রিকেটের সাবেক ও বর্তমান অধিনায়ক। অভিজ্ঞ দুই ক্রিকেটারের কথাকে অবশ্য গুরুত্ব দিচ্ছেন বিসিবির প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু। তিনি বলেছেন, ‘মুমিনুল অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। তার মতামতের অবশ্যই গুরুত্ব দেওয়া হবে। আমরা অবশ্যই ক্রিকেটারদের সঙ্গে আলোচনা করব। কোথায় উন্নতির প্রয়োজন দেখে তারা সেটা জানার চেষ্টা করব। এটা তো সত্যি জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা ঘরোয়া টুর্নামেন্টে খেলেন না। তাই মানের একটা তফাৎ আছে। তারাও কীভাবে খেলতে পারে সেটা নিশ্চয়ই ক্রিকেট অপারেশনস ভাববে বলে আমি মনে করি। তবে লঙ্গার ভার্সন ক্রিকেটের বেসিক কিছু বিষয় আছে, শট সিলেকশন, টেম্পারমেন্টের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। এসব করতে পারলে এখানে সফল হওয়া সম্ভব।’

আর বিসিবির পরিচালক ও টুর্নামেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান আহমেদ সাজ্জাদুল আলম বলেন, ‘ঘরোয়া ক্রিকেটে আমরা ক্রিকেটারদের বেতন-পুরস্কার অর্থ, আম্পায়ারদের মানোন্নয়ন, বলসহ সব কিছুতে পরিবর্তন এনেছি। বাকি খেলার যে মান সেটা ক্রিকেটাররাই তো মাঠে করে দেখাবে। তবে এটা ঠিক এখনো অনেক কিছু বাকি আছে যে কারণে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আকর্ষণীয় হচ্ছে না। এটা আকর্ষণীয় করতে পারলে ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সেও উন্নতি হবে।’

ঘরের মাঠে টেস্ট ক্রিকেটে লঙ্কাকাণ্ডের পর ক্রিকেটাররা যেমন অকপটে সব বলেছেন, তেমনি বিসিবিরও সরল স্বীকারোক্তি। এখন সেগুলোর বাস্তবায়ন হলেই হলো। নয়তো গাইতে হবে সেই পুরনো গান।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত