অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিদেশি পুঁজি

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:০০ এএম

দেশের অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় এবং বিনিয়োগের জন্য পুঁজির অপ্রতুলতা থাকায়, বিপুল শ্রমিক শক্তির জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, দেশীয় কাঁচামালের কার্যকর ব্যবহারকল্পে উপযুক্ত প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি আমদানির দ্বারা উৎপাদন কৌশল জানা, আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানিমুখী শিল্পোদ্যোগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ ও রূপান্তরে বাংলাদেশ বিদেশি পুঁজি প্রত্যাশী। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রত্যাশা ও সম্ভাবনা সেই সত্তরের দশক থেকে। সত্তরের দশকের প্রথমার্ধে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনকালে প্রাইভেট সেক্টরের ওপর পাবলিক সেক্টরের প্রাধান্য ও নিয়ন্ত্রণ বলবত ছিল, দ্বিতীয়ার্ধে রাজনৈতিক পটপরির্তন ও স্থিতিশীল পরিস্থিতি প্রেক্ষাপটে শিল্পোদ্যোগে পাবলিক সেক্টরের নিয়ন্ত্রণ শিথিল এবং আধিপত্য হ্রাস পেতে থাকে। ১৯৮০-৮১ সালে সরকার প্রাইভেট সেক্টরের উন্নয়ন লক্ষ্যে নয়া শিল্পনীতিতে কিছু মৌল পরিবর্তন আনেন। উল্লেখ্য, এ সময় ১৯৮০ সালেই ফরেন ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন অ্যান্ড প্রটেকশন অ্যাক্ট জারি হয়। বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনস অথরিটি (বেপজা) অ্যাক্টও পাস হয় এ সময়। এতদসত্ত্বেও আশির দশকে বিদেশি বিনিয়োগ তেমন আসেনি বাংলাদেশে। পুরো দশকে ইপিজেডের বাইরে বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয় মাত্র ৪০৪ মি. মা. ডলার।

সত্তর ও আশির দশকে অর্থনৈতিক সাহায্য হিসেবে বাংলাদেশে বিদেশি ঋণ ও অনুদান এসেছে মূলত পাবলিক সেক্টরের জন্য। প্রাইভেট সেক্টরের পুঁজির প্রয়োজনীয়তা ও তার চাহিদা সৃষ্টি হয় আশির দশকের শেষ ভাগে। প্রাইভেট সেক্টরের বিকাশ শুরু হলে এবং বিদেশি পুঁজি প্রবেশের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সুযোগ-সুবিধার সমাহার ঘটানোর নীতিমালা ঘোষিত হলে, বিনিয়োগ বোর্ড অ্যাক্ট, ১৯৮৯ বলে প্রতিষ্ঠিত পোশাক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ বোর্ডের কার্যক্রম শুরু হলে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া ও বাজার অর্থনীতির অবগাহনে বাংলাদেশে সিক্ত হলে, এশীয় উন্নয়ন দেশগুলো বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব ও দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোর উন্নয়নের নতুনধারা সূচিত হলে (যা এশিয়ান মিরাকল নামে খ্যাত) বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ উৎস ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিভাত হয়।

বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে নীতিমালা ঘোষিত হয় তাতে বলা হয় (১) বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করা হবে ওই সব খাতে বা ক্ষেত্রে যেসব শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থা বাংলাদেশে নেই অথচ যা বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয়, (২) বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করা হবে বাংলাদেশে বিদ্যমান ওই জাতীয় শিল্পে উৎপাদন ব্যবস্থার অধিকতর বিকাশ ঘটানোর জন্য, যা সামাজিক প্রয়োজন ও চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল বিদ্যমান এবং (৩) বিদেশি বিনিয়োগে সেই শিল্প প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ ও সহায়তা প্রদান করা হবে, যা অবদান রাখতে সক্ষম :

(ক) দেশে পুঁজি, প্রযুক্তি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা বৃদ্ধিতে

(খ) প্রাকৃতিক সম্পদের অনুসন্ধান, জরিপ ও আহরণে

(গ) বাংলাদেশের ব্যালান্স সব পেমেন্ট পরিস্থিতির উন্নয়নে

(ঘ) বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে এবং

(ঙ) অন্য যে কোনো উপায়ে দেশের অর্থনীতির সার্বিক বিকাশ সাধনে।

নীতিমালায় বলা হয়, দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তা বা উৎপাদন উদ্যোগে যেসব সুুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিধান দেওয়ার ব্যবস্থা অনুসরণ করা হবে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই সুুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তার বিধান থাকবে এবং এ ব্যাপারে কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব ও বৈষ্যম্যমূলক আচরণ করা হবে না। বিদেশি বিনিয়োগকে অধিকতর আকর্ষণের লক্ষ্যে ইকুইটি শেয়ারের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার মাত্রা বেঁধে না দেওয়া এবং লভ্যাংশসহ পুরো পুঁজি প্রত্যাবাসনের অবাধ সুযোগ ঘোষিত হয়। মাত্র ৫টি খাত বাদে সব খাতে দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়ার সুযোগও ঘোষিত হয়। বিদেশি প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় বিদেশি বিশেষজ্ঞ কর্মীদের জন্য কর রেয়াতসহ সহজ শর্তে ওয়ার্ক পারমিট প্রদানের সুযোগ রাখা হয়। রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের মেশিনারি ও কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক মওকুফের ব্যবস্থা ঘোষিত হয়। দেখা যায়, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেসরকারি খাতে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ঘোষিত সুযোগ-সুবিধাদি বেশি এবং অধিকতর উদার।

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের পোশাক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনস অথরিটি (বেপজা), বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট, বর্তমানে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি (বাইডা), বাংলাদেশ ইকোনমিক জোনস অথরিটি (বেজা), বাংলাদেশ স্মল অ্যান্ড কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিক) দায়িত্ব পালন করে থাকে। সংস্থা তিনটি দেশি-বিদেশি নির্বিশেষ বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বিষয়গুলো দেখাশোনাসহ বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ এবং সরকারের শিল্প ও বিনিয়োগ নীতির কর্মকৌশল বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে, দায়িত্ব পালন করে থাকে। বিসিক একটি স্বায়ত্তশাসিত সরকারি সংস্থা পক্ষান্তরে, বেপজা, বেজা ও বাইডা স্ব স্ব অ্যাক্টের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর অধীনে। প্রধানমন্ত্রী এ দুই সংস্থার চেয়ারম্যান এবং বোর্ড অর্থ, শিল্প, বাণিজ্য, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং সচিব, সংসদ সদস্য ও শিল্প ব্যবসায়ী বাণিজ্য সমিতিগুলোর প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত। বেপজা, বেজা ও বাইডা বোর্ড কর্তৃক কিংবা তাদের দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দ্বারা গৃহীত সিদ্ধান্ত সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা দপ্তরের ওপর আরোপিত এবং পরিপালনীয়। বেসরকারি খাতে দেশি-বিদেশি শিল্প উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদানের জন্য এবং দেশে বিনিয়োগ পরিবেশ পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান ও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংস্থা দুটি দায়িত্বপ্রাপ্ত। বিদেশি বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট নীতি নিয়মাবলি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সুযোগ-সুবিধা ও অন্যান্য সেবা প্রদান সংক্রান্ত বিষয়াবলি নিয়ন্ত্রণ/সম্পাদন বেপজা ও বিওআইর বিধিবদ্ধ দায়িত্ব। ফরেন ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন অ্যান্ড প্রটেকশন অ্যাক্টের আওতায় যাবতীয় বিষয়াদি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ দুই সংস্থা নীতিনির্ধারক মহলের সঙ্গে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে এবং শিল্প বাণিজ্য আমদানি-রপ্তানি নীতিমালার আলোকে বিদেশি বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত ও প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে পোশাক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করে থাকে।

বিদেশি বিনিয়োগের দ্বারা রপ্তানি বৃদ্ধি তথা ব্যালান্স অব পেমেন্ট পরিস্থিতির উন্নতির শুমারি করলে দেখা যায়, ইপিজেডে প্রতিষ্ঠিত বিদেশি বিনিয়োগ প্রকল্প থেকে রপ্তানি আয় স্বাভাবিক ও সহজভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সে মাত্রা আমদানি (কাঁচামাল) বাদ দিয়ে ভ্যালু এডিশনের ক্ষেত্রে খুব একটা উল্লেখজনক নয়। ১০০% রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর শুল্ক রেয়াত বাবদ রাজস্ব আয় ভর্তুকি দিয়ে প্রকৃত প্রাপ্তির হিসাব আরও নাজুক অবস্থায় দাঁড়ায়। ইপিজেডে প্রতিষ্ঠিত শিল্পকারখানাগুলোর শতকরা ৮৭ ভাগের উৎপাদনে কাঁচামাল ও খুচরা যন্ত্রপাতি আমদানিনির্ভর। ইপিজেড শিল্পগুলোর মধ্যে উল্লখযোগ্য সংখ্যক রেডিমেড গার্মেন্টস ইউনিট শিল্প, সেসব ক্ষেত্রে ২০০৫ সালে এমএফে রহিত হলে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা শুরু হলে বিদেশি বিনিয়োগ চলে যেতে পারে। যৌথ প্রতিষ্ঠান থেকে বিদেশি পুঁজি প্রত্যাহার হতে পারে, তখন দেশীয় বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত শিল্প প্রকল্পগুলোকে তীব্র প্রতিযোগিতার পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। ইপিজেড এ দেশীয় কাঁচামাল প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে রপ্তানিযোগ্য শিল্প এবং যা আরএমজির মতো আপাতত হুমকির সম্মুখীন নয় এমন শিল্পের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অর্থনীতির জন্য লাভজনক হতে পারে। উল্লেখ্য, সে জাতীয় শিল্পের সংখ্যা সীমিত। ইতিমধ্যে আরও ৫টি নতুন আঞ্চলিক ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। স্থানীয় কাঁচামাল ও শিল্প উদ্যোক্তাদের রপ্তানীমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী করে তোলা সম্ভবপর হলে ভালো হবে।

বিনিয়োগ বোর্ড বা বর্তমানে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটিতে (বিআইডিএ) নিবন্ধিত বিদেশি বিনিয়োগে রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানাগুলোর সিংহভাগই হলো রেডিমেড গার্মেন্টস সেক্টরে। হালে আইটি সেক্টরে বিদেশি বিনিয়োগ সংবলিত কিছু শিল্প নিবন্ধিত হয়েছে, কিন্তু তাদের রপ্তানির হিসাব সাধারণত দৃশ্যগোচর নয়। বাংলাদেশে বাকি বড় বড় বিদেশি বিনিয়োগ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সেক্টরে। আহরিত গ্যাসের প্রধান ক্রেতা বাংলাদেশ নিজে আর উৎপাদিত বিদ্যুতের ব্যবহারকারীও বাংলাদেশ। রপ্তানির আপাত সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার মতো শিল্প এসব ক্ষেত্রে নেই। সিমেন্ট শিল্পে ব্যাপক বিদেশি বিনিয়োগ হলেও তা দেশীয় বাজার দখলকে কেন্দ্র করে। অধিকন্তু সিমেন্ট শিল্পে ভ্যালু এডিশন নেই বললেই চলে। কাঁচামাল আমদানি উত্তর গুণগতমান বজায় রেখে সিমেন্ট বিদেশে রপ্তানি করার সম্ভাবনা সুদূর পরাহত মনে হতে পারে। ফিনিশড সিমেন্ট আমদানি ব্যয় হ্রাস পেলেও সিমেন্টের কাঁচামাল (জিপসাম ও ক্লিংকার) আমদানি ব্যয় তো থাকছেই। তবে আন্তর্জাতিক খ্যাতিস¤পন্ন একটি সিমেন্ট কো¤পানি সীমান্তের ওপার থেকে কনভেয়র বেল্টের মাধ্যমে ক্লিংকার তৈরির পাথর আনিয়ে স্টেট অব আর্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্লিংকার ও সিমেন্ট উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে সিমেন্ট শিল্পে স্বয়ম্ভর ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভাবনা উজ্জ্বলতর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও ইতিমধ্যে সেটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসায় লিস্টেড কোম্পানি হিসেবে হাইডেলবার্গ সিমেন্টের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রান্তরে।

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত