গাজীপুরের কাপাসিয়ায় প্রবাসীর স্ত্রীকে হাত-পা বেঁধে শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনায় বন্ধুসহ তার ভাইকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ঋণগ্রস্ত ভাই ঋণের টাকা পরিশোধ করতে বোনের ঘরে বন্ধুকে নিয়ে চুরি করার পরিকল্পনা করেন। এ সময় চিৎকার করলে হাত-পা বেঁধে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করে ঘরের থাকা টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করে নেয় তারা।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে গাজীপুর পিবিআইর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাকছুদের রহমান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কাপাসিয়া উপজেলার সিংহশ্রী ইউনিয়নের পূর্ব ভিটিপাড়া গ্রামের দক্ষিণ কোরিয়া প্রবাসী মো. মোশারফ হোসেনের স্ত্রী শাহনাজ বেগম শিমুর (৩৯) মরদেহ নিজ বসতঘর থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তার বাবা কাপাসিয়ার কুলগঙ্গা গ্রামের মো. সিরাজ উদ্দিন ব্যাপারী কাপাসিয়া থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এরপর গত বৃহস্পতিবার শিমুর ছোট ভাই মো. কামরুজ্জামান রুবেল (৩৬) ও শেরপুরের শ্রীবর্দী থানার মামদাবাড়ি গ্রামের আস্কর আলীর ছেলে মো. মিনাল ওরফে মিস্টারকে (২১) গ্রেপ্তার করে পিবিআই।
গাজীপুর পিবিআইর উপপরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. সালেহ্ ইমরান বলেন, ‘মরদেহ উদ্ধারের পরপরই কাপাসিয়া থানা পুলিশের পাশাপাশি গাজীপুর পিবিআইর একাধিক টিম মামলাটির রহস্য উদঘাটনে ছায়া তদন্তে নামে। গোয়েন্দা তথ্য ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত মূল আসামি মো. কামরুজ্জামান রুবেলকে বৃহস্পতিবার বিকেলে গাজীপুর মহানগরের গাছা থানা এলাকা থেকে ও পরে তার দেওয়া তথ্যমতে একই দিন মো. মিনাল ওরফে মিস্টারকে ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।’
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে এসআই ইমরান জানান, শিমুর ছোট ভাই রুবেল গাজীপুরে একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করতেন। পাঁচ মাস আগে রুবেল ওই চাকরি ছেড়ে দিলে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে অনেকের কাছ থেকে টাকা ঋণ করেন। ঋণে জর্জরিত রুবেল ঋণের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে বোন শিমুর বাসায় চুরির পরিকল্পনা করেন এবং অপর আসামি মো. মিনাল ওরফে মিস্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ঘটনার দিন বিকেলে মিস্টার জয়দেবপুর রেলস্টেশনে আসেন। এরপর রুবেল ও মিস্টার একটি ব্যাগের মধ্যে একটি সুইচ গিয়ার চাকু, প্লাস, গামছা, কেচি নিয়ে ট্রেনে করে শ্রীপুর স্টেশনে নামেন। সেখান থেকে অটোরিকশা ভাড়া করে বরমী পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় যান। সেখানে কিছু সময় অপেক্ষা করেন তারা। সেখান থেকে অটোরিকশা নিয়ে রাত ৮টার দিকে তারা বরামা ব্রিজ এলাকায় যান। পরে বরামা ব্রিজ পাড় হয়ে পায়ে হেঁটে তারা শিমুর বাড়ির সামনের আখ খেতে লুকান। রাত ১২টার দিকে রুবেল ও মিস্টার বাড়ির সীমানা প্রাচীরের ওপর দিয়ে ছাদে উঠেন। ছাদ থেকে সিমেন্টের টিন খুলে রান্নাঘরে প্রবেশ করেন। পরে রান্নাঘরের দরজা খুলে বাইরে এসে বাড়ির পেছনের খোলা জানালা দিয়ে বাঁশের লাঠি মাধ্যমে ভেতরের ছিটকানি খুলে ঘরের ভেতরে ঢুকেন। এ সময় শব্দ পেয়ে ঘুম ভাঙলে শিমু চিৎকার শুরু করলে মিস্টার সুইচ গিয়ার দেখিয়ে ভয় দেখান। কিন্তু চিৎকার না থামালে গামছা দিয়ে তার মুখ চেপে ধরেন মিস্টার এবং দড়ি দিয়ে হাত বাঁধার সময় রুবেলের দুই হাতে শিমুর হাতের নখের আঁচড় লাগে। রুবেলকে যাতে চিনতে না পারে সেজন্য চোখ, মুখ, গামছা দিয়ে বেঁধে ফেললে মিনালের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুরু করে শিমু। তখন আসামি মিস্টার মুখে আঘাত করেন এবং শিমুর বুকের ওপর বসে গলা চেপে ধরেন। এরপর রুবেল টেবিলের ড্রয়ার থেকে চাবি নিয়ে আলমারি খুলে স্বর্ণালংকার ও তিন হাজার টাকা, শিমুর মোবাইল ফোন নিয়ে নিয়ে রুবেল ও মিস্টার বাড়ির পকেট গেট দিয়ে বের হয়ে চলে যান। পরদিন সকালে রুবেল চাকু, প্লাস ও মোবাইল সেট ভেঙে ঝাজর এলাকায় ব্রিজের নিচে খালের পানিতে ফেলে দেয় এবং লুণ্ঠিত স্বর্ণালংকার দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করেন। রুবেলকে গ্রেপ্তারের পর স্বর্ণ বিক্রির ৫৭ হাজার টাকা উদ্ধার ও তার দেওয়া তথ্যমতে গাজীপুর মহানগরের ঝাজর কবরস্থান ব্রিজের নিচের খাল থেকে প্লাস, সুইচ গিয়ার চাকু ও মোবাইল সেটের খন্ডিত অংশ উদ্ধার করা হয়।
গাজীপুর পিবিআইর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাকছুদের রহমান বলেন, নিহতের ভাই রুবেল ও মিস্টার স্বেচ্ছায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। স্বর্ণ বিক্রির অবশিষ্ট টাকা ও স্বর্ণ উদ্ধারে অভিযান চলছে।
