অতিগরমে মায়েদের ঝুঁকি

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:০২ এএম

বিশ্ব জুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ঝুঁকি বাড়াচ্ছে গর্ভবতীদের। সাম্প্রতিক কিছু জরিপে উঠে এসেছে এমন তথ্য। বিভিন্ন প্রতিবেদন অবলম্বনে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

পৃথিবী আবার উষ্ণ হচ্ছে। প্রতি বছরই যেন উষ্ণতা মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এমনকি শতাব্দীকাল পেরিয়ে যাচ্ছে তাপমাত্রার রেকর্ড। এমন পরিস্থিতিতে আবার মানুষ বন উজাড় করছে, জলাশয় দখল করছে। ফলে প্রতি বছর প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রকট হয়ে উঠেছে। আমেরিকা, আফ্রিকা বা এশিয়ায় জলবায়ু বিপর্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে শারীরিক সংকট বাড়ছে মানুষের। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা বলছে, গর্ভবতীদের সংকট এ ক্ষেত্রে বেশি। বিবিসি জানায়, সর্বশেষ ভারতে পরিচালিত নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচণ্ড গরমে কাজ করা গর্ভবতী নারীদের মৃতপ্রসব এবং গর্ভপাতের ঝুঁকি দ্বিগুণ হচ্ছে। আফ্রিকার কিছু দেশে একই চিত্র পাওয়া গেছে গত বছরের শেষ দিকে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনেও। এ ধরনের সংকটে পড়ছে শীতপ্রধান যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যেও। যদিও খবরে জানা যাচ্ছে, নারীদের সুরক্ষায় বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে তারা।

গবেষণায় দেখা গেছে, তাপপ্রবাহের সময় অকাল জন্ম এবং মৃতপ্রসবের ঝুঁকি প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষকরা বলছেন, যুক্তরাজ্যে গ্রীষ্মকাল আরও গরম হয়ে উঠছে এবং গর্ভাবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব অনেক কম তাপমাত্রার দেশেও দেখা যাচ্ছে। এ শতাব্দীর শেষ নাগাদ পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় তিন ডিগ্রি বাড়বে বলে অনুমান করছেন গবেষকরা। বিষয়টি মাথায় রেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গর্ভবতীদের প্রতি বিশেষ সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, ‘আমাদের সবার জন্য এটি অস্তিত্বের হুমকি’।

উচ্চ তাপমাত্রার যে প্রভাব

উচ্চ তাপ সব মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে গর্ভবতীদের জন্য এ পরিস্থিতি বিপজ্জনক। গবেষকরা এর কারণ হিসেবে বলছেন, গর্ভধারণের পর থেকে নারীর শরীরে স্বাভাবিকের তুলনায় কিছু বেশি তাপ থাকে। তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে শরীরের বিভিন্ন উপাদান বা অঙ্গকে পরিশ্রম করতে হয়। এ অবস্থায় যদি খুব গরম পড়ে তাহলে শরীরের সেসব অঙ্গকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। যার ফলে গর্ভবতীরা পানিশূন্যতা এবং হিটস্ট্রোকের ঝুঁকিতে থাকেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে আর্দ্রতা থাকলে গর্ভাবস্থার ফলাফল আরও খারাপ হবে। উচ্চ আর্দ্রতা ঘামকে অনেক কম বাষ্পীভূত হতে দেয়। তাই প্রাকৃতিকভাবে শরীর শীতল হওয়ার ব্যবস্থা কাজ করে না। লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের মহামারী বিশেষজ্ঞ সারি কোভাটস বলেন, গর্ভধারণের প্রথম দিকে যদি অতিরিক্ত গরম থাকে, তাহলে সন্তানের জন্মগত ত্রুটি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এ কারণে গর্ভবতীদের উষ্ণ গোসলে নিষেধ করা হয়। 

গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবেশের প্রভাবে ত্বকের তাপমাত্রাও বৃদ্ধি পায়। তখন শরীরের তাপ হ্রাসের জন্য ত্বকের কাছাকাছি রক্ত প্রবাহ বাড়ে। তবে এর ফলে প্লাসেন্টায় (জরায়ু বলা হয়, যেখানে ভ্রুণ বিকশিত হয়) রক্ত প্রবাহ হ্রাস পায়। যার কারণে ভ্রুণ পর্যাপ্ত অক্সিজেন এবং পুষ্টি নাও পেতে পারে। এতে শিশুর বৃদ্ধি সীমিত হয়। অতি গরম ‘প্রিক্ল্যাম্পসিয়া’ নামে আরেকটি উচ্চ রক্তচাপের জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। যা গর্ভাবস্থায় হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে এবং এটি হলে মা ও শিশু উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক।

স্ট্যানফোর্ড হেলথ কেয়ার ট্রাই-ভ্যালি হাসপাতালের চিকিৎসক লিসা প্যাটেল বলেন, গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রসূতি এবং স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের রোগীদের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত। তিনি নিজে বিগত বছরগুলোতে গ্রীষ্ম আসতে শুরু করলেই এ বিষয়ে প্রস্তুতি নেন। তিনি কাজ করতেন যুক্তরাষ্ট্রে।

গবেষণা বলছে, টিভি বা মোবাইল বা আবহাওয়ার অ্যাপে যে তাপমাত্রার পূর্বাভাস দেখানো হয় তার তুলনায় ডব্লিউবিজিটি প্রায়ই কম হয়। ওয়েট বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার বা ডব্লিউবিজিটি সরাসরি সূর্যের আলোতে তাপের একটি পরিমাপ, যা বিবেচনায় নেয়; তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বাতাসের গতি, সূর্যের কোণ এবং মেঘের আবরণ (সৌর বিকিরণ)। এটি সাধারণ তাপ পরিমাপক থেকে ভিন্ন, যা তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বিবেচনা করে এবং ছায়াময় এলাকার জন্য গণনা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অনুসারে ভারী কাজ করা লোকদের জন্য নিরাপদ তাপ হলো ২৭ দশমিক ৫ ডব্লিউবিজিটি। যদিও এ বিষয়ে সবার ধারণা নেই। নারী শ্রমিকদের জন্য এ তাপ পরিমাপের পরিবেশ তৈরির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে পশ্চিমের দেশগুলো। ভারতও এ ক্ষেত্রে কিছু কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

আফ্রিকায়

বিবিসি আর্থ এর আগে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, কেনিয়ার উপকূলের একটি উষ্ণ অঞ্চল কিলিফির কথা। জলবায়ু পরিবর্তন এবং বন উজাড় হয়ে যাওয়ার ফলে বিরূপ পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে ওই এলাকার বাসিন্দাদের। শুষ্ক হয়ে আসা ওই অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তার সংকট যেমন দেখা দিয়েছে, তেমনি মানব স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে। সেখানকার প্রজনন স্বাস্থ্য সমন্বয়কারী কেনেথ মিরিটি বলেন, এখানে কখনো কখনো গরম খুব বেড়ে যায়। রাতে তাপ থেকে থেকে কিছুটা রেহাই মেলে। কিন্তু ঘরগুলো বায়ু চলাচলের অনুপযোগী হওয়ায় সমস্যা বাড়ে। বিশেষ করে গর্ভবতীরা বেশি সমস্যায় পড়েন।

তিনি বিবিসি আর্থকে জানান, প্রায় এক দশক ধরে মিরিটি অঞ্চলে রক্তস্বল্পতার উচ্চ প্রকোপ, বিশুদ্ধ পানির অভাব, দুর্বল স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং যত্নের অভাবে অনেক গর্ভপাতের ঘটনা ঘটেছে এবং গর্ভাবস্থায় জটিলতা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি তার দল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রার কারণে মাতৃস্বাস্থ্য প্রভাবিত হওয়ার মধ্যে সংযোগ পেয়েছে। ২০২১ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, কিলিফিতে প্রচণ্ড গরম মা ও শিশুর স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করছে। গর্ভবতীরা এমন আবহাওয়ায় পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা, ক্লান্তি এবং খিটখিটে অনুভূতিসহ তাপজনিত ক্লান্তিতে ভোগে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গবেষকরা দেখেছেন, প্রচণ্ড তাপ শিশুর অকাল জন্মের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। এ অবস্থায় যেসব শিশু জন্ম নেয় তাদের ২৫০০ গ্রামের কম ওজন হয়। মানদণ্ডের তুলনায় এ ওজন অনেক কম। এমন ওজনের নবজাতকরা স্বাস্থ্য জটিলতায় ভোগে। একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা মৃতপ্রসবের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। দাবদাহের ফলে গর্ভাবস্থায় থাকা ২০ সপ্তাহের ভ্রুণ মারা যেতে পারে।

আফ্রিকার আরেক দেশ গাম্বিয়ায় পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভবতী কর্মজীবী নারী প্রায় সময় প্রচণ্ড গরমের সম্মুখীন হয়। তাদের নিয়ে পরিচালিত জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, প্লাসেন্টায় রক্তপ্রবাহ কমে যায় এবং স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ভ্রুণের হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। তাপমাত্রায় প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির জন্য ভ্রুণের স্ট্রেন বৃদ্ধি পায় ১৭ শতাংশ। এই বৃদ্ধির ফলে ভ্রুণের হৃদস্পন্দন বাড়ে।

আফ্রিকায় এ পরিস্থিতিতে পানিশূন্যতা দূর করতে সচেতনতা বৃদ্ধি, গর্ভাবস্থায় কাজের চাপ কমানো, উন্নত বায়ুচলাচল ঘর এবং শীতল স্থান নির্মাণসহ বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি এগিয়ে চলেছে। তবে বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে সঠিক প্রজাতি বাছাই এবং সেগুলো উপযুক্ত ঘনত্বে রোপণ করতে বলা হয়েছে। তাদের পরামর্শ, কম ছায়া দেয় এমন গাছ রোপণ না করাই ভালো।

দক্ষিণ এশিয়ায়

দক্ষিণ এশিয়ায়ও বাড়ছে উষ্ণতা। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বন উজাড় হচ্ছে। এতে পরিবেশের মারাত্মক প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যে। এর প্রভাব পড়ছে গর্ভবতীদের ওপর। যার একটি সমীক্ষা সম্প্রতি প্রকাশ করেছে ভারত। সমীক্ষায় দেখা গেছে, গরমে মায়েদের ঝুঁকি আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। গবেষকরা বলেছেন, শুধু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ু এলাকার নারীদের নয়, যুক্তরাজ্যের মতো দেশেও এর প্রভাব দেখা গেছে। কিন্তু ভারতের গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভবতীরা সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে। 

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষা অনুসারে, ভারত সেসব দেশের একটি হয়ে উঠবে, যেখানে তাপমাত্রা সুস্থ মানুষের জন্য নিরাপদ সীমার ওপরে থাকবে। ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে গরম দিন এবং গরম রাতের সংখ্যা দ্বিগুণ বা এমনকি চারগুণ হবে বলে অনুমান। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরে ভারত মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি করেছে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক গ্রুপের তথ্য অনুসারে এখনো প্রতি এক হাজার শিশু জন্মের সময় মৃত্যুর হার ১২ দশমিক দুই। যুক্তরাজ্যে এ হার দুই দশমিক সাত।

ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বেশ কয়েকটি শহর ও রাজ্যে তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে গেলে জনসচেতনতা তৈরি এবং লক্ষণ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পশ্চিম ভারতের আহমেদাবাদের এলজি হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ খেয়াতি কাক্কাদ জানান, গ্রীষ্মে আমরা সামাজিক প্রচারাভিযানে যুক্ত হই। জনসাধারণের সঙ্গে কথা বলি। পানি পান, বাড়ি-ঘর শীতল রাখা এবং স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সহনীয় মাত্রায় পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে চূড়ান্ত লক্ষ্য এখনো জলবায়ু পরিবর্তন। যার মাধ্যমে চরম তাপ প্রশমিত হবে। কোভাটস বলেন, তাপ একটি পরিবেশগত বিপদ, যেমন বায়ুদূষণ। বিশেষ করে মাতৃস্বাস্থ্য রক্ষা করার জন্য জলবায়ু-সম্পর্কিত পরিবর্তনের বিরুদ্ধে স্থানীয় পদক্ষেপের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন। গবেষকরা পরামর্শ দিচ্ছেন, গর্ভবতীদের এমন বিরূপ আবহাওয়ায় উচিত হলো গরমে দীর্ঘ সময় অবস্থান না করা, গরমের দিনে বাইরে কাজ করতে হলে নিয়মিত ছায়ায় বসে বিরতি নেওয়া, দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যায়াম করা বা রোদ এড়িয়ে চলা, পানি পান করা। বাংলাদেশের পরিস্থিতিতেও এসব পরামর্শ মেনে চলা শ্রেয় বলে মনে করা হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত