শুক্রবার, ৩১ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ফাঁদে-চাঁদে অনলাইন-অফলাইন

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৫৯ এএম

ঈদ-পহেলা বৈশাখ মিলিয়ে সরকারি অফিসগুলোতে ছুটির বাইরেও ছুটির দরখাস্তের স্তূপ। এরইমধ্যে ছুটিতে চলে গেছেনও কেউ কেউ। ঈদের পরও ছুটির আবেদন দিয়ে রাখা লোকজন আছেন। বিশেষ সেবায় যুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, চিকিৎসকসহ কয়েকটি পেশার জন্য ঈদের ছুটি তেমন আনন্দের নয়। প্রতিবারই ঈদে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ৯ তারিখে ছুটি দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু মন্ত্রিসভার গত বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্ত নাকচ করে দেওয়া হয়। তবে সরকার ওই ২ দিনের জন্য ঐচ্ছিক ছুটির দরজা খুলে দেয়। যারা ছুটি নিতে চান, তারা ওই ঐচ্ছিক ছুটি নিতে পারবেন বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ঘোষণা করেন।

এনজিওসহ বেসরকারি অফিস ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ৯ এপ্রিল অফিস ছুটি দিয়েছে। ১০ এপ্রিল ঈদের সম্ভাব্যতা বিবেচনায় এই ছুটি দিয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। অন্যদিকে ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ৯ এপ্রিল খোলা থাকবে। ব্যাংকের ৯ এপ্রিল খোলা থাকাটা জরুরি। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো ৯ এপ্রিল খোলা রেখে কী হবে, কারা অফিস করবে সেটি নিয়ে একধরনের প্রশ্ন দেখা দেয়। অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা ছুটিতে যাবেন। কাজেই সরকারি অফিসে কোনো কাজ হবে না। যদি কাজই না হয় তাহলে সচিবালয় এবং অন্যান্য সরকারি দপ্তর খোলা রেখে বিপুল ব্যয় বাড়িয়ে কী লাভ? লোকসানই বা কী? এমনতর কত যে প্রশ্ন।

প্রশ্ন উপচে পড়ছে পত্রিকায় এবার ঈদুল ফিতরের টানা ৬ দিনের ছুটি নিয়ে। দেশের, এমনকি বিশ্বের ইতিহাসে এটি একটি রেকর্ড। ৯ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ছুটি ঘোষণা করেছে সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-নোয়াব। প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী, প্রতি বছর ২৯ রমজান থেকে ঈদের তিন দিনের ছুটি ভোগ করেন সংবাদকর্মীরা। রোজা ৩০টি পূর্ণ হলে এই ছুটি চার দিনে ঠেকে। সেই হিসাবে ৯ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত সর্বোচ্চ ছুটি হওয়ার কথা। কিন্তু এবার ঈদের ছুটির এক দিন পর ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের মধ্যে ফাঁকা থাকে মাত্র এক দিন। এমন ফেরে ১৩ এপ্রিল বিশেষ ছুটি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নোয়াবের। এ নিয়ে তৈরি হয়েছে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি নানা অনুভূতি। বহু কথামালা। 

সচরাচর ছুটি বেশি পাওয়া আনন্দের। তা সাংবাদিক হলেও। কিন্তু, সংবাদ-সাংবাদিকতা প্রশ্নে কথা থেকে যায়। একটি দেশ টানা ৬ দিন সংবাদপত্রহীন থাকলে কী অবস্থা হতে পারে? এর জবাবে বলা হচ্ছে, সংবাদপত্রহীন থাকলেও দেশ সংবাদহীন থাকবে না। পাঠকরা তখন বেশি মাত্রায় দর্শক হয়ে যাবে। টিভিতে খবর দেখবে। ঢু মারবে অনলাইন পোর্টালে, ডিজিটালে। পত্রিকার বাজার ফাঁকা পেয়ে মাল্টিমিডিয়া আর টেলিভিশন টানা চাঁদ রাত পেয়ে যাবে। প্রিন্ট মিডিয়া পড়বে বাজার হারানোর ফাঁদে। ৬ দিনের বিজ্ঞাপনী আয় হারিয়ে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ে পড়বে। ছাপা পত্রিকার পাঠক এমনিতেই পড়তি পথে। সেই পড়তিতে আরেকটু ধাক্কা লাগবে। এর বিপরীতেও কথা আছে। প্রিন্ট ভার্সন অফ থাকলেও সবারই অনলাইন চালু রাখা যাবে। এগুলো একদম কথার কথা নয়। কিছু বাস্তবতা তো আছেই। পশ্চিমা দুনিয়ায় একদিনের বেশি পত্রিকা বন্ধ থাকে না। এমনকি বড়দিনের ছুটিতে শুধু বড়দিন কাগজ বের হয় না। তবে, বড়দিনে পত্রিকায় কাজ হয়; যে কাগজটা বাজারে যায় ২৬ ডিসেম্বরে। 

পশ্চিমা দুনিয়া আর বাংলাদেশ এক নয়। আবার বিশ্বায়নের যুগে খুব অভিন্নও নয়। এরপরও ৬ দিনের ছুটিতে প্রিন্ট মিডিয়া, নিজেরাই নিজেদের আবেদন কমানোর ফাঁদে পা ফেলল কি না প্রশ্নটি ঘুরছে নিজেদের মধ্যে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তা উঠে এসেছে নানাভাবে। ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এভাবে আসা জরুরি ছিল না। আবার এটাই অনিবার্য। কথাচ্ছলে ‘পত্রিকা দেখে দেশ চালাই না’ মর্মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি মন্তব্য আছে। আবার একদিন পত্রিকা পড়তে না পারলে তার কত খারাপ লাগে সেই কথাও বলেছেন। কীভাবে সংবাদপত্র তার দৈনন্দিন জীবনের একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হয়ে উঠেছে এবং বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রভাবে শৈশবকাল থেকেই কীভাবে তার অভ্যাসটির বিকাশ ঘটেছে তা নিয়ে একটি নিবন্ধও আছে তার। একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি চান পত্রিকা প্রতিদিন প্রকাশ হোক। একদিনও বন্ধ না থাক।

আবার চাইলেও ৩৬৫ দিনই পত্রিকা প্রকাশ সম্ভব নয়। প্রকাশ করতে হলে ছাপতে হবে। মানে ছাপাখানায় যেতে হবে। সেখানে লোকবল থাকতে হবে। ছাপার পর পাঠকের হাতে পৌঁছাতে হবে। তা বিশাল বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। সার্কুলেশন বিভাগ-হকার্সসহ অনেক মানুষের সম্পৃক্ততা সেখানে। মোটকথা বাস্তবতাটা নিদারুণ। করোনার সময় পত্রিকার ওপর একটা ধকল গেছে। তার ওপর পত্রিকার কাগজে করোনা ছড়ায় বলে গুজবও রটেছে। বাস্তবতা ও গুজবের তেজে কিছু মানুষ ছাপা কাগজ পড়া কমিয়েছে। এবার টানা ৬ দিনেও নিয়মিত পত্রিকা পড়ার অভ্যাসে একটু ছেদ পড়তে পারে। সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে পবিত্র শবেবরাতের ছুটি থাকে নামাজের রাতের পরের দিন। তবে পত্রপত্রিকাসহ গণমাধ্যমগুলো ছুটি থাকে নামাজের রাতের পূর্ববর্তী দিন। মূলত গণমাধ্যম কর্মীদের রাতের ইবাদত এবং পরদিন ভোরে উঠে হকারকে পত্রিকা বিলির বিড়ম্বনা এড়াতে বছর কয়েক আগে সংবাদপত্র মালিকদের পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্ত হয়। তবে গণমাধ্যমে নতুন সংযোজন অনলাইন নিউজ পোর্টাল, রেডিও ও টেলিভিশনগুলোতে ওইভাবে ছুটির সুযোগ না থাকায় গণমাধ্যমে ছুটি পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি সামনে আসে। বিভিন্ন ছুটির দিন সাধারণ বিভাগ বন্ধ থাকলেও বিশেষ ব্যবস্থায় পত্রিকার প্রকাশনা অব্যাহত রাখার একটি চল শুরু হয়। দেশে বেসরকারি ইলেট্রনিক গণমাধ্যম ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল চালু হওয়ার আগে ছুটির দিনে বিশেষ ব্যবস্থায় পত্রিকা প্রকাশের তাগিদ বা বাস্তবতা আসেনি। পরে টেলিভিশন, রেডিও ও অনলাইনের বিস্তার ঘটায় পত্রিকাগুলোকেও এই রেসে শামিল হতে হয়। আবার ২৪ ঘণ্টা সার্ভিসে থাকা এই তিন ধরনের গণমাধ্যম পুরোপুরি বন্ধ রাখার সুযোগ না থাকায় তারা পত্রপত্রিকার বিশেষ ব্যবস্থার দিনে একই পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠান চালু রাখে। অর্থাৎ গোটা বিষয়টিই বাস্তবতার অনিবার্যতা।

অন্যান্য সরকারি ছুটির সঙ্গে পত্রপত্রিকার নির্ধারিত ছুটিতে দিনের মিল থাকলেও শবেবরাত ও শবেকদরে অমিল রয়েছে। এক্ষেত্রে শবেবরাতের ছুটি সরকারি ছুটি নামাজের রাতের পরদিন হলেও পত্রপত্রিকার ছুটি আগের দিনই পালিত হয়। এক্ষেত্রে সংবাদপত্র মালিকদের যুক্তি হচ্ছে, পত্রিকার প্রায় সব কাজই হয় রাতে। পরদিন ভোরে হকারকে তা বাড়ি বাড়ি বিলি করতে হয়। এতে আগের দিন ছুটি থাকলে সংবাদকর্মী থেকে হকার সবাই ইবাদতসহ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে শরিক হতে পারেন। সরকারি ছুটির দিনের সঙ্গে মিল রেখে এই ছুটি নির্ধারিত হলে ইবাদত বন্দেগির পরিবর্তে ওই সময় তাদের সংবাদ প্রকাশনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হতো। এদিকে আরেক পবিত্র রাত শবেকদরের পরদিন সরকারি ছুটি থাকলেও পত্রপত্রিকাগুলো এই ছুটিটি ভোগ করে না। শবেকদরের দুদিন পরেই ঈদের কারণে পত্রিকা টানা তিন থেকে চার দিন বন্ধ থাকায় সংবাদপত্র মালিকরা শবেকদরের ছুটিটি না পালনের পক্ষে। শবেবরাতে প্রকাশনা পুরোপুরি বন্ধ থাকে বলেই ইবাদতের স্বার্থে আগের দিন বন্ধের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু, টিভি-রেডিও, অনলাইনগুলো বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। বিশেষ ব্যবস্থায় পত্রিকা প্রকাশ মানেই সবার ছুটি শেষ হয়ে যাওয়া নয়। টেলিভিশন, অনলাইন, রেডিও ২৪ ঘণ্টা চলে বলে সবার উৎসব মাটি হয়ে যায় না।

সময়ের স্রোতে সংবাদ, সাংবাদিক, সংবাদপত্র, গণমাধ্যম ইত্যাদির ধারণা পাল্টে গেছে। আইনসহ কত বিধিবিধান যোগ হয়েছে। ছুটিছাটার বিষয় ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। বন্ধের মধ্যে বিশেষ ব্যবস্থায় চালুর বিষয়টি নেই। এক সময় পত্রিকা অফিসে দুই ঈদে ৩ দিন করে ৬ দিন, পহেলা বৈশাখ, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, ২১ ফেব্রুয়ারি, শবেবরাতের মতো বিশেষ দিনে পত্রিকা অফিস বন্ধ থাকত। ফলে পরদিন পত্রিকা প্রকাশ হতো না। গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য প্রথম আইন হয় ১৯৭৪ সালে। তখন গণমাধ্যম বলতে ছিল শুধু সংবাদপত্র। রেডিও এবং টেলিভিশন ছিল শুধু সরকারি, তাদের জন্য আলাদা আইন ছিল। কাজেই ১৯৭৪-এর আইনটি কেবল সংবাদপত্রের কর্মীদের জন্য। ২০০৬ সালে আবার অনলাইন এবং ব্রডকাস্ট অর্থাৎ রেডিও-টেলিভিশন কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ২০০৯ সাল থেকে শ্রম আইনে কয়েক দফা সংশোধনের পর ২০১৫ সালে শ্রম আইনের বিধিমালা তৈরি করা হয়। অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক পেশা যেমন শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, স্থপতি প্রমুখের ক্ষেত্রে আইন-মর্যাদা যত বিশেষায়িত ও স্পষ্ট গণমাধ্যমে তা নয়। ছুটিছাটা বা বন্ধের বিষয়ও অস্পষ্ট। অন্যভাবে বলা যায়, এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে প্রিভিলাইজ দেওয়া হয়েছে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেদের নেওয়ার ব্যাপারে। তা এক ধরনের সম্মানেরও।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত