শুক্রবার, ৩১ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

পণ্য বর্জনে কোনো অর্জন নেই

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০২ এএম

অন্য দেশের পণ্য ততদিন থাকবে, যতদিন আমরা সামগ্রিক অর্থে পণ্যসামগ্রী উৎপাদনে সক্ষম না হব। এটা খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে ব্যবহার্য যাই হোক না কেন। হাজার বছর আগের কথা না। তখন ব্রিটিশ শাসন চলছে ভারতবর্ষে। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের অমৃতসর শহরে ইংরেজ সেনাপতি ব্রিগেডিয়ার রেগিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে একটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। শহরের ‘জালিয়ানওয়ালাবাগ’ নামের একটি বদ্ধ উদ্যানে সমবেত নিরস্ত্র জনগণের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। হত্যাকা-ের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংরেজ সরকারের দেওয়া ‘নাইটহুড’ উপাধি ত্যাগ করেন। এরপরই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ভিন্ন রূপ পায়। শুরু হয় মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অহিংস আন্দোলন। ১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলা এই আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে ‘গান্ধী যুগ’-এর সূত্রপাত ঘটায়। তখন মহাত্মা গান্ধী, মুসলিমদের খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে শুরু করেছিলেন- অসহযোগ আন্দোলন। আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল ব্রিটিশদের প্রণয়ন করা রোলাট আইন থেকে। যেটি ভারতীয়দের কাছে ‘কালো আইন’ নামে পরিচিত। তখনই ভারতে একটি সেøাগান আসে। বলা হয় ‘স্বদেশি পণ্য কিনে হও ধন্য’।

এখন খাদ্য বা বিভিন্ন পণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও, ভারতকেও আমদানি করতে হয়। তাদের রাজনৈতিক আদর্শে ভিন্নতা থাকলেও, দেশপ্রেমের প্রশ্নে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাই এক। কিন্তু আমরা, বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোকে মাথায় নিয়ে, কতটুকু  ক্ষমতা রাখি কোনো পণ্য, বিশেষ করে ভারতীয় পণ্য বর্জন করার?

মুক্তবাজার অর্থনীতির এই সময়ে ভারতীয় পণ্য বর্জন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটিকে উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাভাবনা ছাড়া আর কিছু বলা যাবে না। ‘পণ্য বর্জন’ কোনোভাবেই দেশকে ভালোবেসে নয় শতভাগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্য কোনো দেশের পণ্য নয়, কেবল ভারতীয় পণ্য বর্জন!

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের কিছুদিন পর আওয়ামী লীগবিরোধী কয়েকটি দলের তৎপরতায় শুরু হয় ‘ইন্ডিয়া আউট’ বা ভারতীয় পণ্য বর্জনের আন্দোলন। যদিও এখনো বাংলাদেশের ব্যবহৃত অনেক পণ্য ভারত থেকে আমদানি করা হয়। মানুষের চাহিদা এবং পছন্দের তালিকা একটু লক্ষ করলেই সেটা পরিষ্কার হবে। ভারতীয় পণ্য বর্জনের ‘রাজনৈতিক হুমকি’ দিয়ে গত মাসে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী কাশ্মীরি শাল ছুড়ে ফেলে দেন। তখন নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শাল পায়ে মাড়িয়ে ভারতীয় পণ্য বর্জনের স্লোগান দেন বিএনপির কর্মীরা। এরপর রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আমরা আজ থেকে সারা বাংলাদেশে দলের নেতাকর্মীরা ভারতের প্রতিটি পণ্য বর্জন করব। আমাদের দেশের উৎপাদিত সাবান, উৎপাদিত তেল আমরা ব্যবহার করব। শুধু ভারতীয় পণ্য বর্জন করব, কারণ যারা বাংলাদেশের মানুষকে সম্মান দেয় না, তাদের জিনিস আমরা ব্যবহার করব না। বিএনপির বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছে দেশের মানুষ। এই যৌক্তিক কর্মসূচির প্রতি আমরা সমর্থন দিয়েছি। কারণ ভারত আমাদের সঙ্গে প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করছে না। তারা নির্বাচনে একটি দলকে সমর্থন দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছে।

তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, আসল সমস্যাটা কোথায়! বাংলাদেশের আমদানির ২০ ভাগ ভারতীয় পণ্য। এরমধ্যে ভোগ্যপণ্য এবং কাঁচামাল প্রধান। এছাড়া ভারতীয় টুথপেস্ট, মাউথওয়াশ, অলিভ অয়েল, সানফ্লাওয়ার অয়েল, কাপড় কাচার পাউডার, বিভিন্ন ধরনের গায়ের সাবান, চকলেট আর চিপসের একটা বাজার তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। আর ভারতীয় শাড়ি এবং পোশাকের বাজারও আছে। মজার বিষয় হচ্ছে, এর ফলে  রপ্তানি যেমন কমেনি তেমনি ভারতে বাংলাদেশি পর্যটকের ভিড়ও কমেনি।

মনে রাখতে হবে, স্বাধীন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক দৃঢ়তা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে। ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক সুদৃঢ় এবং সহযোগিতার নবদিগন্ত উন্মোচিত হয়। ওই সফরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ২৫ বছর মেয়াদি বন্ধুত্ব-শান্তি-সহযোগিতার চুক্তি । বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের শুরুতেই বঙ্গবন্ধু গঙ্গা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক নদীর সুষম পানিবণ্টন ও ছিটমহল হস্তান্তরের প্রশ্ন উত্থাপন করেন। ১৯৭৪ সালে ভারতের সঙ্গে ছিটমহল ও সীমানা চুক্তি স্বাক্ষরের সময় কিছু অতিরিক্ত ভূমি ছেড়ে দেওয়ার জন্য তিনি ভারতকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয় দীর্ঘ সময় ধরে অমীমাংসিত গঙ্গা পানিচুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুগান্তকারী ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি’ সম্পাদনে ভারতের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছাড়া সম্ভব হতো না। 

২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোট সরকারের জয়লাভের ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নে নবতর অধ্যায় রচিত হয়। বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের অধীনে ২০১৫ সালে স্বাক্ষর হওয়া নতুন চুক্তির আওতায় রয়েছে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত হাটসহ আরও কিছু বাণিজ্য সম্পর্কিত চুক্তি। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শক্তি-জ্বালানি, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য-সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে অবারিত সুসম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ়। বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার অনেকটাই ভারতের ওপর নির্ভরশীল। যখন বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে, ঠিক তখনই ভারত থেকে দ্রুত আমদানি করে বাজার স্থিতিশীল করা হয়। বাংলাদেশে ভারতবিরোধিতা নতুন নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই ভারতবিরোধিতা চলে আসছে। কোনো কোনো পক্ষ ভারত জুজুর ভয় দেখিয়ে বারবার বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।

ভারতীয় পণ্য বয়কটের নামে জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক ‘মস্করা’ না করাই ভালো। এর ফলে জনগণেরই ভোগান্তি বাড়বে। যারা পণ্য বর্জনের আন্দোলনে প্রকাশ্যে বা আড়ালে রয়েছেন তাদের বলি, বর্জনে কোনো অর্জন হবে না। শুধু শুধু মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। যারা এইরকম চাতুরীপূর্ণ রাজনীতি করছেন, তাদের বোধোদয় হলেই ভালো।

লেখক : সাংবাদিক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত