আটপৌরে সংক্রান্তি উৎসব ও বাঙালি লোকাচার

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:৫৫ এএম

ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যায় ‘সংক্রান্তি’ অর্থ হলো সূর্যের এক রাশি থেকে অপর রাশিতে গমন করা। বাঙালির প্রচলিত বোধে অবশ্য আরো সহজতরভাবে বিষয়টি গৃহীত হয়েছে। হিন্দুদের বহুল ব্যবহৃত দিনপঞ্জির মাসের শেষ দিনটিই হলো সংক্রান্তি। মাত্র কয়েক দশক আগেও যখন ঋতুচক্র আরো স্পষ্ট ছিল এবং আধুনিকতা আমাদের গ্রাস করার মতো প্রতাপ দেখানো শুরু করেনি, তখনও বাংলায় প্রতিটি ঋতুরই সংক্রান্তির বা শেষের দিনটি ব্যাপক উৎসাহ এবং উৎসবের আমেজে পালন করত বাঙালি। সময়ের পরিক্রমায় হারিয়ে গেছে বেশিরভাগ উৎসব। তার মধ্যে ‘সবে ধন নীলমণি’ করে আজও কিছু জায়গায় বাঙালি আগলে রেখেছে সংক্রান্তির দুটি উৎসবকে। একটি চৈত্র সংক্রান্তি, অপরটি পৌষ সংক্রান্তি।

বাংলা মাসের সর্বশেষ দিনটি সংক্রান্তির দিন। তাই চৈত্র সংক্রান্তি বা চৈত্র মাসের শেষদিনটি আদতে বাংলা ক্যালেন্ডারের শেষদিন। সর্বশেষ সংক্রান্তির উৎসব। তবে এই শেষ বাঙ্গালিকে দুঃখী করে না। কেননা সংক্রান্তি পালন করার যে বৈচিত্র্যের ডালি বাঙালি সাজিয়ে রেখেছে তা মন খারাপ হতে দেয় না। সাথে নতুন বছরের শুভাগমনের আনন্দ তো রয়েছেই। চৈত্রসংক্রান্তির চড়ক উৎসব খুব ধুমধামের সাথে পালিত হয়। তবে এর আগের দিনও আরেকটি লোকোৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এর নাম নীলপূজা। অনেকে নীলষষ্ঠী বা নীল-নীলাবতী নামেও চিনে থাকে যা মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের লোকোৎসব। শিব-দুর্গার বিবাহ উৎসবকে নীল-নীলাবতী বলে। বাঙালি গৃহিণীরা নিজের সন্তানের মঙ্গল এবং নীরোগ সুস্থ জীবন কামনা করে নীলষষ্ঠীর ব্রত পালন করে। নীল পূজার জন্য শিব-দুর্গার সাজে যুগল নিয়ে নীলসন্ন্যাসীরা বাড়ি বাড়ি ঘোরান এবং গীতিবাদ্য সহযোগে ভিক্ষা সংগ্রহ করেন। নীলের গানকে বলা হয় অষ্টক গান। 

নীলপূজার আগের দিন হয় অধিবাস; অধিক রাত্রে হয় হাজরা পূজা অর্থাৎ বিয়ে উপলক্ষে সকল দেবতাকে আমন্ত্রণ করা। হাজরা পূজায় শিবের চেলা বা ভূত-প্রেতের দেবতাকে পোড়া শোল মাছের ভোগ দেওয়া হয়। পরদিন নীলপূজার সময় নীলকে গঙ্গাজলে স্নান করিয়ে নতুন লালসালু কাপড় পরিয়ে অন্ততপক্ষে সাতটি বাড়িতে নীলকে ঘোরানো হয়। নীলসন্ন্যাসীরা একইরকম লাল কাপড় পরে পাগড়ি মাথায়, গলায় রুদ্রাক্ষমালা ও হাতে ত্রিশূল নিয়ে নীলকে সঙ্গে করে এই মিছিল করেন। এদের দলপতিকে বলা হয় বালা। সাথে থাকে ঢাক-ঢোল, বাঁশী বাজনদারের দল এবং কাল্পনিক শিব-দুর্গার সাজে সঙেরা। গৃহস্থ মহিলারা উঠানে আল্পনা দিয়ে নীলকে আহ্বান করে বরাসনে বসিয়ে তার মাথায় তেলসিঁদুর পরিয়ে দেন। এরপর নীলের গান শুরু হয়: ‘শুন সবে মন দিয়ে হইবে শিবের বিয়ে কৈলাসেতে হবে অধিবাস।’

বিয়ের পর নীলের গানে থাকে সংসারী হর-পার্বতীর কথা, শিবের কৃষিকাজ, গৌরীর শাঁখা পরা প্রভৃতি এবং ভিখারি শিবের সঙ্গে অন্নপূর্ণা শিবানীর দ্বান্দ্বিক সহাবস্থানের কাহিনি। গানের প্রথম অংশ দলপতি বালারা এবং পরবর্তী অংশ অন্য নীলসন্ন্যাসীরা গেয়ে থাকেন। গানের শেষে গৃহস্থরা সন্ন্যাসীদের চাল-পয়সা, ফল প্রভৃতি ভিক্ষাস্বরূপ দেয়। ঐদিন সন্তানবতী হিন্দু নারীরা সারাদিন উপবাস রেখে সন্তানের আয়ু বৃদ্ধির কামনায় ‘নীল ষষ্ঠী’র ব্রত করে। নীলপূজার পর সন্ধ্যাবেলায় শিবমন্দিরে প্রদীপ দিয়ে জলগ্রহণ করে। 

পরের দিন, অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তির প্রধান উৎসব চড়ক। চড়ক গাজন উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ। এ উপলক্ষে গ্রামের শিবতলা থেকে শোভাযাত্রা শুরু করে অন্য গ্রামের শিবতলায় নিয়ে যাওয়া হয়। একজন শিব ও একজন গৌরী সেজে নৃত্য করে এবং অন্য ভক্তরা নন্দি, ভৃঙ্গী, ভূত-প্রেত, দৈত্য-দানব সেজে শিব-গৌরীর সঙ্গে নেচে চলে। তবে এই চড়ক উৎসব নিয়ে মজাদার কিছু ঐতিহ্যগত গল্প রয়েছে গ্রাম বাংলায়। বলা হয়, বৌদ্ধধর্মের প্রভাব যখন ম্লান হয়ে এসেছে, তখন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। সেই ধারাবাহিকতায় কিছু বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বাংলায় এসে হিন্দুত্ব গ্রহণ করেন। ফলে হিন্দুধর্মে মিশে যায় কিছু বৌদ্ধ তন্ত্রমন্ত্রের সাধনা। এই তান্ত্রিকতা থেকে পরবর্তী সময় চড়কপূজার উদ্ভব। চড়কপূজায় যোগদানকারী সন্ন্যাসীরা তান্ত্রিক সাধনা অভ্যাসের ফলে নিজেদের শারীরিক কষ্টবোধের ঊর্ধ্বে যান, তার ফলে চড়কের মেলায় শারীরিক কষ্ট স্বীকারে তারাই এগিয়ে আসেন।

৩০ থেকে ৪০ ফুট উঁচু চড়কগাছ থেকে পিঠে বঁড়শি গেঁথে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া অথবা জিহবা-মুখ-শরীরের কোনো জায়গায় লোহার শিক গেঁথে দেওয়া বা ভাঙা কাচের টুকরার ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া, আগুনের খেলা দেখানো ইত্যাদি। তবে বর্তমানে এসব বিপজ্জনক কসরত অনেক ক্ষেত্রেই নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বেশিরভাগ এলাকা শহরমুখী আচার ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিনোদন ব্যবস্থায় আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ায় এবং এ সকল আয়োজনের সংগঠকের আকাল দেখা দেওয়ায় সেই বিরাট পরিসরে এখন খুব কমই চোখে পরে এসব। মেলায় ছোট ছোট মটির পুতুল আর মাটির ব্যাংক কেনা শিশুদের কাছে অপরিচিত। তারা জানে না, মাত্র ক'টা পয়সা দিয়েই এই গ্রাম্য মেলাতে তার অগ্রজরা মিষ্টান্ন কিনে খাবার জন্য কত অধীর থাকতো। নিদেনপক্ষে দোলনায় দোল খাওয়া বা তেলে ভাজা তো অবশ্যই খেতে হবে। কিন্তু সেসব আর তেমনটি নেই। কিছু যায়গায় এখনো মেলা হচ্ছে, তবে তাতে সেই আটপৌরে মাজাজটা আর নেই। সবেতেই আধুনিক আধুকনিক একটা ভাব এবং প্রগাঢ় কৃত্রিমতা। চড়কের মেলার ধরনে পরিবর্তন আসলেও হিন্দু সনাতনী বাঙালির রসনায় অবশ্য ঐতিহ্যটা এখনো বেশ গভীরভাবেই রয়ে গেছে। 

আবহমান বাংলার হিন্দু রসুই ঘরে চৈত্র মাসের শেষ দিন জায়গা করে নেয় তিতকুটে সব খাবার। এর পেছনে কারণ হচ্ছে বছরের এ সময় প্রচণ্ড গরম থাকে। ফলে রোগবালাই দেখা যায় বেশি। চৈত্রের এই সময়টায় তাই পোলাও, বিরিয়ানি ধরনের খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। তিতা করলা, গিমা শাক অথবা নিমপাতা ভাজি রাখা হয় চৈত্র সংক্রান্তির খাবার মেন্যুতে। এ খাবারের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পেঁয়াজ ও রসুন ব্যবহার করা হয় না। তবে চিনি ও ঘি ব্যবহার করা হয় রান্নায়। এছাড়া চৌদ্দ রকমের শাক খাওয়ার রীতি রয়েছে চৈত্র সংক্রান্তিতে।

অবশ্য পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতেও সংক্রান্তি উদযাপিত হয় বেশ সাড়ম্বরে। পাহাড়িরা আজকের দিনেই মূলত বিজু উৎসব উদযাপন করে। সেখানে পাজন দিয়ে আপ্যায়ন করা হয় অতিথিদের। প্রত্যেক বাড়িতে ১০ থেকে ২৫ প্রকার সবজি মিশ্রিত পাজন রান্না হয়। কমপক্ষে সাতটি গৃহস্থ বাড়িতে পাজন খাওয়া আব্যশক বলে মনে করে তারা। 

চৈত্র সংক্রান্তির মাধ্যমে পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে আগামীর সফলতা ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় আসে নতুন ভোর। পুরনো বছরের সব জরাজীর্ণতা পেছনে ফেলে বাঙালি মিলিত হয় পহেলা বৈশাখের সর্বজনীন উৎসবে। জরাজীর্ণতা, ক্লেশ ও বেদনার সব কিছুকে বিদায় জানানোর পাশাপাশি সব অন্ধকারকে বিদায় জানিয়ে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার আশায় বুক বাধে সবাই। সেই আশা বাঙ্গালিকে জন্মান্তর পর্যন্ত সুখের তরঙে বয়ে নিয়ে যাক সেই প্রত্যাশা এই নববর্ষের আগমনে। ১৪৩১ শুভ হোক সবার জন্য।

লেখক: প্রভাষক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, খুলনা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত