ইরানের হামলার পর...

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:৩২ এএম

ইসরায়েলে ইরানের হামলা অনেক দিক উন্মোচিত করেছে। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের প্রচার ও বিশ্লেষণ যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে প্রভাবসহ বিভিন্ন বিষয়ে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

ইসরায়েলে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। চলতি বছরের ১ এপ্রিল দামেস্কে ইরানের কনস্যুলেটে হামলা চালিয়ে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সিনিয়র কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজা জাহেদিকে হত্যা করে ইসরায়েল। এর পরের দুই সপ্তাহ ইরান প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দেয়। তখন থেকে জল্পনা শুরু ইরান কীভাবে প্রতিশোধ নেবে। ইরানের পক্ষ থেকে তাদের কর্মকর্তাকে হামলার প্রতিক্রিয়া যে জানানো হবে তাও পরিষ্কার করা হয়। প্রস্তুত ছিল ইসরায়েল আর যুক্তরাষ্ট্রও। হামলার তীব্রতা যে বেশি হবে না তাও জানা ছিল। অবশেষে ইসরায়েলে প্রায় তিনশ ড্রোন রকেট হামলা চালায় ইরান। যার বেশিরভাগই ধ্বংস করে দেয় ইসরায়েল। ইরান অবশ্য দাবি করে তাদের হামলা সফল। কারণ তারা শুধু একটি প্রতিক্রিয়া জানাতে চেয়েছিল। এ হামলার পরপর যথারীতি ইউরোপের দেশগুলো ইরানের বিপক্ষে তাদের প্রতিক্রিয়া জানায়।

তবে এ হামলার পর অনেক দিক উন্মোচিত হয়। এর একটি হলো ইরানকে নিয়ে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোর আচরণ। তারা ইরানের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের অভাব, অর্থনৈতিক সংকটের কথা তুলে ধরে। পাশাপাশি এমন প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয় যে ইরানের জনগণ ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না। অপর আরেকটি ইস্যুও আলোচনায় আছে। সেটি হলো মার্কিন নির্বাচন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি থাকলে ইরান এ হামলার সাহস পেত না। অপর দিকে জো বাইডেন ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি ইরানে হামলা হলে ইসরায়েলের পক্ষে থাকবেন না। এ পরিস্থিতি মার্কিন নাগরিকদের ভোটের মনোভাবে কী পরিবর্তন আসে তা-ও আলোচ্য। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অবস্থান। তিনি কি দুর্বল হলেন না সবল?

পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম

লেখক, সাংবাদিক গ্রায়েম উড দ্য আটলান্টিকে লিখছেন, চলতি বছরের ১ এপ্রিল ইসরায়েল দামেস্কে ইরানের কনস্যুলেটে হামলা চালিয়ে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সিনিয়র কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজা জাহেদিকে হত্যা করে। এর পরের দুই সপ্তাহ ইরান পার করতে থাকে প্রতিশোধ নেবে এমন হুমকি দিয়ে। তখন থেকে জল্পনা শুরু ইরান কীভাবে সেই প্রতিশোধ নেবে। ইরানের হামলা বিষয়ে কেউ কেউ ভাবছিলেন তারা গোলান মালভূমিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করবে অথবা ইসরায়েলি দূতাবাসে বোমা হামলা চালাবে। তিনি লেখেন, ‘কিছুদিন পর আমি যখন দুবাই থেকে তেল আবিবে যাই, তখন ভেবেছিলাম যে ইরান পুরনো পদ্ধতিতে ইএল এএল (ইসরায়েলি এয়ারলাইনস) চেক-ইন কাউন্টারে হামলা করবে, যেভাবে তারা ১৯৮০-এর দশকে করেছিল। আমিরাত বিমানবন্দর কর্র্তৃপক্ষকে দেখেও মনে হয়েছে এ ধরনের পূর্বাভাস তারা পেয়েছিল। তারা ইএল এএল কাউন্টারকে ইরানের এয়ারলাইনসের পাশে রেখেছিল, যাতে কেউ ইসরায়েলিদের দিকে হামলা চালালে ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদের উদ্দেশ্যে আসা যাত্রীদেরও ক্ষতি হয়।’

তিনি লিখেছেন, এ হামলায় ইসরায়েলের ‘বিস্ময়কর জয়’ হয়েছে। কারণ এতে প্রমাণ হয়েছে যে অত্যাধুনিক আক্রমণ দীর্ঘ পরিসরে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কার্যকর নয়। যে ড্রোন দিয়ে ইসরায়েলে হামলা হয়েছে, সেগুলো রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে আসছে। তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে, ইসরায়েল এ হামলায় মোটেও ভীত ছিল না। এমনকি বিমান হামলার সাইরেনও বাজেনি। কৌশলগত দিক থেকে ইরানের আরব প্রতিপক্ষ জর্ডান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত সবাই সহযোগিতা করেছে (ইসরায়েলকে)। আবার ইরানের মিত্র সিরিয়া এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ এ অভিযানে অংশ নেয়নি। অথচ ইসরায়েল তাদের ‘স্কাইডোম’র শক্তি যেমন দেখিয়েছে, তেমনি কৌশলগত জোটও ধরে রেখেছে। হামলার পর ইসরায়েলি শিশুদের জন্য স্কুলে ছুটি দেওয়া ছাড়া তেল আবিব স্বাভাবিক দেখা গেছে।

আরেক লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আরাশ আজিজি লিখেছেন, ইরানের সাধারণ জনগণ চায় না তার দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াক। তিনি লিখেছেন, ইরান এবং ইসরায়েল বছরের পর বছর ধরে ছায়াযুদ্ধ চালিয়ে আসছে, কিন্তু ১৩ এপ্রিল তাদের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। তিনি লিখছেন, এ মুহূর্তে ইরানিদের সম্পর্কে কিছু তথ্য জানার জন্য আপনাকে ইরানের বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। দেশটি শাসন করছেন অসুস্থ এবং বয়সী নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। যিনি ১৯৮৯ সাল থেকে দায়িত্বে রয়েছেন এবং যার শাসনামলে ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস হয়েছে, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে এবং এখন যুদ্ধের হুমকি দেখা দিয়েছে। ইরানের জনগণ গত দুটি নির্বাচন বর্জন করেছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে শতাধিক নিহত হয়েছে।

তিনি লিখেছেন, স্বাধীন ইরানি শ্রমিক ইউনিয়ন বলেছে, ইসরায়েলের ওপর শত শত ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের মাধ্যমে ইরান যে যুদ্ধ শুরু করেছে যা ৯০ মিলিয়নের দেশটিকে পোড়া মাটিতে পরিণত করতে পারে। তাদের মতে, সরকার ইরানকে ধ্বংসের চূড়ান্ত মিশন শেষ করছে। শিক্ষক ইউনিয়নও এ ধরনের আহ্বান জানিয়েছে। এক্স-এ প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আহমাদিনেজাদের সমর্থক লিখেছেন, ‘আমি উভয়পক্ষের এ যুদ্ধকে সমর্থকদের ওপর থু থু ফেলি।’ হ্যাশট্যাগ #নোথটুথওয়ার হাজার হাজার ইরানি শেয়ার করেছেন।

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এখন পর্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সাবেক পর্নো তারকা স্টর্মি ড্যানিয়েলসকে ঘুষ দেওয়ার মামলায় সোমবার নিউ ইয়র্কের আদালতে তার বিচার শুরু হয়। এ প্রথম কোনো ফৌজদারি মামলায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিচার শুরু হতে যাচ্ছে। তবে বিচারের মুখে দাঁড়িয়ে তিনি আর চুপ নেই। সিএনএন জানাচ্ছে, ইসরায়েলে ইরানের হামলার সুযোগ কাজে লাগাতে চান ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, বাইডেন জানেন না তিনি কী করছেন। তিনি দেশকে বিশ্বযুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারেন।

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ডেকে আনতে পারেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের এমন একজন প্রেসিডেন্ট আছেন যিনি দুটি বাক্য একসঙ্গে বলতে পারেন না! যিনি মঞ্চ থেকে সিঁড়ি খুঁজে পান না, যিনি জানেন না তিনি কী করছেন! আমি প্রেসিডেন্ট হলে তারা (ইরান) ইসরায়েলকে আক্রমণ করত না। আমি থাকতে তারা কখনো তা করেনি। কারণ ইরান আক্রমণ করার মতো অবস্থানে ছিল না। তাদের কাছে কোনো টাকা ছিল না। তারা ভেঙে পড়েছিল।’ ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে যা চলছে, তা শেষ পর্যন্ত বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। উল্লেখ্য, ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকার সময় ইসরায়েলের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল বেশ ভালো। বাইডেন প্রশাসন যদি ইসরায়েলকে যথাযথ সমর্থন না দেয় তাহলে মার্কিনিরা ভোটে কোন পক্ষে ঝুঁকে পড়েন তা দেখার বিষয়। আবার ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র। কারণ এর ফলাফল তাদের জন্য মোটেও ভালো কিছু হবে না। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে যুদ্ধে জড়ালে বাইডেন বাড়তি চাপে থাকবেন। আবার যুদ্ধে না জড়ালে ইসরায়েলপন্থিদের ভোট কমে যাওয়ারও সুযোগ রয়েছে। যে পরিস্থিতি কাজে লাগাতে চাইছেন ট্রাম্প।

এদিকে গ্রায়েম উড মনে করেন, এ হামলা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য একটি উপহার। যদিও তিনি ইসরায়েলের জনগণের কাছে ক্রমে অযোগ্য হয়ে উঠছিলেন। তবে এখন নেতানিয়াহুর সরকার ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ইরানি আক্রমণ প্রতিহত করার কৃতিত্ব অর্জন করল। তিনি জানাচ্ছেন, ইরানের এ হামলার প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহুকে পাল্টা আক্রমণও করতে হবে না। আবার জো বাইডেনও বলেছেন তারা ইরানে হামলাকে সমর্থন করবেন না। এতে নেতানিয়াহু দায়মুক্ত থাকেন। আবার ইউরোপের যেসব দেশ গাজায় হামলা নিয়ে ইসরায়েলের সমালোচনা করেছে, তারা এখন ইরানের নিন্দা করছে। গ্রায়েম উড লিখছেন, নেতানিয়াহু এবং তার মন্ত্রিসভা ক্রমাগত নতুন এবং উদ্ভাবনী উপায়ের সন্ধানে রয়েছে। এ অবস্থায় তারা দেখাতে পারবে যে শুধু হামাস নয়, ইসরায়েলের শত্রু আরও অনেকে আছে।

ইরান যা মনে করে

ডয়চে ভেলে জানাচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে ইসরায়েল এবং ইরান ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব পর্যন্ত মিত্র ছিল। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম রাষ্ট্রগুলোর একটি ছিল ইরান। ইসরায়েল ইরানকে আরব রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে মিত্র হিসেবে বিবেচনা করত। আবার ইরান ওই অঞ্চলের আরব দেশগুলোর পাল্টা হিসেবে মার্কিন সমর্থিত ইসরায়েলকে স্বাগত জানিয়েছিল। তবে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ক্ষমতায় আসার পর ইরান ইসরায়েলের সঙ্গে আগের সমস্ত চুক্তি বাতিল করে। খোমেনি ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড দখলের জন্য ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনা করেন। ক্রমান্বয়ে ইরান ইসরায়েলের প্রতি কঠোর হতে থাকে। একইসঙ্গে তারা আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে আগ্রহী হয়। ১৯৮২ সালে  ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে সৈন্য পাঠালে খোমেনি সেখানকার শিয়া মিলিশিয়াদের সমর্থনে ইরানের বিপ্লবী গার্ডদের পাঠান। সেই থেকে লেবাননে বেড়ে ওঠা হিজবুল্লাহ মিলিশিয়াদের সরাসরি ইরানের বাহিনী হিসেবে গণ্য করা হয়।

এসব শত্রুতার ধারাবাহিকতায় ইরান ইসরায়েলের ওপর এ হামলা চালায়। যার নাম তারা দেয় ‘সত্য প্রতিশ্রুতি’। তাদের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ শীর্ষ নেতারা ইসরায়েল এবং অন্যদের আক্রমণের জবাবে তাদের ‘শাস্তি’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণ করলেন এর মাধ্যমে।

এ হামলা যুদ্ধের শুরু বা হুমকি হিসেবে তারা দেখছে না। একে তারা মর্যাদা রক্ষার হামলা হিসেবে দেখছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত