বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মুক্তিপণে মুক্ত জাহাজ

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ১২:১৭ পিএম

প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর শঙ্কা নিয়ে টানা ৩১ দিন কেটেছে এমভি আবদুল্লাহর নাবিকদের। একই সঙ্গে উৎকণ্ঠায় কেটেছে নাবিকদের পরিবার-স্বজন ও জাহাজ মালিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষকর্তাদের। অবশেষে গত শনিবার রাত ৩টার দিকে জাহাজ থেকে ৬৫ জন সোমালিয়ান জলদস্যু নেমে যাওয়ার পর জাহাজটি যখন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নৌবাহিনীর দুটি টহল জাহাজ প্রটোকল দিয়ে দুবাইয়ের পথে যাত্রা করে, তখন যেন তারা প্রাণ ফিরে পায়। জাহাজ মালিক প্রতিষ্ঠান কেএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার জাহান রাহাত জানিয়েছেন, ১৯ বা ২০ এপ্রিল জাহাজটি দুবাই পৌঁছাবে। সেখানে ৫৫ হাজার টন কয়লা খালাসের পর জাহাজটি চট্টগ্রামে ফিরে আসবে। নাবিকরা দুবাই থেকে দেশে ফিরতে চাইলে উড়োজাহাজে করে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

নাবিকরা সোমালিয়ান জলদস্যুদের কাছে বন্দি থাকায় তাদের পরিবারগুলোতে ঈদের কোনো আনন্দ ছিল না। ঈদের পর নাবিকদের উদ্ধারের খবরে পরিবারগুলোতে ফেরে ঈদের আনন্দ। নাবিক আইনুল হকের মা লুৎফে আরা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই কষ্ট কাউকে বোঝাতে পারব না। একটা রাতও স্বস্তিতে ঘুমাতে পারিনি। তিন-চার দিন ফোন যদি না করত তখনই ভয় পেয়ে যেতাম। দস্যুরা মেরে ফেলছে কি না, ফোন করলেই কিছুটা স্বস্তি পেতাম। এখন আমাদের কাছে ঈদের দিনের মতো আনন্দ লাগছে। আমাদের ছেলেরা আমাদের কাছে ফিরে আসছে।’ একই শঙ্কার কথা জানান জাহাজের চতুর্থ ইঞ্জিনিয়ার তানভির আহমেদের মা জোছনা বেগম। তিনি বলেন, ‘ওদের কষ্টের কথা কল্পনা করতাম। মনে কোনো শান্তি ছিল না।’

উদ্বেগে ছিল জাহাজ মালিক প্রতিষ্ঠান : সবার শঙ্কা ও উদ্বেগ নিরসনের দায়িত্ব নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছিল এমভি আবদুল্লাহ জাহাজের মালিক কেএসআরএম গ্রুপ। এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে কেএসআরএম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী মেহেরুল করিম বলেন, ‘জাহাজটি ১২ মার্চ থেকে দস্যুদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই আমরা যোগাযোগ শুরু করি। দস্যুদের ওখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে জানতে চাই তারা কী চায়? সেই অনুযায়ী আন্তর্জাতিক শিপিং সংক্রান্ত বিভিন্ন গোষ্ঠী ও দেশের সঙ্গেও যোগাযোগ করি। তাদের পরামর্শক্রমেই আমরা সবচেয়ে কম সময়ে জাহাজটি জিম্মিদশা থেকে উদ্ধার করতে পেরেছি। এ কাজ করতে গিয়ে আমাদের প্রতিনিয়ত টেনশনের মধ্যে যেতে হয়েছে।’

তবে এতে সরকারের পক্ষ থেকে খুব দ্রুত সাপোর্ট পাওয়া গেছে উল্লেখ করে কেএসআরএম গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার জাহান রাহাত বলেন, ‘যখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের জাহাজ আমাদের জাহাজ উদ্ধার করতে চাইল তখন সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের পুরো সাপোর্ট দেওয়া হলো। কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা নিয়ে আমরা জোরপূর্বক উদ্ধার চাই না। আমরা নাবিকদের অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে চাই। সরকারের পক্ষ থেকে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের বক্তব্য : এমভি আবদুল্লাহ উদ্ধারে নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর থেকে সব ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মেরিটাইম সেক্টরের সঙ্গে লিয়াজোঁ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর মাকসুদ আলম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০১০ সালে জিম্মি হওয়া এমভি জাহান মনির সময়ে নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর থেকে এত সরাসরি মনিটরিং করা হয়নি। কিন্তু এবার শুরু থেকেই তা অব্যাহত ছিল। সেই সঙ্গে মালিক প্রতিষ্ঠান কেএসআরএম তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে খুব কম সময়ে জাহাজ ও নাবিকদের উদ্ধার করল।’

টাকা পেয়ে নাবিকদের অভয় দিয়েছিল দস্যুদের নেতা : গত রবিবার ভোর ৩টায় এমভি আবদুল্লাহ জাহাজ থেকে দস্যুরা নেমে যাওয়ার পর জাহাজের ক্যাপ্টেন আতিক উল্লাহ খান মাসুদ পাশর্^বর্তী ইউরোপিয়ান টহল জাহাজের কাছে সহযোগিতা চান। পরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দুটি টহল জাহাজ পাহারা দিয়ে এমভি আবদুল্লাহকে দুবাইয়ের আল হারামিয়া বন্দরে নিয়ে যেতে যাত্রা করে। মূলত দস্যুদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাটি পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এ উদ্যোগ। যদিও মুক্তিপণের ডলার পাওয়ার পর দস্যুদের দলনেতা সোমালিয়ান ভাষায় একটি চিঠি দিয়েছিল এমভি আবদুল্লাহর ক্যাপ্টেনকে। সেখানে লেখা ছিল ‘তোমরা দুবাই বন্দর যাওয়া পর্যন্ত কেউ তোমাদের ডিস্টার্ব করবে না। নির্ভয়ে যেতে পারবে।’

কত মুক্তিপণে ছাড়া পেল এমভি আবদুল্লাহ : আন্তর্জাতিকভাবে এ পর্যন্ত যত জাহাজ জিম্মিদের কাছ থেকে মুক্তি পেয়েছে কখনো মুক্তিপণের টাকা প্রকাশ করা হয়নি। আর এমভি আবদুল্লাহর ক্ষেত্রেও একই চিত্র। তারপরও মুক্তিপণের টাকার পরিমাণ জানতে চাইলে কেএসআরএমের প্রধান নির্বাহী ক্যাপ্টেন মেহেরুল করিম বলেন, ‘আইনগত কারণেই তা প্রকাশ করা যাবে না।’ তারপরও সোমালিয়ান দস্যুদের বরাত দিয়ে সোমালিয়ান পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের (প্রতি ডলার ১০০ টাকা হিসাবে ৫০ কোটি টাকা) বিনিময়ে এমভি আবদুল্লাহকে মুক্তি দিয়েছে দস্যুরা। এজন্য শনিবার সন্ধ্যায় তিনটি ওয়াটার প্রুফ ব্যাগ উড়োজাহাজ থেকে জাহাজের কাছে ফেলা হয়েছিল। ডলার গণনা করে নিশ্চিত হওয়ার পরই দস্যুরা স্থানীয় সময় রাত ১২টা ও বাংলাদেশ সময় রাত ৩টায় ৬৫ জন দস্যু ৯টি বোটে করে জাহাজ থেকে নেমে যায়।

গত ১২ মার্চ দুপুর দেড়টার দিকে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু থেকে প্রায় ৬০০ নটিক্যাল মাইল দূরে ভারত মহাসাগর থেকে এমভি আবদুল্লাহর সেকেন্ড অফিসার মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রথম অস্ত্র ঠেকিয়েছিল সোমালিয়ান জলদস্যুরা। জাহাজটি মোজাম্বিক থেকে ৫৫ হাজার টন কয়লা নিয়ে দুবাই যাচ্ছিল। জাহাজটি ছিনতাইয়ের পর সোমালিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলের গ্যরাকাদে নোঙর করে। এখনো একই এলাকায় অবস্থান করছে। জাহাজ থেকে নাবিকদের উদ্ধারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্রিটিশ রয়েল নেভি এবং ভারতীয় নৌবাহিনী অভিযান চালানোর অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেও জাহাজ মালিক ও বাংলাদেশ সরকার অভিযানের অনুমোদন দেয়নি। রক্তপাতহীন জিম্মিদের মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতেই মালিকপক্ষের কাছ থেকে অভিযানের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এর আগে একই মালিক গ্রুপের এমভি জাহান মনিকে ২০১০ সালে জিম্মি করেছিল একই গ্রুপের জলদস্যুরা। সেবারও মুক্তিপণ দিয়ে তাদের উদ্ধার করা হয়। সোমালিয়ান জলদস্যুরা ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আটটি জাহাজ জিম্মি করেছিল। এর আগে ২০০৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে জিম্মি করেছিল ৩৫৮টি জাহাজ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত