বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ইসরায়েলি অহংয়ে ইরানের আঘাত

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৪:৪৭ এএম

গত ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় রাজনীতির চিত্র প্রতিনিয়ত তার রঙ বদলেছে। গাজায় ইসরায়েলের ন্যক্কারজনক আগ্রাসনে অব্যাহত প্রাণহানির মধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা এখন এমন এক জায়গায়, যা গত শতক থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে সংকটজনক জায়গায় পৌঁছেছে। গত শনিবার রাতে ইসরায়েলের মাটিতে প্রথমবারের মতো হামলা চালিয়েছে শিয়া মতাবলম্বী দেশ ইরান, যারা কি না সমরশক্তিতে মুসলিম বিশে^র প্রথম সারির দেশ। পশ্চিমা অক্ষ এবং তার দোসর ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরান তিন শতাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে যেভাবে আগ্রাসী কায়দায় জবাব দিয়েছে, তা মুসলিম বিশে^ সাধুবাদ পাচ্ছে। এখন আঞ্চলিক উত্তেজনার রেশ যুদ্ধে মোড় নেয় কি না, তাই আলোচনার কেন্দ্রে। ইরানকে কীভাবে জবাব দেওয়া যায় তা নিয়ে কৌশল ঠিক করতে ইসরায়েলের জায়নবাদী প্রশাসন শেষ মুহূর্তের আলোচনায় ব্যস্ত।

গত ১ এপ্রিল সিরিয়ার দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে ইসরায়েলের প্রাণঘাতী হামলার পরের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্য স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত। প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের ভূমি লক্ষ্য করে মাঝরাতে একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার পর ইসরায়েলকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিমানবাহিনী ইরানি ড্রোন সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ হামলার পর গত রবিবার ইসরায়েলি বাহিনী দাবি করছে, তারা ৯৯ শতাংশের মতো ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে।

মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ছায়াযুদ্ধের যে জাল বিস্তৃত তাকে গত কয়েক মাস ধরে নানা সময় বিপর্যস্ত করেছে ইসরায়েল। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি এবং ইরাক-সিরিয়ার বিস্তৃত হিজবুল্লাহ অনুগামী সংগঠনগুলো ইরানের গার্ড বাহিনীর ছায়ায় তৎপরতা চালায় বলে মনে করে ইসরায়েল ও তার মিত্ররা। কিন্তু দামেস্কের কনস্যুলেটে হামলার পর ইরান যেন ইসরায়েলের এই বারবার প্রতিক্রিয়ার রাশ টেনে ধরতে চেয়েছে। এখন পরিস্থিতি যে জায়গায় দাঁড়িয়েছে, তাতে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও ইরানের এ উত্তেজনা বড় আকার ধারণ করতে পারে যেকোনো মুহূর্তে। কারণ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বলা হচ্ছে, ইরানের হামলার জবাব দিতে আলোচনা চলছে ইসরায়েলে এবং শিগগিরই তা হতে পারে।

গত বছর ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাপন্থি সংগঠন হামাস ইসরায়েলে অতর্কিত আক্রমণ চালালে শুরু হয় লড়াই। পরে ইসরায়েলের নজিরবিহীন আগ্রসানে ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। এখনো চলছে সেই যুদ্ধ। গাজা যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে যুদ্ধকালীন জরুরি সরকার গড়ে ওঠে। ইসরায়েলি ভূখ-ে ইরানের ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ’-এর পর সেই জরুরি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা বৈঠকে আবারও বসে। ইরানের বিরুদ্ধে দেশটি কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, তা নির্ধারণ করতেই এ বৈঠক।

তিন সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভার সদস্য প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ত এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী বিরোধী নেতা বেনি গান্টজ। আলোচনার পর এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন নেতানিয়াহু নিজে। বৈঠকের বিষয়বস্তুর সঙ্গে পরিচিত সূত্র উল্লেখ করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট’ জার্নাল জানিয়েছে, ইরানকে জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরায়েল এবং তা শিগগিরই হতে পারে।

ইরানের তিন শতাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর স্বাভাবিকভাবে তেহরানের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে ইসরায়েলের পশ্চিমা মিত্র দেশগুলো। তবে এসব দেশের কেউই চায় না, ইসরায়েল সরাসরি সংঘাতের জড়িয়ে এখনই ইরানকে সমুচিত জবাব দিক। বরং ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠতম মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও চায় না এমন সংঘাত।

যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় দেশগুলো সোমবার ইসরায়েলকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানির সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেল এবং জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইসরায়েলকে সংযত থাকতে বলেছেন।

জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্নায়েলেনা বেয়ারবক বলেছেন, ‘ইরানের সঙ্গে বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েল প্রতিরক্ষামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে জিতেছে। এখন ওই অঞ্চলে আর সংঘাতের তীব্রতা বাড়া উচিত নয়।’

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, ‘ইরানকে জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের যুক্তিসংগত কারণ আছে। তবে সাবধান থাকা দরকার। আর মন দিয়ে নয়, মগজ খাটিয়ে চিন্তা করা প্রয়োজন রয়েছে তাদের।’

গতকাল সর্বশেষ ফ্রান্সও ইসরায়েলকে সংযত হতে আহ্বান জানিয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ জানিয়েছেন, তার দেশ মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সেটি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সবই করবে।

ইরানের হামলার পর নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনালাপ হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের। গত রবিবার সকালের দিকে এ ফোনালাপের সময় জো বাইডেন ইসরায়েলি নেতাকে বলেন, আক্রমণে যা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা সামান্য এবং আক্রমণ প্রতিহত করার বিষয়টি বিজয় হিসেবে নিতে নেতানিয়াহুকে আহ্বান জানান তিনি। এ ছাড়া ইরানের কর্মকা-ের বিরুদ্ধে সামরিক কায়দায় প্রতিক্রিয়া জানানোর পথ পরিহারের আহ্বান জানান বাইডেন।

ইসরায়েল যে ইরানি পদক্ষেপের জবাব দিতে চায়, তা পরিষ্কার বোঝা গেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ড্যানিয়েল হাগারির মন্তব্যেও। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল কীভাবে এর জবাব দেবে তার উপায় খুঁজছে। কয়েক ঘণ্টা ধরে আমরা আভিযানিক পরিকল্পনা অনুমোদন করিয়ে নিয়েছি। আমরা আক্রমণাত্মক এবং সতর্কতামূলক; উভয় কৌশলই মাথায় রেখেছি।’ তাছাড়া ইসরায়েলি কট্টর ডানপন্থি সরকারের সদস্যরাও ইরানকে শিক্ষা দিতে মরিয়া।

এদিকে হামলার আগে ইরানের অবহিতকরণ নিয়েও শুরু হয়েছে বিতর্ক। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল জানায়, তারা প্রতিবেশী দেশগুলোকে জানিয়েছিল যে, তারা ইসরায়েলে হামলা চালাতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে ইসরায়েল ও তার মিত্র যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জর্ডানকে প্রতিরক্ষার কৌশল নিতে বলে দেওয়া হয়েছিল।

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের বার্তা পাওয়ার কথা অস্বীকার করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর বের হয়েছে, হামলার দুদিন আগে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোকে জানিয়েছিল ইরান। দেশটির কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) অবহিত করেছিল যুক্তরাষ্ট্রকে। মার্কিন গণমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে ইসরায়েলের একটি সংবাদমাধ্যম।

আবারও হামলায় ছাড় দেবে না ইরান : গতকাল ছিল ইরানের জাতীয় সেনা দিবস। এই দিন ইরানের সেনাবাহিনীর প্রধান কমান্ডার জেনারেল আবদোলরহিম মৌসাভি বলেন, ‘ইরানে কোনো আগ্রাসন হলে তার চরম জবাব দেওয়া হবে। ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে ইরানের এ অভিযান তেহরানের দৃঢ়তা ও সক্ষমতার অংশ মাত্র।’

এদিকে গতকাল জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি আমির সায়িদ ইরাভানি বলেন, “ইসরায়েল জানে, তেহরানের পরবর্তী প্রতিক্রিয়া হবে ‘চূড়ান্ত’ প্রতিশোধ।” স্কাই নিউজে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তাকে এ মন্তব্য করতে দেখা যায়।

ইরানের ‘উল্লেখযোগ্য প্রতিক্রিয়া’ নিয়ে ইসরায়েলের যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে ইরাভানি আরও বলেন, ‘এটি একটি হুমকি।’

হামলার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বিতর্ক : হামলায় কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিয়ে নানা তথ্য সামনে আসছে। ইসরায়েলের দিক থেকে হামলার ব্যাপকতা ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা স্বীকার করা হবে না, এমনটাই অনুমান বিশ্লেষকদের। তবে তা সত্ত্বেও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, ইরানের বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তারা প্রতিহত করেছে। শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ ব্যবহার করে এতদিন আকাশ হামলা প্রতিহত করে আসছিল। তবে ইরানের হামলা প্রতিহত করতে ব্যাপক পরিসরে নতুন এক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবহার করেছে আইডিএফ। সংবাদমাদ্যমগুলো বলছে, ইসরায়েলি ভূখ- অতিক্রম করার আগেই কৌশলগত মিত্রদের সঙ্গে ‘অ্যারো-৩’ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করে হামলা ঠেকানো হয়েছে। ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে একটি ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাত হেনেছে, যার ফলে কিছুটা অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে।

অ্যারো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধীরগতির ড্রোনের বদলে অতি উচ্চতায় থাকা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরাস্ত করতে পারে। গাজা যুদ্ধের শুরুতে ইয়েমেন থেকে আসা হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে এ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করেছে ইসরায়েল। এর বাইরে আইডিএফ হামলায় আহতদের সম্পর্কে তথ্য দেয়নি। তবে জানা গেছে, বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। তবে হামলার কারণে যে ইসরায়েলের শক্ত আকাশ প্রতিরক্ষাবলয় কিছুটা হলেও ব্যর্থ হয়েছে, তা গতকাল নানা সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, ইরানের ছোড়া অন্তত নয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের দুটি বিমান ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে। আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম হয় ওই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো। এর মধ্যে পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলের একটি বিমান ঘাঁটিতে আঘাত করে। বিমান ও রানওয়ের ক্ষতি হয়। আরও চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে আরেকটি বিমান ঘাঁটিতে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত