বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

নববর্ষের সুরে মঙ্গলের বার্তা

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৪:৪৮ এএম

বর্ণিল আয়োজনে আনন্দ উল্লাস আর বিশ্বমানবের মঙ্গল কামনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে বাংলা নববর্ষ। বাংলা নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমনকি বিদেশের মাটিতেও উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ব্যাপক আয়োজন করা হয়। এবার ঈদের ছুটির পরপরই পহেলা বৈশাখ হওয়ার পরও নানা আয়োজনের তেমন কমতি ছিল না।

বাংলা বর্ষপঞ্জিতে গত রবিবার যুক্ত হয়েছে নতুন বাংলা বর্ষ ১৪৩১। নতুন বাংলা বর্ষের প্রথম দিনের ভোরের আলো রাঙিয়ে দেয় নতুন স্বপ্ন, প্রত্যাশা আর সম্ভাবনাকে। রাজধানীসহ সারা দেশেই ছিল বর্ষবরণের নানা আয়োজন। অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদযাপিত হয় নববর্ষ। জীর্ণ পুরাতন সবকিছু ভেসে যাক, ‘মুছে যাক গ্লানি’ এ আহ্বান জানায় বাঙালি। দিনটি সরকারি ছুটির দিন।

বাংলা নববর্ষ উদযাপনের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। তবে নব পর্যায়ের বর্ষবরণের অন্যতম প্রধান অনুসঙ্গ ঢাকার রমনা বটমূলে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানটের বৈশাখ আবাহন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের মঙ্গল শোভাযাত্রা।

প্রথা ও ঐতিহ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার রমনা উদ্যানের বটমূলে পহেলা বৈশাখের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রবিবার সকাল সোয়া ৬টায় দেশের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট পরিবেশন করে মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। নতুন বাংলা বর্ষপঞ্জি ১৪৩১ সনকে স্বাগত জানাতে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উৎসবস্থলে সমবেত হয় মানুষ। মেতে ওঠে নাচে, গানে, আনন্দন্ডউল্লাসে।

মর্তুজা কবির মুরাদের ‘রাগ আহীর ভৈরব’ সুরে মন্ত্রমুগ্ধকর বাঁশি পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই সাংস্কৃতিক উৎসব। দেশের বিশিষ্ট শিল্পীদের পরিবেশনা, গান, আবৃত্তি ও অন্যান্য পরিবেশনা শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। এর মধ্যে সত্যম কুমার দেবনাথ, খায়রুল আনাম শাকিল, চন্দনা মজুমদার, তানিয়া মান্নান, রামেন্দু মজুমদার, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়সহ প্রখ্যাত শিল্পীরা প্রকৃতি, মানবপ্রেম, আত্মশুদ্ধি ও দেশপ্রেমের বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

পহেলা বৈশাখ উদযাপন উপলক্ষে সকাল ৯টা ১৮ মিনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদ থেকে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়। ঐক্য, সাংস্কৃতিক গর্ব ও স্থিতিস্থাপকতার প্রতীক এই শোভাযাত্রা। এটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পীসত্তা ও চেতনার মন্ত্রমুগ্ধকর প্রদর্শনী।

মঙ্গল শোভাযাত্রা শাহবাগ, ঢাকা ক্লাব এবং শিশু পার্কের মতো ঐতিহাসিক স্থান হয়ে, ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা অতিক্রম করে। বর্ণিল পোশাকে সজ্জিত ও প্রতীকী নিদর্শন সংবলিত শোভাযাত্রা বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে এবং আনন্দন্ডউল্লাসে নতুন বছরকে স্বাগত জানায়।

শোভাযাত্রাটি টিএসসিতে সমাপ্তির পথে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার বাতাস হর্ষধ্বনি, সংগীত এবং অংশগ্রহণকারী ও দর্শকদের সম্মিলিত উল্লাসে অনুরণিত হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রা শুধু বাংলা নববর্ষের আগমনই উদযাপন করে না, প্রতিকূলতার মধ্যেও বাঙালি জনগণের সহনশীলতা ও চেতনার সাক্ষ্য বহন করে।

আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে, এ জাতীয় আয়োজন ঐক্য, স্থিতিস্থাপকতা ও একাত্মতার বোধকে লালন করার ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্ব নিশ্চিত করে; এমন মত প্রকাশ করেন শোভাযাত্রায় যোগ দেওয়া মানুষ।

নববর্ষ উপলক্ষে নানা বয়সী মানুষদেও বৈশাখী বাহারি সাজে ঘোরাঘুরির পাশাপাশি পান্তা-ইলিশের আয়োজন ছিল। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন অনেকেই। প্রিয়জনকে উপহার দেওয়া আর পছন্দের জায়গায়গুলোতে ঘুরতে যাওয়ার দৃশ্যও ছিল চোখে পড়ার মতো।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে উৎসবের আমেজে বাঙালির প্রাণের উৎসব বৈশাখ বরণ অনুষ্ঠান উদযাপিত হয়। বাংলা সংস্কৃতির নানা উপকরণে সাজে শিশু একাডেমি প্রাঙ্গণ।

বৈশাখ বরণ উৎসবে ‘বৈশাখের রঙ লাগাও প্রাণে’ শিরোনামে উন্মুক্ত ক্যানভাসে ছবি আঁকার উদ্বোধন করেন দেশের বরেণ্য কবি নির্মলেন্দু গুণ। এরপর রঙের তুলিতে ক্যানভাস রাঙান বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান লাকী ইনাম এবং মহাপরিচালক আনজীর লিটন। শিশুরাও মনের মাধুরি মিশিয়ে আঁকে বৈশাখের ছবি।

বৈশাখ বরণ উৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেশ বরেণ্য কবি নির্মলেন্দু গুণ। তিনি তার বক্তব্যে শৈশবের পহেলা বৈশাখের স্মৃতিচারণ করেন। ৮০ বছর বয়সের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে কবি বলেন তার শৈশবের বৈশাখে নতুন পোশাক পরে বৈশাখ উদযাপনের সামর্থ্য ছিল না। সামর্থ্য না থাকলেও সে সময় তাদের আনন্দেরও কোনো কমতি ছিল না বলে জানান। শিশু একাডেমিতে বৈশাখ বরণ করতে এসে তিনি প্রথমবারের মতো মেট্রোরেল দেখে আপ্লুত হয়ে যান। মেট্রোরেলে জনমানুষের ভোগান্তি দূর হতে দেখে বর্তমান সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

ক্যানভাস উদ্বোধনের পর, শিশু একাডেমির উন্মুক্ত চত্বরে বৈশাখের গান ‘এসো হে বৈশাখ’ পরিবেশন করে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির প্রশিক্ষণার্থী শিশু শিল্পীরা। বৈশাখ বরণের উৎসবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ শিশু একাডেমির শিশুশিল্পী, প্রশিক্ষক এবং অভিভাবকরা।

পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। এ দিনটি বাংলাদেশে নববর্ষ হিসেবে উদযাপিত হয়। এটি বাঙালির একটি সর্বজনীন লোকউৎসব। এদিন আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেওয়া হয় নতুন বছরকে। কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক হিসেবে উদযাপন করা হয় বাংলা নববর্ষকে।

বাংলা পিডিয়া অনুসারে, এক সময় নববর্ষ উদযাপিত হতো ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কৃষির, কারণ কৃষিকাজ ঋতুনির্ভর। কৃষিকাজের সুবিধার্থেই মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তার সিংহাসন আরোহণের সময় থেকে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬)। হিজরি চান্দ্র সন ও বাংলা সৌর সনকে ভিত্তি করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। নতুন সনটি প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল, পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়।

বাংলা নববর্ষ আকবরের সময় থেকে থেকে উৎসবের রূপ লাভ করে। সে সময় বাংলার কৃষকরা চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূস্বামীর খাজনা পরিশোধ করত। পরদিন নববর্ষে সাধারণ মানুষকে মিষ্টিমুখ করাতেন ভূস্বামীরা।

এ উপলক্ষে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। ক্রমান্বয়ে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে পহেলা বৈশাখ আনন্দময় ও উৎসবমুখী হয়ে ওঠে এবং বাংলা নববর্ষ শুভ দিন হিসেবে উদযাপিত হতে থাকে।

বাংলা নববর্ষের অন্যতম উপাদান হালখাতা। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে তাদের পুরনো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে, নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে তারা নতুন-পুরাতন খরিদদারদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করতেন। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়।

নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। এটি মূলত সর্বজনীন লোকজ মেলা। এ মেলা অত্যন্ত আনন্দঘন। স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোক শিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, সব প্রকার হস্তশিল্পজাত ও মৃৎশিল্পজাত সামগ্রী এ মেলায় পাওয়া যায়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত