বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

উপজেলায় অনাগ্রহ ছোট দলের

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:৫৯ এএম

ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। জোর প্রস্তুতি চলছে এখন। চার ধাপের উপজেলা নির্বাচনের প্রথম দুই ধাপের তফসিল ঘোষণা করেছে ইসি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে উপজেলা নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতি থাকলেও উত্তাপ নেই বিরোধী শিবিরে। যেসব ছোট দল জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছে তাদেরও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।

উপজেলা নির্বাচনে কম আগ্রহের দুটি কারণ দেখিয়েছে পক্ষ দুটি। বিরোধী শিবিরের মতে, নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট তাই নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো আগ্রহী হলেও নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ থাকে না। নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ছাড়া তারা কোনো ভোটে অংশ নেবে না।

অন্যদিকে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বেশিরভাগ ছোট দল এবারের উপজেলা নির্বাচনে অনাগ্রহী। দলগুলোর শীর্ষনেতাদের মতে, উপজেলা নির্বাচনে খরচ বাড়ায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আগ্রহ হারিয়েছেন। তাদের বড় একটি অংশ উপজেলা নির্বাচনে দলগতভাবেই অংশ নেবে না। তবে কেউ ব্যক্তিগত ইচ্ছায় নির্বাচন করলে বাধা নেই। দেশে ৪৯৫টি উপজেলা। ৪৮৫টি উপজেলায় চার ধাপে ভোট হবে। বাকিগুলোর মেয়াদ শেষ হলে ভোটগ্রহণ করা হবে। উপজেলা নির্বাচনের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের তফসিল ঘোষণা করেছে ইসি। প্রথম ধাপে মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় শেষ হয়েছে গতকাল সোমবার। প্রথম ধাপে ১৫০ উপজেলায় মনোনয়ন দাখিল করেছেন ১ হাজার ৮৯১ জন। এ তথ্য জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অতিরিক্তি সচিব অশোক কুমার দেবনাথ।

তিনি বলেন, এবার অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা নেওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান পদে ৬৯৬, ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৭২৪ ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৪৭১ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।

তফসিল অনুযায়ী, প্রথম ধাপের মনোনয়নপত্র বাছাই ১৭ এপ্রিল। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল ১৮ থেকে ২০ এপ্রিল। আপিল নিষ্পত্তি ২১ এপ্রিল, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২২ এপ্রিল। প্রতীক বরাদ্দ ২৩ এপ্রিল আর ভোটগ্রহণ ৮ মে। তৃতীয় ধাপের উপজেলা পরিষদের ভোটের তফসিল আগামীকাল ঘোষণা করা হতে পারে।

ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা বিধি ও আচরণ বিধি সংশোধন করেছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার পথ সহজ হলেও প্রার্থিতার জামানত ১০ থেকে ১৫ গুণ বেড়েছে। চেয়ারম্যান পদে জামানত ১০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে। ভাইস চেয়ারম্যান পদে জামানত ৫ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া রঙিন পোস্টারের ব্যবহারসহ একগুচ্ছ সংশোধনী আনা হয়েছে নতুন আইনে।

সদ্য সংশোধিত এসব বিধির আবারও সংশোধন চেয়ে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছে বেশ কিছু দল। বিধি সংশোধনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির ৬৩ জন প্রার্থী ছড়ি প্রতীকে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

দলটির প্রধান সংগঠক আবু লায়েস মুন্না বলেন, ‘উপজেলা নির্বাচনে নির্ধারিত জামানত কোনোভাবেই আমাদের দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এটা দেশকে বিরাজনীতিকরণের দিকে নিয়ে যাওয়ার আরেক কৌশল।’

উপজেলা নির্বাচনে দলগতভাবে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি। দলটির চেয়ারম্যান শাহাজাদা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা দলগতভাবেই অংশ নেব না। দলের অনেকেই উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিপক্ষে। নির্বাচন কমিশন উপজেলা নির্বাচনের বিধি বদলে নির্বাচনের যাওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এত টাকা খরচ করার সামর্থ্য আমাদের নেই। যারা দুর্নীতিবাজ, কালো টাকা আছে তাদের পক্ষে নির্বাচন অংশ নেওয়া সম্ভব।’

উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানতের টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে ১৪ দলীয় জোটের কয়েকটি দল। এসব দলের নেতারা বলেছেন, তৃণমূলে উপজেলা নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ থাকলেও জামানত বাড়াতে অনেকেই নির্বাচনের মাঠ থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। নেতাদের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের বিধি বাতিলের জন্য চিঠি পাঠালেও কমিশন তাতে গুরুত্ব দেয়নি।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা উপজেলা নির্বাচনে নেব। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের অযৌক্তিক ব্যয়বৃদ্ধির ফলে অনেকেই নির্বাচন করতে পারবে না। উপজেলা নির্বাচনে জামানত বাড়ানোর ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে আদর্শিক দলগুলো।’

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের মতো দলগুলোর নির্বাচনে অংশ নেওয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ নির্বাচন কমিশনের আইন পরিবর্তনের কারণে খরচ বেড়েছে। আমরা কমিশনকে চিঠি দিয়ে আইন সংশোধন করতে বলেছি। আমরা হয়তো সব জায়গায় প্রার্থী দিতে পারব না।’

সংসদ নির্বাচনের মতো উপজেলা নির্বাচনেও অংশ নেবে না বাম গণতান্ত্রিক জোট। বাম জোটের শীর্ষ নেতাদের মতে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ। তারা জামানত বাড়িয়ে গণবিরোধী আইন করেছে, যা মেনে নেওয়া যায় না। জনপ্রিয় গরিব ও মধ্যবিত্ত প্রার্থীর পক্ষে এ জামানত দিয়ে নির্বাচন করা সম্ভব নয়।

বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে ভোটে দাঁড়ানো ও ভোট দেওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি। আমাদের লড়াই হচ্ছে, নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করে ভোটে দাঁড়ানো ও ভোট দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা। কিছুদিন আগে যে জাতীয় নির্বাচন হলো তার ক্ষত এখনো শুকায়নি। তার ওপর উপজেলা নির্বাচনের বিধি বদলে নির্বাচন কমিশন জামানতের টাকা বাড়িয়েছে, খরচের পরিমাণ বাড়িয়েছে, রঙিন পোস্টার ফিরিয়েছে, যা তৃণমূল পর্যায়ের নির্বাচনকে কোটিপতিদের খেলায় পরিণত করেছে। আমাদের আন্দোলন চলছে। নির্বাচনী ব্যবস্থা রক্ষার লড়াই করছি আমরা। উপজেলা নির্বাচন নিয়ে আমরা ভাবছি না।’

উপজেলা নির্বাচনে দলগতভাবে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করা গণতন্ত্র মঞ্চ। এ জোটে থাকা দলগুলো জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো উপজেলা নির্বাচনও বর্জন করেছে। গণতন্ত্র মঞ্চের সংগঠক ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘আমরা মনে করি বাংলাদেশে ভোটের ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন বলতে বাস্তবে কিছু নেই। স্থানীয় সরকারের নির্বাচন সরকারি দলের দখলদারি, মাস্তানি, পেশিশক্তির মহড়ায় পরিণত হয়েছে। ৭ জানুয়ারির নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছি, উপজেলা নির্বাচনেও তাই হবে। আমরা দলগত বা জোটগতভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছি না।’

তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন জামানত বাড়িয়ে চূড়ান্ত স্বেচ্ছাচারিতার প্রমাণ দিয়েছে। আগে যেটুকু সুযোগ ছিল এখন তাও নেই। কালো টাকার মালিকদের জন্য নির্বাচনটা আরও অবারিত হচ্ছে। যারা জনগণের জন্য রাজনীতি করে তাদের আর ভোটে দাঁড়ানোর সুযোগ হবে না।’

স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনাস্থা, জামানত বৃদ্ধি সব মিলিয়ে অনেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত নিজেদের মধ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হবে কি না সন্দেহ।’

তিনি বলেন, ‘জামানত এত বাড়াতে হবে কেন? জামানতটা এমনভাবে নির্ধারণ করা উচিত যাতে কোনো প্রার্থীর কষ্ট না হয়। এখন নির্বাচন অর্থের কাছে বন্দি। বিত্তহীন মানুষ নির্বাচিত হয়েছে কবে লণ্ঠন জ্বালিয়ে তা খুঁজতে হবে। নির্বাচন কমিশন যে আইন করেছে তা অর্থহীন।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত