ঢাকার অপরাধজগতের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী খোন্দকার তানভীর ইসলাম জয় পলাতক অবস্থায় মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে মারা গেছেন। গত শুক্রবার কুয়ালালামপুরে একটি অ্যাপার্টমেন্টের তালাবদ্ধ ফ্ল্যাট থেকে স্থানীয় পুডু থানা পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে বলে জানা গেছে। এরপর সোমবার দুপুরে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরদিন মঙ্গলবার সেখানেই তাকে দাফন করা হয়েছে।
শীর্ষ সন্ত্রাসী জয় এতদিন তারেক রানা নামে ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়ে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছিল। ২০০১ সালে তাকেসহ ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ পুলিশ।
পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) তানভীরুল ইসলাম জয়ের মৃত্যুর বিষয়টি জেনেছেন। তারা বিষয়টি নিশ্চিত হতে মালয়েশিয়ার পুলিশের ইন্টারপোল শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
এনসিবি ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশনের (ইন্টারপোল) শাখা হিসেবে কাজ করে। ১৯৪টি দেশ ইন্টারপোলের সদস্য। ১৯৪টি দেশেই রয়েছে এনসিবি।
ঢাকায় পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, এ ব্যাপারে পুলিশের কাছে কোনো তথ্য নেই।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, তানভীর ইসলাম জয়ের মৃত্যুর তথ্য সঠিক। তবে তিনি ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়ে সেখানে অবস্থান করায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের কিছু করার ছিল না। যে কারণে তারা কোনো খোঁজখবর নেননি।
শীর্ষ সন্ত্রাসী জয়ের মৃত্যুর খবরের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবির দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি, ইন্টারপোল) আলী হায়দার চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি আমরা শুনেছি। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চেয়ে ইন্টারপোলের কুয়ালালামপুর এনসিবির কাছে ইমেইল পাঠানো হয়েছে। তারা বিষয়টি তদন্ত করে আমাদের জানাবে। এখন পর্যন্ত তারা কিছু জানায়নি। জয় ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড আসামি।’
কুয়ালালামপুরের স্থানীয় সূত্র বলেছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী জয় অনেক দিন ধরে কুয়ালালামপুরের একটি অ্যাপার্টমেন্টে একা বসবাস করছিলেন। কয়েক বছর আগে তিনি কিডনি রোগে আক্রান্ত হন। তাকে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতে হতো। ওই অ্যাপার্টমেন্টে একজন গৃহকর্মী দুদিন পরপর এসে রান্না ও ঘর পরিষ্কার করে চলে যেত। গত ১২ এপ্রিল সকালে সেই গৃহকর্মী জয়ের ফ্ল্যাটে এসে কলিংবেল বাজানোর পরও কোনো সাড়া না পেয়ে বিষয়টি অ্যাপার্টমেন্টের নিরাপত্তাকর্মীদের জানান। তারাও ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। পরে পুলিশ সদস্যরা এসে দরজা ভেঙে জয়ের লাশ উদ্ধার করে ইউনিভার্সিটি কেবাংসান মালয়েশিয়া (ইউকেএম) হাসপাতালে পাঠান। সেই হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের অধ্যাপক ফারিদা মুহা নুর লাশের ময়নাতদন্ত করেন।
মালয়েশিয়ার প্রবাসী বাংলাদেশি সাংবাদিকরা জানান, রবিবার ইউকেএম হাসপাতালের অধ্যাপক ফারিদা মুহা নুরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার সহকর্মীর ফোন নম্বর দিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। সোমবার সকালে সেই সহকর্মীর নম্বরে কল করা হলে তিনি জানান, সেখানে ভাইয়ের লাশের অপেক্ষায় বসে ছিলেন জয়ের এক বোন। ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি লাশ নিতেই মালয়েশিয়ায় ছুটে যান। অধ্যাপক ফারিদা মুহা নুরের সহকর্মী তাকে কথা বলতে অনুরোধ করলেও তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
তবে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, জয়ের বোন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কুয়ালালামপুরে গিয়ে সেখানকার ভারতীয় দূতাবাসে ভাইয়ের লাশ বুঝে পেতে লিখিত আবেদন করেন। সেই আবেদনের ভিত্তিতে দূতাবাস তাকে লাশ গ্রহণের অনাপত্তিপত্র বা এনওসি দেয়। সেটা হাসপাতালে জমা দিয়ে সোমবার তিনি লাশ গ্রহণ করেন। এরপর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দাফন করেন।
কে এই জয় : নব্বই দশকে ঢাকার অপরাধজগতের শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপ লিয়াকত-হান্নানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচিত হন তানভীর ইসলাম জয়। কলাবাগানের ধনাঢ্য একটি পরিবারের এই সন্তান সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদের সঙ্গে মিলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেন। সে সময় তাদের গ্রুপটি পুলিশের কাছে সেভেনস্টার নামে পরিচিতি পায়। জয়ের বিরুদ্ধে তিনটি হত্যাকাণ্ড, দুটি হত্যাচেষ্টা, ভয়ংকর অস্ত্র দিয়ে মারাত্মক জখম এবং চাঁদার জন্য শারীরিক ক্ষতির হুমকি দেওয়ার অনেক অভিযোগ ছিল।
২০০০ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা চাওয়ার অভিযোগে জয়কে গ্রেপ্তার করা হয়। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি ভারতে চলে যান। সেখানে থাকা অবস্থায় তারেক রানা নামে পাসপোর্ট করে ২০০১ সালে মালয়েশিয়া চলে যান। পরে আবার ভারতে ফিরে আসেন। ভারতে থাকার সময় তার নামসহ ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর পোস্টার প্রকাশ করে বাংলাদেশ পুলিশ।
২০০৫ সালে বাংলাদেশের অনুরোধে ইন্টারপোল ‘রেড কর্নার নোটিস’ জারি করে জয়ের বিরুদ্ধে। ২০০৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আফতাব আহমেদ খুনের ঘটনায় তার নাম আসে। ২০০৭ সালে রাজধানীর গড গিফট ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিতে গোলাগুলির ঘটনায়ও জয়ের জড়িত থাকার কথা উঠে আসে।
২০০৭ সালে ভারতে অবস্থানের সময় সিআইডি তাকে গ্রেপ্তার করে। সেখানে কিছুদিন জেল খেটে বেরিয়ে চলে যান কানাডায়। এরপর টরন্টোতে ‘এসজে ৭১’ নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে বসেন। সেখানে রানা অ্যাজাক্স নামে নিজের পরিচয় দিতে শুরু করেন। ২০১৫ সালে কানাডা পুলিশ তার ব্যাপারে তথ্য পেয়ে তদন্ত শুরু করে।
২০১৯ সালে কানাডার নির্বাচনের আগে তিনি সে দেশ ছেড়ে মালয়েশিয়ায় চলে যান। এরপর থেকে তিনি মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও থাইল্যান্ডে আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলেন। জয় দুই বিয়ে করেছিলেন। প্রথম স্ত্রী তার আপন মামি। সেই ঘরে একটি সন্তান আছে। তার বিদেশি দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরেও একটি সন্তান রয়েছে।
