বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মরুদেশের বানভাসি মানুষ ও জলবায়ু পরিবর্তন

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৪, ১০:৫৩ পিএম

গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের জাঁকজমকপূর্ণ শহর দুবাই নজিরবিহীন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হয়েছে। বলা হচ্ছে, গত ৭৫ বছরের মধ্যে এত বৃষ্টিপাত সংযুক্ত আরব আমিরাতের সবচেয়ে বড় এই শহরটি আর প্রত্যক্ষ করেনি। দুবাইয়ের আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় যে বৃষ্টিপাত হয়েছে তা সাধারণত দেড় বছরের বৃষ্টিপাতের সমান। ১৯৪৯ সালের পর থেকে এমন বৃষ্টিপাত আর কখনো হয়নি। সংবাদমাধ্যমের ভাষ্যমতে, এবারের অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতজনিত কারণে দুবাই শহরের রাস্তাঘাট, শপিংমল, মেট্রোস্টেশন, বিমানবন্দর সব ক্ষেত্রেই নাকি বানের পানিতে টইটুম্বুর। অতিবৃষ্টিজনিত বন্যায় রাস্তায় গাড়ি, বিমানবন্দরে বিমান সব কিছুই থইথই জলে ভাসছে। হঠাৎ মরুভূমির দেশে এত বৃষ্টিপাত শুধু দুবাইয়ের বাসিন্দাদের দুর্ভোগের কারণ হয়নি, প্রাণচঞ্চল দুবাই শহর থমকে গেছে, আটকা পড়েছে হাজার হাজার পর্যটক।

মরুর শহর দুবাই ঝড়বৃষ্টি ও বন্যার জন্য কোনোভাবেই প্রস্তুত না, এটা হয়তো তাদের প্রত্যাশার মধ্যেও ছিল না। আর ৭৫ বছরের আগের স্থানীয় জেলেদের একটি ছোট শহর দুবাই আর এখনকার দুবাই এই দুয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য তা সহজেই বোঝা যায়। এই দীর্ঘ সময়ে দুবাইয়ের জৌলুস তৈরি হয়েছে। এই নতুন দুবাই যখন তৈরি হয়েছে তখন জলবায়ু পরিবর্তন ও এর কারণে সম্ভাব্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় সম্পর্কে ভাবা হয়নি। তাই সমস্যা শুধু নজিরবিহীন বৃষ্টিপাতই না, সমস্যার একটা বড় অংশ তৈরি হয়েছে শহর জুড়ে যেভাবে অবকাঠামো তৈরি হয়েছে তা কোনোভাবেই প্রকৃতির এই খামখেয়ালি আচরণের জন্য প্রস্তুত না। এই সময়ে পৃথিবীর জলবায়ুর যে পরিবর্তনটা হয়েছে প্রধানত মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে, বিশেষ করে ধনী দেশগুলোর যথেচ্ছাচার ভোগ ও বিলাস-বসনের কারণে। সে কারণে প্রকৃতি যে এমন খামখেয়ালি আচরণ আবারও করবে না এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার সুযোগ আছে কি?

তবে মূল কারণটা সেখানেও না। কেন এই ঝড়বৃষ্টি তা নিয়ে ইতিমধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন দুবাই কর্র্তৃপক্ষ কৃত্রিম উপায় বৃষ্টিপাত সংঘটিত করার প্রচেষ্টার জন্যই এই ভয়াবহ পরিস্থিতি। এ নিয়ে সেখানকার সামাজিক মাধ্যমে বেশ সমালোচনার ঝড় উঠেছে। দুবাই ও মধ্যপ্রাচ্যের বড় বড় শহরগুলোই প্রায়ই কৃত্রিম উপায়ে মেঘ ঘনীভূত করে মরুর বুকে বৃষ্টি নামিয়ে থাকে। দুবাইয়ে কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টিপাতের চল বা ক্লাউড সিডিং শুরু হয়েছিল সেই ২০০২ সাল থেকে। সমালোচকরা বলেন, কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টিপাত ঘটনার প্রচেষ্টার ফলে এ ধরনের আকস্মিক বৃষ্টিপাতের ঘটনা ঘটেছে।  তবে দুবাইয়ের আবহাওয়া দপ্তর এই দাবি অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, এ সময়ে ঋতু পরিবর্তনের কারণে এই বৃষ্টিপাত এবং এ বছর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের নজির তৈরি হয়েছে। দুবাইয়ের অতিবৃষ্টি তারই একটি ধারাবাহিকতা। তবে অনেক বিশেষজ্ঞরা বলেছেন এই অতিবৃষ্টির জন্য দায়ী ধারাবাহিক জলবায়ু পরিবর্তন, ক্লাউড সিডিং করে এই পরিমাণ বৃষ্টিপাত ঘটানো সম্ভব না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই পুরো অঞ্চল জুড়ে একটি মেঘমালা বৃষ্টিপাত ঘটাচ্ছে আর তা ঘটেছে উষ্ণায়নের ফলে বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা সঞ্চয় হওয়ার কারণে।

গত বছর ২৮তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এই দুবাইতে। সম্মেলনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এই সম্মেলনে সারা বিশ্বের জলবায়ু আন্দোলনের কর্মীরা বিশ্ব জলবায়ুর উষ্ণতা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিশেষত উন্নত, ধনী ও জীবাশ্ম জ্বালানি সমৃদ্ধ দেশগুলোর প্রতি দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু অবস্থা ও দৃষ্টিভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হয়নি, জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগ অব্যাহত আছে। জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কোনো ধারণা না, এটি একটি বাস্তব সমস্যা। দুবাই ও ওমানের সাম্প্রতিক অতি বৃষ্টি তার প্রমাণ। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার পৃথিবীতে কার্বন নির্গমনের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। আর সংযুক্ত আরব আমিরাত হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম বড় জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ। আজকের দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সমৃদ্ধির পেছনে জীবাশ্ম জ্বালানির ভূমিকা যে অনস্বীকার্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে সবচেয়ে বড় পরিহাসের বিষয় হচ্ছে, জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে যে সুরম্য নগরী তারা তৈরি করেছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সেই নগরীও আজ আর কোনোভাবেই নিরাপদ না।

প্রকৃতিকে শোষণ করে উন্নয়নের দৃষ্টান্ত এক শতাব্দী যেতে না যেতে আজ একটি ব্যর্থতার ধারণায় পরিণত হয়েছে। আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে প্রকৃতি বিনাশী উন্নয়ন ও লাগামহীন ভোগবিলাস কোনোটাই টেকসই হয় না। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এবার ঝড়বৃষ্টি শুধু দুবাইয়ের জনজীবনে দুর্ভোগ তৈরি করেনি মুষলধারে ঝড়বৃষ্টিতে সংযুক্ত আরব অমিরাত ও পার্শ্ববর্তী দেশ ওমানে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটিয়েছে। আবার এই ঝড় এখন ইরান হয়ে আফগানিস্তানে বন্যার সৃষ্টি করে সেখানে জান ও মালের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ ও পরিবেশের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কয়েক বছর ধরে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর প্রভাবে সামনের বছরগুলোতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে এমনটাই জানিয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাচার। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর আবহাওয়ার পরিবর্তন এখন স্পষ্ট। প্রযুক্তির ব্যবহারে হয়তো কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টিপাত ঝরানো যায় কিন্তু প্রাকৃতিক বিপর্যয় কতটুকু ও কোন পর্যায় পর্যন্ত ঠেকানো সম্ভব তা প্রশ্নসাপেক্ষ। প্রযুক্তিরও সীমাবদ্ধতা আছে একপর্যায়ে গিয়ে মানুষকে প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতেই হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন নির্দিষ্ট কোনো একটি দেশকে দুর্যোগপ্রবণ বলা যায় না। এখন পুরো পৃথিবীই জলবায়ু পরিবর্তনের দুর্যোগের মুখোমুখি, যাকে বলে ‘প্লানেটারি ইমার্জেন্সি’। আর এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে গত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার যে আহ্বান জানানো হয়েছে তার দ্রুত বাস্তবায়ন দরকার। এর অন্যথা বিশ্ব তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি এই ধরনের বিপর্যয়কর পরিস্থিতি একের পর এক ঘটতেই থাকবে। তারপরও দুবাইয়ের মতো ধনী শহরগুলো হয়তো সাময়িকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারবে, বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের শহরকে আরও বেশি বৃষ্টিপাত সহিষ্ণু করে গড়ে তুলতে পারবে কিন্তু বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো যখন এ ধরনের হঠাৎ বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় তাদের জন্য পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে যায়, তখন দরিদ্র মানুষের জান ও মালের হুমকির পাশাপাশি প্রতিনিয়ত তার মৌলিক অধিকারগুলো লঙ্ঘিত হতে থাকে। 

মরুর দেশে এ ধরনের ঝড়বৃষ্টি এমন একসময় ঘটল যখন এই পৃথিবীতে এলনিনোর অবস্থা শেষের দিকে। এলনিনো হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর সমুদ্রপৃষ্ঠ উষ্ণায়নের একটি অবস্থা। যা প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর প্রকৃতিতে নিয়মিত আসে, সাধারণত নয় থেকে বারো মাস স্থায়ী হয়। এলনিনোর প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি পায় এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দুর্যোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। রেকর্ড বলছে, ২০২৩-২৪ সালের এলনিনো ইতিহাসের পাঁচটির মধ্যে একটি। সমুদ্রের তাপমাত্রা রেকর্ডবুক ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৩ সাল ছিল রেকর্ড বুকের ইতিহাসে সব থেকে উষ্ণতম বছর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলনিনোর এই চরমভাবাপন্নতার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা আছে। ডিসেম্বরের পর থেকে এলনিনো দুর্বল হতে থাকলেও আসছে মাসগুলোতে এর প্রভাব থাকবে। ইতিমধ্যে পরিবেশে নির্গত গ্রিন হাউজ গ্যাসে সঞ্চিত তাপমাত্রার প্রভাব দেখা যাবে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, এ বছরের মার্চ ও মে মাস এ সময়ে এলনিনোর ৬০ শতাংশ প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে। মে-জুন  পর্যন্ত ৮০ শতাংশ সম্ভাবনা এলনিনো বা লানিনোর নিরপেক্ষ অবস্থা বিরাজ করা।

দুবাই ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বৃষ্টিপাত আকস্মিক কোনো ঘটনা না। এটা জলবায়ু পরিবর্তনেরই ফল। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৃথিবীব্যাপী এ ধরনের দুর্যোগ আরও বাড়তে থাকবে যদি না পৃথিবীর উষ্ণায়নকে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়। আর এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা উন্নত ও জীবাশ্ম জ্বালানি সমৃদ্ধ দেশগুলোর। এখন এসব আকস্মিক দুর্যোগ থেকে তারা কতটুকু শিখতে পারবে সেটাই দেখার বিষয়।

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত