দেশের ব্যাংকিং খাতকে সংস্কারের উদ্দেশ্যে দুর্বল বা খারাপ ব্যাংকগুলোকে সবল বা ভালো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত (মার্জ) করার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইতিমধ্যে মূলধনের পর্যাপ্ততা, শ্রেণিকৃত ঋণের মাত্রা, ঋণ-আমানত অনুপাত এবং প্রভিশনিং বা নিরাপত্তা সঞ্চিতির পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
দেশের ব্যাংকিং খাত সংস্কারের জন্য এমন পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও ভেঙে পড়া করপোরেট সুশাসন ফেরানোর তাগিদ। যার প্রথম উদ্যোগ এক্সিম ব্যাংক এবং পদ্মা ব্যাংক একীভূতকরণ। গত ১৪ মার্চ ব্যাংক দুটি একীভূতকরণ করা হয়। পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও বিডিবিএল ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংক এবং ইউসিবি ও ন্যাশনাল ব্যাংক একীভূত করার ঘোষণা দেওয়া হয়।
বিভিন্ন কারণে ব্যাংকগুলো সংকটের সম্মুখীন। বাংলাদেশে ব্যাংক রানের মতো ঘটনা না ঘটলেও কিছু ব্যাংকে নন-পারফর্মিং এসেট তীব্র আকার ধারণ করেছে। মন্দ ঋণগুলো থেকে টাকা আদায় দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, আবার কেউ কেউ কৌশলগত ঋণখেলাপি হচ্ছে। স্বভাবত এসব নন-পারফর্মিং এসেট আর্থিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে ব্যাংক একত্রীকরণ নীতিগুলো স্বতন্ত্র নয় বরং মুদ্রা ও রাজস্ব নীতির অন্যান্য দিকগুলোর সঙ্গে একত্রে প্রণয়ন করা হয়। তাই ব্যাংক একত্রীকরণের ফলে খেলাপি ঋণের সংখ্যা হ্রাস পায় (উন্নত ঋণ স্ক্রিনিং এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা) এবং অর্থনীতির আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে। কারণ ভালো ব্যাংকগুলো ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি যদি আর্থিকভাবেও ভালো হয়, তাহলে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংককে বাঁচাতে পারে। ২০২২ সালে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো থেকে দুর্বল ব্যাংকের নন-পারফর্মিং অ্যাসেট (ঘচঅ) নিয়ে একটি গবেষণা করা হয়। এতে দেখা যায়, দুর্বল একত্রিত হওয়া ব্যাংকগুলোর ঘচঅ পূর্বের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস পায়। এ ছাড়াও একীভূত হওয়ার ফলে বৃহত্তর ব্যাংকগুলোর ব্যর্থতার কম সম্ভাবনা থাকে এবং ঋণগ্রহীতাদের ভবিষ্যতে ঋণ প্রবাহ অব্যাহত থাকে। তাই লোন পারফরম্যান্সের উন্নতি দুর্বল একীভূত ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের দ্বারা পরিচালিত হতে পারে, যেখানে কৌশলগত ডিফল্ট হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসে।
২০০৭ সালে ফিলিপ বন্ড এবং অশোক রাইয়ের একটি গবেষণায় ‘ইড়ৎৎড়বিৎ জঁহ’-কে ব্যাংকের স্বাস্থ্যের অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একবার ঋণ নেওয়ার পর স্বভাবতই গ্রহীতা প্রাথমিকভাবে অনুমান করে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের ঋণ গ্রহণ করতে পারবে। কিন্তু যদি সে মনে করে যে, শেষ পর্যন্ত ব্যাংকটি ভেঙে পড়বে, তাহলে ভবিষ্যতে ব্যাংকটি থেকে ঋণ পাওয়ার আশাও কমে যাবে। সে পরিস্থিতিতে সক্ষমতা থাকলেও অনেক ঋণগ্রহীতাই ঋণ পরিশোধ করতে চায় না কিংবা বিলম্বে ঋণ পরিশোধ করে যাকে ‘ইড়ৎৎড়বিৎ জঁহ’ বলে। একে কৌশলগত খেলাপিও বলা হয়। ১৯৯৪ সালে ম্যাক্সিকান ব্যাংকগুলোতে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছিল। তার অন্যতম কারণ ছিল কৌশলগত খেলাপি এবং ঋণগ্রহীতাদের সমন্বয় ব্যর্থতা। শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকের একীভূতকরণের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের শৃঙ্খল উন্নত হতে পারে এবং ঋণগ্রহীতার আস্তার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে করোনা-পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে নগদ টাকার সংকট মেটাতে গ্রাহকরা সিভি ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা আমানত ভাঙতে শুরু করে। ব্যাংকটি নগদ তহবিল জোগান দিতে সমস্যায় পড়ে। তারল্য সমস্যা সৃষ্টি হয়ে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। মূলত ব্যাংকের প্রতি আমানতকারীদের আস্থার সংকটের জন্য এমন হয়। পরবর্তী সময় সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকটি ফার্স্ট সিটিজেন ব্যাংকের সঙ্গে, সিগনেচার ব্যাংকটি ফ্ল্যাগস্টার ব্যাংকের সঙ্গে এবং ফার্স্ট রিপাবলিক ব্যাংকটি চেজের সঙ্গে একীভূত করা হয়। ব্যাংকিং সেক্টরের সামগ্রিক পতন রোধ করতে প্রায়ই বড় এবং আরও স্থিতিশীল ব্যাংকগুলোর সঙ্গে একীভূত করা হয়। কারণ, এটি পূর্বের পৃথক প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ কর্মক্ষমতার দিকে পরিচালিত করে। এ ছাড়াও ব্যাংকগুলোর স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর জন্য একীভূত করা প্রয়োজন। একীভূতকরণ আর্থিক বাজারের গতিশীলতাকেও প্রভাবিত করে। ভারত ও চীনের অর্থনীতিতে ব্যাংকের একত্রীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ভারতে পাবলিক সেক্টর ব্যাংকগুলোকে একত্রিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। লক্ষ্য ছিল ভালো, দক্ষ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য বড় আকারের ব্যাংক তৈরি করা। জাপানে ১৯৯০ দশকের শেষের দিকে আর্থিক সংকটের পর সরকার ব্যাংক একত্রীকরণে পদক্ষেপ নেয়। স্কেল অর্থনীতির মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন এবং ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলোর স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর লক্ষ্যে এটি করা হয়েছিল। মূলত একত্রীকরণ ব্যাঙ্কিং সেক্টরের কাঠামোকে পরিবর্তন করে যা ব্যাংকের ঋণ প্রদানের আচরণ, বাজারের প্রতিযোগিতা এবং মুদ্রানীতি ট্রান্সমিশন মেকানিজমকে প্রভাবিত করে। যদিও ব্যাংক একীভূতকরণে সাধারণ গ্রাহকদের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। তাদের রক্ষিত আমানত নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে। যে সব গ্রাহক আর্থিক পরিষেবার ওপর নির্ভর করত তাদের অনেকেই ভাবতে পারে সেগুলো নাও থাকতে পারে। তবে এ উদ্বেগগুলোর বাস্তবতা কম।
ব্যাংক একীভূতকরণ শুধু ব্যাংকিং শিল্প জগতে ব্যাংকের সংখ্যা হ্রাস করার একটি পন্থা নয় বরং অন্তর্নিহিত সমন্বয়, দক্ষতা বৃদ্ধিসহ অর্থ সরবরাহ, সুদের হার এবং মূল্যস্ফীতির মতো কারণগুলোকে প্রভাবিত করে। যা সামষ্টিক অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
যদিও, মূল লক্ষ্য খারাপ ঋণের ফলে উদ্ভূত আর্থিক সংকট কমানো এবং তা থেকে বেরিয়ে আসা। একীভূতকরণের ফলে ব্যাংকি শিল্পের পুনর্গঠন লাভজনকতার পাশাপাশি গ্রাহক পরিষেবা আরও বিস্তৃত হবে। তবে ব্যাংকগুলো সব গ্রাহকদের শক্তিশালী স্মার্ট ব্যাংকিংয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একীভূতকরণের চেষ্টা করে। সঠিকভাবে তা না হলে একীভূতকরণের উদ্দেশ্য ম্লান হয়ে যেতে পারে।
লেখক : ব্যাংক কর্মকর্তা
