হাম ভোট ডাল দিয়া

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৫৪ এএম

ভারতের নির্বাচন নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যাই বলা হোক না কেন, একটা কথা মানতেই হবে সমাজতাত্ত্বিক, বিশেষ করে সোফলজিস্ট বা নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের গবেষণার জন্য ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়া যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে ভারত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ। এখানে কেন্দ্রের ক্ষমতা দখল নেওয়ার কাজটি রীতিমতো যুদ্ধ।

‘গণতন্ত্রের উৎসব’ বলা হয় বটে, কিন্তু উৎসবের পাশাপাশি যেভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা, বিপুল বিজ্ঞাপন, পেশিশক্তির খোলাখুলি ব্যবহার, জনতার প্রাণ চলে যাওয়া, সংঘর্ষ, গোলাগুলি, রক্তপাত, রিগিংকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সব মিলিয়ে নিঃসন্দেহে বিশাল এক ক্যানভাস।

সংবাদমাধ্যম যেভাবে নির্বাচন কভার করে তা সাধারণত চেনা ছকে। প্রধানমন্ত্রী কী বললেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জনসভায় ভিড়, বিরোধী দলের সেলিব্রেটি ক্যান্ডিডেট ইত্যাদি ইত্যাদি। এর সঙ্গে হালে জুড়েছে শাসক দলের নেতার দলিত আদিবাসী ঘরে দুপুরে খাওয়া, কিংবা তারকা প্রার্থীদের অন্দর মহলের ‘এক্সক্লুসিভ কভারেজ’ যা শুধুমাত্র ওই চ্যানেলেই দেখা যাচ্ছে, এ রকম সব বাগাড়ম্বর। ভোটের দিনে নবতিপর বৃদ্ধ নাতির কোলে চলেছেন ভোট দিতে। দলে দলে বোরখা পরে মুসলিম মহিলারা নির্বিঘ্নে বুথে দাঁড়িয়ে রয়েছেন গণতন্ত্রের পক্ষে রায় দিতে। প্রত্যেকটি ইমেজ আলাদা আলাদা মনে হলেও আসলে সে ধীরে, সযত্নে সুখী ঝলমলে গণতান্ত্রিক ভারতের ছবি জনমনে পৌঁছে দেয়। ভোট তো উৎসব, ফলে অভাব, অভিযোগ, দলিত হত্যা, সংখ্যালঘু নিপীড়ন সব ভুলে দিনটি হয়ে ওঠে গণতন্ত্রের জয়ধ্বনি করার দিবস। ধর্ম, জাত, বহু ভাষাভাষী ভারতের বর্ণময় চরিত্র তুলে ধরাই তো মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার একমাত্র পবিত্র কর্তব্য।

কিন্তু এর বাইরেও থাকে আর এক ভারত। যেখানে মাওবাদী দমনের নামে আকাশ থেকে বোমা ফেলা হয় আদিবাসী গ্রামে। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পড়তেও আদিবাসী যুবক, মহিলা কিংবা কিশোর জানতে পারেন না যে, তিনি কোনো মাওবাদী না হলেও- কোন অপরাধে রাষ্ট্র তাকে মারল। ভোটের দিন এলে কখনো সখনো পালামৌ অথবা ছত্তিসগড়, বিহারের অন্য কোনো গ্রামের মহিলাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, কেন তারা ভোট দিতে যাচ্ছেন! অধিকাংশ মহিলা উত্তর দেন পাখি পড়ানোর মতো- এতো নাগরিক অধিকার আমাদের। অথচ বছরের পর বছর ওই মহিলারাই রাত থেকে মাইল মাইল হেঁটে হেজে যাওয়া নদীর বালি থেকে অনেক কষ্টে পানীয় জল আনতে যান, তা নিয়ে কেন প্রশ্ন তোলা হয় না? নাগরিক অধিকার নিয়ে এসব ভাবতে অবাক লাগে।

ইদানীং কিছু কিছু সমীক্ষা বলছে যে ভারতের অর্থনৈতিক বৈষম্য ব্রিটিশ যুগকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। হালে নাগরিক স্বাধীনতা থেকে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি সব ক্ষেত্রেই ভারতের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। নরেন্দ্র মোদির সরকার যত জোর গলাতেই নিজেদের সাফল্যের ঢাক পেটাক না কেন, বাস্তবে যে তা নয় তা তত্ত্ব তালাশ করলে যে কেউ বুঝতে পারবেন। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যত খারাপ হবে তত ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরি করা হবে। আপনি গাঁ-গঞ্জের হাটে মাঠে, কৃষি ক্ষেতে ক্যামেরা নিয়ে জনগণের মুখোমুখি হলে আসল ভারতকে চিনতে পারবেন। এমন এক দেশ যেখানে কোটিপতির সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। ঋণখেলাপির সংখ্যাও কম নয়। আটাশ জন ব্যাংকের টাকা মেরে বিদেশে পালিয়েছেন তাদের নামধাম দিয়ে দিতে পারি। কিন্তু হাজার হোক ‘স্বদেশি’ তো, তাই সবার সামনে বলে দিতে নিজেরই কুণ্ঠা হচ্ছে। তারা যে টাকা মেরেছেন তার অঙ্ক দশ ট্রিলিয়ন। টাকার হিসাবে তা কত হতে পারে আমি ঠিকঠাক জানি না। পারলে আপনারা হিসাব করে নেবেন। ভারতের ইলেকটোরাল বন্ড কেলেঙ্কারি, শোনা যাচ্ছে পৃথিবীর সব থেকে বড় কেলেঙ্কারি। স্বয়ং দেশের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের স্বামী এই স্ক্যাম যে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর তা নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন।

আমাদের শহুরে এলিট মধ্যবিত্তদের বড় অংশ মোদিজি মোদিজি বলে উদ্বাহু নৃত্য করলেও আসল ছবি, গ্রামীণ সর্বহারার বয়ানে ভারতের বিবর্ণ চিত্রটি মিডিয়াতে আসে না। আসবেও না। করপোরেট পুঁজি শাসিত সংবাদমাধ্যম কখনো স্বাধীন হতে পারে না। এমন এক দেশে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে উৎসব হচ্ছে, যেখানে প্রতি মাসে ফসলের ন্যায্য দাম না পেয়ে বাধ্য হয়ে আত্মহত্যা করছে। তবুও গণতন্ত্রের কথা অহরহ শুনতে শুনতে ক্লান্ত লাগে। কিন্তু এটা তো ঠিক ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষ ভোট দেন। নকশালপন্থিদের ভোট বয়কট করার আহ্বান সত্তর দশকে কতটা সাড়া ফেলতে পেরেছিল বলতে পারব না। খুব যে ফেলেনি অনুমান করতে পারি, না হলে অধিকাংশ নকশালপন্থি গোষ্ঠী ভোট বয়কটের নীতি থেকে সরে যেত না। একমাত্র মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি এখনো ভোট বয়কটের নীতি থেকে সরে আসেনি। তবে তাদের প্রভাব তো দেশের ছোট এক অংশে। মূলত আদিবাসী অধ্যুষিত অন্ধ্র, ওড়িশা, মহারাষ্ট্র, ছত্রিশগড়ে। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়নি সেখানেও বয়কটের ডাক খুব একটা সাড়া ফেলে। কাশ্মীরের মতো মাওবাদী এলাকাতেও ভোট হয় রাষ্ট্রীয় লাল চোখের ভয়ে। ভোটারদের বাধ্য করা হয় বুথে যেতে। বহির্বিশ্বের কাছে, ভয়ভীতি উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষ গণতন্ত্রের উৎসবে শামিল হয়েছেন এই বার্তা পৌঁছে দিতে। কিন্তু তা না করলেও মানুষ ভোট বয়কট করে ঘরে বসে থাকতেন এমন ধারণা কিন্তু ওই সব এলাকায় ঘুরে, মানুষজনের সঙ্গে মিশে মনে হয়নি। এখানেই কোথাও যেন গণতন্ত্রের ছায়া দেখতে পাই। ট্র্যাডিশনালি গণতন্ত্র, নির্বাচন এসব শব্দের প্রতি ভারতের জনমনে প্রভাব এখনো গভীরে। পড়শি দেশের থেকে আয়তনে ভারত বিশাল বলেও হতে পারে সেখানে ভোট দিতে না যাওয়ার প্রবণতা বাড়লেও ভারতে তা হয় না। এখানে বহুত্ববাদী রাজনৈতিক শক্তি রাজ্যে রাজ্যে বুলেট নয় ব্যালট একমাত্র সমাজ বদলের হাতিয়ার এই নীতিতে অতীব আস্থাশীল বলেই হয়তো।

ফলে শুধু সরকার কৌশলে এখনো ভোটের পথে। কেবল সরকারি দলই নয়, বিরোধী দলের সমর্থকরাও বিশ্বাস করেন ব্যালট বিপ্লবে। তারাও উদ্বুদ্ধ করে চলেন জনসাধারণকে, যে ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তন করা যায়। মনে আছে বিহারের এক প্রত্যন্ত গ্রামে একবার এক দলিত বৃদ্ধকে ভোটকেন্দ্র থেকে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, এমন করছেন কেন! কী হয়েছে! তার মুখে তখন যুদ্ধ জয়ের হাসি। আস্তে বললেন, হাম ভোট ডাল দিয়া। আমি ভোট দিতে পেরেছি। কল্পনা করা মুশকিল, অত বছর ধরে লোকটি বা আরও আরও জনগণ, স্রেফ দলিত, নিম্নবর্গের বলে কোনোদিন ভোট দিতে পারেনি। সামন্ততান্ত্রিক মাতব্বররা ভোট দিতেই দেয়নি, ভোটটা শাসকরা পাবে না এই আশঙ্কায়। পাশাপাশি নীচুজাত আবার ভোট কী দেবে এই মানসিকতার বিরুদ্ধে দলিতদের হাতিয়ার এখনো ভোট। তাই নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতেই জনগণ প্রখর রোদ উপেক্ষা করেও ভোটের লাইনে অপেক্ষা করতে থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

পাঁচ কিলোমিটার অন্তর যে দেশে ভাষা, সংস্কৃতি, পোশাক পরিধান বদলে বদলে যায় সেই দেশে নির্বাচনী সিস্টেম এক ধরনের ঐক্য ও জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলে এটা অস্বীকার করা যায় না। একবার পরিকল্পনা করেছিলাম, ক্যামেরা নিয়ে ভারতের ধাবায় ঘুরে ঘুরে ‘ভারত এক খোঁজ’ গোত্রের ডকুমেন্টারি ফিল্ম করব। ধাবা সম্পর্কে যারা জানেন তারা নিশ্চিত একমত হবেন সেখানে গেলে সর্বভারতের জনমানসকে বুঝতে পারবেন। লরির ড্রাইভার, খালাসিরাই ধাবার বড় খদ্দের। তাদের মুখ থেকেই জানা যায় এবারের ভোটে কোন দলের জেতার সম্ভাবনা বেশি। সেখানেও দেখবেন ক্ষোভ দুঃখ রাগের যাবতীয় প্রকাশ ঘটছে কাকে ভোট দিলে ভালো হবে এই আলোচনায়। কিন্তু ভোট দেব না এ কথা কিন্তু একবারও শুনবেন না।

লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত