খনার পূর্বাভাসে রাজ্যের কৃষকরা উপকৃত হতো বলে রাজা বিক্রমাদিত্য ‘নবরত্নের’ বাইরে খনাকে দশম রত্ন হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। খনার বচন হচ্ছে, মূলত কৃষিতত্ত্বভিত্তিক ছড়া। এর একটি হচ্ছে- ‘চৈত্র বৈশাখে পুড়লে মাটি, খালি পাবি ঘটি-বাটি।’ এর মানে হচ্ছে- এই সময়ে অতিরিক্ত গরম পড়লে, ফসল এবং জলের ঘাটতি প্রবল হয়। আবার তিনি বলছেন- ‘মাটির ধারে হইলে পাতা, শরীর পাবি শীতল তথা’। যার অর্থ দাঁড়ায়- গাছ রোপণে পরিবেশ শীতল থাকে, শরীরে প্রশান্তি আসে। কিন্তু আমরা এইসবের কোনো ধার ধারি না। যে কারণে দ্রুতগতিতে শুধু সভ্যতার নামে এগিয়ে যাচ্ছি, নগরায়ণের দিকে। দূষণে ক্রমান্বয়ে জীবন হচ্ছে জবুথবু। বর্তমান এবং ভবিষ্যতের কোনো ভাবনা নেই। যে কারণে প্রচ- গরমে এক দুর্বিষহ জীবন পার করছে দেশের মানুষ। তাপপ্রবাহে পুড়ছে দেশ। প্রকৃতির এই রুদ্রমূর্তি অস্বাভাবিক মনে হলেও, কোনোভাবেই তা আকস্মিক নয়। প্রকৃতি দীর্ঘসময়ের অত্যাচারের প্রতিশোধ নিচ্ছে, মাত্রাতিরিক্ত তাপপ্রবাহ বিকিরণ করে। অসহায়ের মতো আমরা শুধু বলি- কবে বৃষ্টি হবে? কবে পরিত্রাণ পাব এ থেকে?
তাপপ্রবাহে দেশ পুড়ছে। তীব্র গরমে শহর কিংবা উপকূলীয় এলাকা সবখানেই জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শনিবার দেশের বিভিন্ন জায়গায় হিট স্ট্রোকে তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। হিট স্ট্রোক থেকে শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে এক সপ্তাহ স্কুল ও কলেজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তীব্র তাপপ্রবাহ থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনামন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন। জানিয়েছেন, যারা বয়স্ক ও শিশু তারা যেন প্রয়োজন না থাকলে ঘরের বাইরে না যায়। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, যাতে কেউ কোনো রোগে আক্রান্ত না হয়। হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচতে ডাবের পানি, স্যালাইন ও তরল জাতীয় খাবার খেতে হবে।
চলতি মাসে বৃষ্টিপাত হবে কম। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়ার ফলে মাস জুড়ে থাকবে গরমের আধিক্য। এরইমধ্যে সারা দেশে হিট অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। চলমান তাপপ্রবাহের কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে রবিবার গুচ্ছ প্রতিবেদন ‘তাপপ্রবাহে পুড়ছে দেশ’ প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে, হিট স্ট্রোকে দেশব্যাপী এ পর্যন্ত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। সারা দেশের ওপর দিয়ে প্রবহমান তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু এমন জীবননাশী পরিবেশ থেকে মানুষ মুক্তি পাবে কবে? জানা গেছে, আজ অথবা আগামীকাল ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। অস্বস্তি বিরাজ করতে পারে জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে। আপাতত স্থায়ীভাবে গরম থেকে নিস্তার পাওয়ার কোনো সুখবর নেই। চলতি মাস জুড়েই আবহাওয়ার পরিস্থিতি এমন থাকবে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। দেশের ওপর দিয়ে চলমান তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে এবং তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। বায়ুমন্ডল দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার জানাচ্ছেন ‘পাথুরে মাটি তাপমাত্রা দীর্ঘক্ষণ ধরে শোষণ করে। বালিমাটি খুব তাড়াতাড়ি গরম অথবা খুব তাড়াতাড়ি ঠান্ডা হয়ে যায়। আমাদের দেশে প্রচুর অবকাঠামো হচ্ছে। এখন অবকাঠামো বেশি আর সবুজায়ন যদি কম হয় আবার পানির স্তর যদি নিচে নেমে যায়, তখনই আবহাওয়া চরমভাবাপন্ন হয়ে ওঠে।’
দেশ জুড়ে গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। দিশেহারা মানুষ এবং প্রাণিকুল। নানা রকম অসুখবিসুখে আক্রান্ত হচ্ছে অনেকেই। হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এই মুহূর্তে সতর্কভাবে জীবনযাপনের বিকল্প নেই। সচেতনতা এবং সতর্কতাই আমাদের একমাত্র বাঁচাতে পারে। আমরাই যদি আমাদের রক্ষা করতে না শিখি, তাহলে সরকারের কী দোষ!
