৫ বছর আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একজন চেয়ারম্যান বলেছিলেন, ‘সরকারি সংস্থাগুলোয় যারা সময়মতো সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন, তাদের বেতন থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা উচিত।’ এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা ভাবতে পারেন। বেঁধে দেওয়া সময়ে তদন্ত বা অনুসন্ধান শেষ করতে না পারলে প্রয়োজনে দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা থেকেও ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করা যায় কি না, সেটাও ভেবে দেখা হবে।’ আবার ২০১২ সালে দুর্নীতি রোধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সাড়ম্বরে চালু করা হয়েছিল ‘সততা বিভাগ’। তবে অভিনব এই উদ্যোগে এনবিআরে দুর্নীতি রোধ তো হয়ইনি; বরং দিন দিন দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হচ্ছে রাজস্ব সেক্টর। পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে দুর্নীতি চলেছে এনবিআরে। এই সেক্টরের দুর্নীতির অভিযোগের ফাইল বাড়ছে দুর্নীতি দমন কমিশনে। কিন্তু লাভ নেই। দুদকেও একই অবস্থা। এর ওপর আবার বাংলাদেশ ব্যাংকে। সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘রাজনৈতিক কারণে সেবা দিতে ব্যর্থ দুদক এনবিআর’ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
দুদক, বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা এনবিআরের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণকে সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সবার জন্য বৈষম্যহীন প্রাতিষ্ঠানিক সেবার বদলে সেবাদানের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনা করা হয়। একদিকে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রভাবে এসব প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। ‘ইজ দ্য বাংলাদেশ প্যারাডক্স সাসটেইনেবল?’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এমনই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং গবেষকরা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)’ সোমবার ব্র্যাক সেন্টার ইনে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। দুর্নীতি, খেলাপি ঋণ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সুশাসনের অভাব প্রসঙ্গে বিভিন্ন বক্তার সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে সরকার। তবে রাতারাতি সব সংস্কার সম্ভব নয়।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের চেয়ারম্যান ড. রেহমান সোবহান বলেন, ‘আমাদের দেশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নিয়ে অনেক কথা হয়। ভালো কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও চিহ্নিত করা দরকার। দুদক, বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা এনবিআরের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণকে সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। যখনই সংস্কারের উদ্যোগ আসে, সেখানে সংস্কারের বিপক্ষে একদলের তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। তারা এগুলো হতে দেয় না। এতটাই শক্তিশালী অবস্থান যে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এখন বড় ধরনের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও উদ্যোগ প্রয়োজন।’
বইটির লেখক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘বইটিতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মানসম্মত প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ছাড়াই একধরনের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া দ্বিতীয় ধাপের প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।’ ড. রায়হান আরও বলেন, ‘স্থিতিশীল দুর্নীতির জায়গা এখন বাংলাদেশ। এখানে এখন সংস্কার প্রয়োজন।’ বইটির আরেক লেখক অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, ‘একদিকে ব্যাংক ভালো ব্যবসা করছে, অন্যদিকে ব্যাংক খাতে আবার ঋণখেলাপি বাড়ছে। এটাই একটি স্ববিরোধী অবস্থান তৈরি করছে, যাকে আমরা প্যারাডক্স বলছি। রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনিয়ম-দুর্নীতি বেসরকারি ব্যাংকে এসে পড়ছে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, ‘আমাদের দেশের আর্থিক খাতের সুশাসন না হলে সেখানে আরও বেশি সমস্যা হবে।’ আলোচনায় যুক্তরাজ্যের উলস্টার ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. এস আর ওসমানি বলেন, ‘সাধারণত সুশাসন না থাকলে উন্নয়ন হয় না। তবে বাংলাদেশে তা সম্ভব হয়েছে। সেদিক থেকে গ্রন্থের নামকরণ সার্থক।’
আলোচনায় যেসব যৌক্তিক সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে, তার সমাধান প্রয়োজন। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার দায় খুঁজে দেখা দরকার। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকলে, বিষয়টি কঠিন কিছু নয়। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিছু ভাববেন?
