গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস, যাকে আমরা বলি ফাদার অব মেডিসিন। খ্রিস্টের জন্মের ৪০০ বছর আগেই বলেছিলেন, ‘হিট স্ট্রোকে’র কথা। অনেকে যাকে ‘সান স্ট্রোক’ও বলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হচ্ছে, হাইপারথার্মিয়া। এটি এমন এক অবস্থা, যেখানে নানা কারণে একজন ব্যক্তির শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বাড়িয়ে দেয়। শরীর যত বেশি তাপ উৎপন্ন বা শোষণ করে, তার চেয়ে বেশি তাপ বিচ্ছুরণ করে। যখন তাপমাত্রার চরম উচ্চতা দেখা দেয়, তখন এটি একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সিতে পরিণত হয়। মৃত্যু রোধ করার জন্য অবিলম্বে প্রয়োজন চিকিৎসার। হাইপারথার্মিয়ায় প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় অর্ধ মিলিয়ন মানুষ মারা যাচ্ছে। যার লক্ষণগুলোর মধ্যে ভারী ঘাম, দ্রুত শ্বাস এবং দুর্বল স্পন্দন অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। যদি পর্যায়টি হিট স্ট্রোকের দিকে অগ্রসর হয়, তখন রক্তনালিগুলো প্রসারিত হয়ে যায়। তখন ঘামের মাধ্যমে শরীরকে ঠা-া করতে না পারলে ত্বক শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। থার্মোরেগুলেশন ভাঙনের ফলে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি শরীরকে জৈব রাসায়নিকভাবে প্রভাবিত করে। এর সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে হিট স্ট্রোক। এটি এমন একটি তীব্র তাপমাত্রার উচ্চতা, যা অত্যধিক তাপের সংস্পর্শে বা তাপ এবং আর্দ্রতার সংমিশ্রণের কারণে হয়।
গত কয়েক বছরে দেশে ‘হিট স্ট্রোক’ বেশ পরিচিতি পেয়েছে। তবে বছরে কত মানুষ হিট স্ট্রোকে মারা যায়, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। চলতি তাপপ্রবাহে কত মানুষ মারা গেছে, সে বিষয়েও সরকারি বা বেসরকারি ডেটাবেজ তৈরি হয়নি। হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়েও স্বচ্ছ ধারণা নেই চিকিৎসকদের। কী কী উপসর্গ নিয়ে মানুষ হিট স্ট্রোকে মারা যায় বা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলে তাকে কী চিকিৎসা দেওয়া দরকার, সে বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা নেই অনেক চিকিৎসকের জানা গেল দেশ রূপান্তরে গতকাল শনিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে। ‘হিট স্ট্রোকের চিকিৎসা জানা নেই কারও’ প্রতিবেদন জানাচ্ছে হিট স্ট্রোক বিষয়ে চিকিৎসকদের সঠিক ধারণা না থাকার কথা স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ও ওষুধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. রোবেদ আমিন। তিনি বলেন, ‘হিট স্ট্রোকের বিষয়টি একেবারেই নতুন। অধিকাংশ চিকিৎসক ও নার্স এ বিষয়ে সঠিক জানেন না। এ চিকিৎসকরা যখন মেডিকেলে পড়াশোনা করেন, তখন পাঠ্যসূচিতে এ বিষয়ে কিছু ছিল না। এমনকি গাইডলাইনও ছিল না। অনেকে আগ্রহ থেকে ঘাঁটাঘাঁটি করে তথ্য জেনেছেন।’ হিট স্ট্রোকের মতো জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় নির্দেশিকার (গাইডলাইন) খসড়া তৈরি করা হয়েছে। ৭১ পাতার নির্দেশিকায় হিট স্ট্রোকের রোগীদের বিষয়ে চিকিৎসকদের স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে এ গাইডলাইনের ভিত্তিতে প্রশিক্ষণও শুরু হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের দেশে চিকিৎসায় এখনো এ বিষয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো চিকিৎসা নেই!
এত দিন পর সবাই নড়েচড়ে বসেছেন তখনই, যখন দেশের প্রায় সব অঞ্চলে তাপপ্রবাহ বইছে। এর মধ্যে ৯টি অঞ্চলে বইছে তীব্র তাপপ্রবাহ। বাড়ছে হাসপাতালে রোগী। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক মানুষ বেশি অসুস্থ হচ্ছেন। ইমেরিটাস অধ্যাপক ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলছেন, ‘আমি কয়েক বছর ধরে হিট স্ট্রোক নিয়ে কথা বলছি। যেহেতু বিষয়টি নতুন, তাই এ বিষয়ে চিকিৎসকদের তেমন ধারণা নেই। যে গাইডলাইন তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত সারা দেশের চিকিৎসকদের কাছে পাঠিয়ে দিতে হবে। অনলাইনে কিছু প্রশিক্ষণ দিলে ভালো হয়, তাহলে চিকিৎসকরা রোগীদের জরুরি সেবা দিতে পারবেন।’ হিট স্ট্রোকের লক্ষণগুলো জানা থাকলে নিজে যেমন সতর্ক থাকা যায়, অন্যদের দিকেও খেয়াল রাখা যায়। দ্রুত হৃৎস্পন্দন, হাইপারভেন্টিলেশন, বমি বমি ভাব, বিরক্তি, বিভ্রান্তি বা প্রলাপ বকা, কথা জড়িয়ে যাওয়া, পেশিতে ব্যথা, দুর্বলতা ও অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, ঘাম না হওয়া এসব টের পাওয়া মাত্র প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় নির্দেশিকায় যা প্রস্তুত করা হয়েছে, তা দ্রুত দেশের সব হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হোক। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ দেওয়া হোক সব চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের। কোনো মানুষ হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে তাকে যেন চিকিৎসাশাস্ত্র অনুযায়ী, দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া যায়। এ বিষয়ে দেশব্যাপী সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার।
