আইপিএলে ব্যাটারদের কাছে নিরাপত্তাহীন বোলার

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৪, ১১:০২ এএম

'ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। আমি এই যুগের ক্রিকেটার নই বলে।' মজার ছলেই কথাটা বলেছেন কিংবদন্তি ওয়াসিম আকরাম। সুলতান অব সুইংখ্যাত পাকিস্তানি এই পেসার আইপিএলে রানের বন্যা দেখেই এমন মন্তব্য করেছেন। এবারের আইপিএলে রানের ফোয়ারা ছুটিয়ে দিচ্ছেন ব্যাটসম্যানরা। ২০০ রানের সংগ্রহকে যেন হাতের মোয়া বানিয়ে দিয়েছেন তারা। এমনকি প্রায় ৩০০ ছোঁয়া ইনিংসও দেখা গেছে। ব্যাটসম্যানরা যেন রানমেশিন। ব্যাটে বল ছুঁলেই ছক্কা হয়ে যায়।

রানের দিক দিয়ে সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবারের আইপিএলে। ইডেন গার্ডেন্সে কলকাতা নাইট রাইডার্স ২৬১ রান করেছিল। সেই রান আবার ৮ বল হাতে রেখেই তাড়া করে জিতে যায় পাঞ্জাব কিংস। স্বীকৃত টি-টোয়েন্টিতে এত রান তাড়া করে জেতার নজির পরশু রাতেই প্রথম দেখেছে বিশ্ব। সেই ম্যাচে ছক্কা হয়েছে ৪২টি, পাঞ্জাব মেরেছে ২৪টি। রানমেশিন না বলে কি আর উপায় থাকে!

তবে কলকাতা নাইট রাইডার্সের ফিল্ডিং কোচ রায়ান টেন ডেশকাটে মনে করেন, ব্যাটসম্যানদের এই একপেশে দাপটে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন বোলাররা। এ থেকে বেরোনোর উপায় খুঁজে বের করতে না পারলে রান-উৎসব চলতেই থাকবে। ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলেনে তিনি বলেছেন, ‘এই ব্যাটিং তাণ্ডব সব প্রতিযোগিতাকে ছাড়িয়ে গেছে। বোলারদের জন্য যদি কিছু থেকে থাকে, তা হলো ভয়ের উপাদান। আমার মনে হচ্ছে, বোলারদের সঙ্গে উল্টো কিছু ঘটছে। ওদের জন্য এমন বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা একেবারেই নতুন। ব্যাটসম্যানরা যেভাবে ব্যাট করছে, তা দেখে মনে হচ্ছে বোলাররা একধাপ পিছিয়ে যাচ্ছে।’

বোলারদের জন্য এমন ভুতুড়ে পরিস্থিতি সেদিনই প্রথম নয়। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের বিপক্ষে ২৭৭ রানের রেকর্ড সংগ্রহ করেছিল সানরাইজার্স হায়দরাবাদ। আইপিএলের ইতিহাসে এটাই ছিল সর্বোচ্চ সংগ্রহ। তবে তিন সপ্তাহ পর সেই রেকর্ড ভেঙে ২৮৭ রানের নতুন চূড়ায় ওঠে সানরাইজার্সই। সেই ২৮৮ রানের লক্ষ্য তাড়ায় নেমে বেঙ্গালুরু আবার থামে ২৬২ রানে। টি-টোয়েন্টি ইতিহাসে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ রানের (৫৮৯) রেকর্ড হয়েছে সেই ম্যাচে।

এতো রান দেখে চোখ কপালে উঠবে যে কারোরই। কারণ এখন পর্যন্ত ৪৩টি ম্যাচ হয়েছে। এর মধ্যে ২৬টিতেই দেখা গেছে ২০০ রানের ইনিংস। একাধিক ম্যাচে উভয় ইনিংসেই দেখা গেছে ২০০-এর বেশি রান। সানরাইজার্স হায়দরাবাদের এমন বিধ্বংসী ব্যাটিং দেখে ওয়াসিম আকরাম বলেছেন, ‘৫ ওভারে ১০০ করাটা বেআইনি।’

তবে ২০০-এর বেশি সংগ্রহ তারা পেয়েছে ৪ বার। এ ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ২০০ রানের সংগ্রহ পেয়েছে কলকাতা নাইট রাইডার্স। তারা ৫ বার এই রান সংগ্রহ করেছে। এ ছাড়া মুম্বাই ৩ বার, পাঞ্জাব, বেঙ্গালুরু ও চেন্নাই দুবার করে এবং রাজস্থান, গুজরাট ও লখনৌ পেয়েছে একবার করে।

আইপিএলে ২০০ রানের সংগ্রহ সূচনালগ্ন থেকেই হয়ে আসছে। তবে সর্বোচ্চ সংগ্রহের যে রেকর্ড, সেটা স্থায়ী থেকেছে অনেক দিন। তা ভাঙতে কয়েক বছর লেগেছে। যেমন ২০০৮ সালে চেন্নাই সুপার কিংস করেছিল ২৪০ রান। সেটা ভাঙতে সময় লেগেছিল ২ বছর। ২০১০ সালে ২৪৬ রান করেছিল সেই চেন্নাইই। এরপর ২০১৩ সালে বেঙ্গালুরু পুনে ওয়ারিয়র্সের বিপক্ষে করে ২৬৩ রান; যা স্থায়ী ছিল দীর্ঘ ১১ বছর। এবারের আসরে এসেই সেটা ভাঙে হায়দরাবাদ। এক দশকের বেশি সময় যে রেকর্ড ছিল শীর্ষে, সেটা টুর্নামেন্টের মাঝপথে এসেই নেমেছে ৫ নম্বরে।

অনেকের দাবি, মাঠের আয়তন ছোট এবং বেশিরভাগ উইকেট ব্যাটিং উপযোগী হওয়ায় এবার এত রান হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে বেঙ্গালুরু, ইডেন গার্ডেন্স ও ওয়াংখেড়েতেই ছক্কা-বৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। এসব মাঠ ব্যাটসম্যানদের স্বর্গরাজ্য আর আয়তনেও ছোট। কিন্তু এবার চেন্নাইয়ের চিপকের মতো স্পিন সহায়ক উইকেটেও রানের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। হায়দরাবাদ, ভিশাকাপাটনাম কিংবা দিল্লিÑ কোথাও বাদ যাচ্ছে না। প্রায় সব গ্রাউন্ডই দেখে ফেলেছে ২৫০ রানের সংগ্রহ।

আবার কারও যুক্তি 'ইমপ্যাক্ট সাব' এর কারণে রান বেশি হচ্ছে। গত বছর চালু হওয়া নিয়মটার পূর্ণ ফায়দা এই আসরে তুলে নিচ্ছে দলগুলো। বেশিরভাগই সানরাইজার্সের ব্যাটে। জস বাটলারের যে সেঞ্চুরিতে ইডেনে রাজস্থান জিতেছিল, সেদিন বাটলার ছিলেন ইমপ্যাক্ট সাব। যদি তীব্র গরমে শুরু থেকে খেলতেন, তাহলে এই ইনিংসটা না-ও খেলতে পারতেন। স্টেমিনা আর মনোবল ধরে রেখে ম্যাচ বের করতে পেরেছেন এই নিয়মের কারণে। এ নিয়মের আদর্শ উদাহরণ শিভাম দুবে, সূর্যকুমার যাদব, সাই সুদর্শনও। তাতে করে আইপিএল জমে উঠেছে।

বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট লিগটির চলমান আসরে সংগ্রহের উচ্চতা অনেক বেড়েছে। শুধু ২০০ করলেই কেউ আর নিরাপদ না। গতকাল যেমন দিল্লি ২৫৭ রান করেও জয় পেয়েছে ১০ রানে। জিতলেও শেষ ওভার অবধি তারা ছিল শঙ্কায়।

টুর্নামেন্টের সবশেষ ৫ আসরের পরিসংখ্যান বিবেচনা করলে দেখা যায়, আইপিএলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ২০০ রানের সংগ্রহ হয়েছিল গত বছর। সংখ্যাটা ৩৭। তবে সর্বোচ্চ ছিল ২৫৭ রানের ইনিংস; যা করেছিল লখনৌ সুপার জায়ান্ট।

২৪০ রানের বেশি স্কোর ছিল ওই একটাই। ২০২২ সালে ১৮ বার হলেও সর্বোচ্চ ছিল রাজস্থান রয়্যালসের ২২২। ২০২১ সালে মাত্র ৯টি ২০০-এর বেশি স্কোর দেখা গেছে। তবে সর্বোচ্চ ছিল মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের ২৩৫।

এই পরিসংখ্যান দেখেই বোঝা যায় এবার সংগ্রহের উচ্চতা কতখানি বেড়েছে। ২৬টির মধ্যে ১০টি ইনিংসই ২৪০-এর বেশি সংগ্রহ দাঁড় করিয়েছিল। আর এসব সংগ্রহ গড়ার পথে উঠে আসছেন নতুন সব ক্রিকেটার।

আভিষেক শর্মা, রিয়ান পারাগ, শশাঙ্ক সিংহরা আলো ছড়াচ্ছেন ব্যাট হাতে। তাদের ব্যাটিংশৈলীতে এবারের আইপিএল আসরটা মাঝপথেই হয়ে উঠছে রেকর্ড আসর। এখনো বাকি লিগ পর্বের ৪০ ম্যাচ। প্লে-অফ আর ফাইনাল তো আছেই। বাকি পথে কী হয় কে জানে!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত