তীব্র গরমে কার্যত হাঁসফাঁস অবস্থা। কর্মস্থল কিংবা বাইরে থেকে ঘরে ফিরে একটু যে ফ্যান বা এসির নিচে বসে জুড়োবেন তার উপায় নেই। কারণ শত্রু লোডশেডিং। সকাল হোক বা রাত, যখন-তখন হুটহাট চলে যাচ্ছে বিদ্যুৎ। কদিন আগেও ঢাকায় বিদ্যুতে স্বস্তি থাকলেও চিত্রটা এখন পাল্টে গেছে। রাজধানীতে এমনিতেই আলো-বাতাসের অভাব। এর সঙ্গে লোডশেডিং যোগ হওয়ায় মানুষের কষ্ট অনেক বেড়েছে। তবে ঢাকার বাইরে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের ভয়াবহতা অনেক তীব্র।
লোডশেডিংয়ের কারণে এ গরমে জনজীবন হয়ে উঠেছে বিপর্যস্ত। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা ব্যাঘাত ঘটছে। অন্যদিকে কারখানায় উৎপাদন কমার পাশাপাশি ব্যয় বাড়ছে। তীব্র তাপপ্রবাহে বোরো ধানের ক্ষেতের মাটি শুকিয়ে গেলেও লোডশেডিংয়ের কারণে পর্যাপ্ত পানি দিতে পারছেন না অনেক কৃষক। দ্রুত পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা করা না গেলে ধানগাছের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
কয়েক দিন ধরে ঢাকাতেও লোডশেডিং শুরু হয়েছে। রাজধানীর কল্যাণপুর, বনানী, মিরপুর, আদাবর, জুরাইন, দনিয়া, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া গেছে।
শুধু গ্রামে লোডশেডিং না দিয়ে প্রয়োজনে সমহারে ঢাকা এবং অন্যান্য এলাকায় লোডশেডিং দেওয়ার জন্য সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন।
বিদ্যুতের লোড ব্যবস্থাপনা নিয়ে গত ২২ এপ্রিল সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে লোড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অর্থাৎ এখন থেকে শহরেও যৌক্তিক লোডশেডিং দেওয়া হবে। পাশাপাশি বড় বিপণিবিতান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়ে সাশ্রয়ী নীতি নেওয়া এবং রাত ৮টার পর মার্কেট বন্ধের নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে তাপমাত্রা না কমলে কিংবা বৃষ্টি না কমলে লোডশেডিং থেকে আপাতত মুক্তির উপায় নেই। আমদানিকৃত এলএনজির (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) পাশাপাশি তরল জ্বালানির (তেল) ওপর ভর করে বিদ্যুতের লোডশেডিং সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না সরকার।
বিদ্যুৎ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব হাবিবুর রহমান বলেছেন, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকার কারণে লোডশেডিং হচ্ছে। তবে তাপপ্রবাহ কমে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া এমনিতেই বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। এর সঙ্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বা এসির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় চাহিদা বেড়েছে আরও।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার গুলশানে ষষ্ঠ হামিদুর রহমান জাতীয় ইয়ুথ শুটিং চ্যাম্পিয়নশিপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, ‘লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে, এর চেয়ে খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুতের কারণে সেচকাজ যেন বাধাগ্রস্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রয়েছে।’
গত ২৩ এপ্রিল দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ২৩৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। এর দুদিন আগে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড ছিল ১৫ হাজার ৬৬৬ মেগাওয়াট। ঢাকার বাইরে অঞ্চলভেদে চাহিদার তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি থাকছে। গ্রামে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
রাজধানীর কল্যাণপুরের বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এই তো কিছুক্ষণ আগে কারেন্ট গেল। মাত্র ৫ ঘণ্টা হলো। এখন রাত প্রায় ৪টা বাজে। দুই বাচ্চাকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস দিচ্ছি। আর সঙ্গে ভাবছি, সরকারকে কয়েকটা কারণে ধন্যবাদ দেওয়া যায়। প্রথমত আমার অনেক বিদ্যুৎ বিল বেঁচে গেল। কারণ কারেন্ট থাকলে এসি, ফ্যান ননস্টপ চলত। এখন তাপপ্রবাহ চলছে, প্রচন্ড গরম। দ্বিতীয়ত হাতপাখা দিয়ে বাতাস অনেক দিন করা হয় না। হাতের এক্সারসাইজটা হয়ে গেল।’
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রমতে, গত বছর বিদ্যুতের চাহিদা ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার মেগাওয়াট। এ বছর চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে বলে পিডিবি প্রক্ষেপণ করেছে। গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়ে গড়ে সাড়ে ১৪ হাজার থেকে সাড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে বর্তমানে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৬ হাজার মেগাওয়াট। সক্ষমতা থাকলেও চাহিদা অনুসারে বিদ্যুৎ উৎপাদিত না হওয়ার জন্য জ্বালানি সংকট এবং কেন্দ্র মেরামত ও সংরক্ষণের জন্য বন্ধ থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন কর্মকর্তারা। এ ছাড়া বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের ত্রুটির কারণে প্রায় বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে।
চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারায় ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতেও লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
গত শনিবার ১৫ হাজার ৯১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৫ হাজার ১৭ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল। ওইদিন ঢাকায় ১০০ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামে ১৩০ মেগাওয়াট, রাজশাহীতে ১১০ মেগাওয়াট, কুমিল্লায় ২০০ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে ২৩৮ মেগাওয়াট এবং রংপুর বিভাগে ১২০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি থাকায় লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে ওইসব এলাকায়। তবে খুলনা, সিলেট ও বরিশাল বিভাগে ঘাটতি ছিল না বলে পিডিবি দাবি করলেও ওইদিন বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বিদ্যুতের ঘাটতি ৯০০ মেগাওয়াট বলা হলেও বাস্তবে ঘাটতির পরিমাণ দুই থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে দিনে গ্যাসের চাহিদা ২৩২ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করা যায় না কখনই। এবার গ্রীষ্মে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট। এজন্য কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানির পাশাপাশি অন্তত ১৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের দাবি জানিয়েছে পিডিবি।
এ মাসের শুরুর দিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১০০ কোটি ঘনফুটেরও কম গ্যাস সরবরাহ করা হলেও তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩৫ কোটি ঘনফুট। মূলত আমদানি করা এলএনজি পরিমাণ বৃদ্ধির কারণেই গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে। আগে যেখানে গড়ে প্রতিদিন ৬০ কোটি ঘনফুট এলএনজি আমদানি করা হতো, সেটি এখন ১০০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে।
গ্যাস দিয়ে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে; কিন্তু কয়লা ও তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম উৎপাদন করেছে। এর দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, কয়লা ও তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেশি। দ্বিতীয়ত, বকেয়া পরিশোধ না করায় তেল ও কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদন কম করছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পিডিবির কাছে পাবে ১৫ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা ৬ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। ভারতের আদানি গ্রুপ ৪ হাজার ১৪০ কোটি টাকা পাবে। এ ছাড়া জ্বালানি সংকটে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট এবং কেন্দ্র মেরামতের জন্য ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হচ্ছে।
পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূলত গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ায় পরিস্থিতি আগের চেয়ে সহনীয় হয়েছে। গত বছর গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলেও এবার তা ৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। এটা বিশাল সাপোর্ট। এরপরও কিছু লোডশেডিং হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুতের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। প্রয়োজনে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়িয়ে বিদ্যতের চাহিদা পূরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। ইনশাআল্লাহ বড় ধরনের কোনো সংকট তৈরি হবে না। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও বিদ্যুৎ ব্যবহারে আরও সাশ্রয়ী হতে হবে।’
