সরকারের নির্বাহী আদেশে ভোক্তাপর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ১ টাকা এবং পেট্রোল ও অকটেনের দাম আড়াই টাকা বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে এবং ক্যাপটিভে (শিল্প-কারখানায় নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা) ব্যবহৃত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৭৫ পয়সা বাড়িয়েছে সরকার। গতকাল মঙ্গলবার রাতে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ এ-সংক্রান্ত দুটি পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। নতুন দর আজ বুধবার থেকে কার্যকর হবে।
বিদ্যুতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে ভোক্তাপর্যায়েও বিদ্যুতের দাম আরেক দফা বৃদ্ধির আভাস পাওয়া গেছে। কারণ গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। আর ক্যাপটিভে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ফলে কারখানার পণ্য উৎপাদন খরচও বাড়বে বলে জানিয়েছেন শিল্পমালিকরা। অন্যদিকে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে কৃষিতে সেচের ব্যয় বাড়বে। সব মিলে মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।
এর আগে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ভর্তুকি সমন্বয় করতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ইউনিটপ্রতি ৭৫ পয়সা করে বাড়িয়েছিল সরকার।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রমতে, প্রতি ইউনিটে গ্যাসের মূল্য ৭৫ পয়সা করে বৃদ্ধির ফলে বছরে সরকারের বাড়তি আয় হয় ১ হাজার ৩৫ কোটি থেকে ১ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। একই হারে দুই দফা মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাড়তি আয় এখন প্রায় দ্বিগুণ হবে। এরপরও গ্যাস খাতে ভর্তুকি দিতে হবে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ১০৬ থেকে বাড়িয়ে ১০৭ এবং পেট্রোল ও অকটেনের দাম বৃদ্ধি করে যথাক্রমে ১২৪ দশমিক ৫০ ও ১২৮ দশমিক ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১৪ দশমিক ৭৫ থেকে বাড়িয়ে ১৫ দশমিক ৫০ এবং ৩০ দশমিক ৭৫ থেকে বাড়িয়ে ৩১ দশমিক ৫০ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে অন্যান্য শ্রেণিতে গ্যাসের মূল্য অপরিবর্তিত থাকবে।
বর্তমানে দেশে আট শ্রেণির গ্যাসের গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৩৭, শিল্পে ২৩, ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ১৮, বাসাবাড়িতে ১০, সার উৎপাদনে ৭, সিএনজিতে ৪ এবং বাণিজ্যিক ও চা-শিল্পে ১ শতাংশ গ্যাস ব্যবহৃত হয়।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের শর্ত হিসেবে সরকার গত ২৯ ফেব্রুয়ারি জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ঘোষণা করে। এ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমলে দেশে কমবে আবার বাড়লে দেশের বাজারেও বাড়বে। এ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে প্রথম জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা হয় গত ৭ মার্চ। তখন ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৭৫ পয়সা কমিয়ে ১০৮ টাকা ২৫ পয়সা, অকটেনে ৪ এবং পেট্রোলের ৩ টাকা কমিয়ে যথাক্রমে ১২৬ ও ১২২ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
দ্বিতীয় দফায় ৩১ মার্চ প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ১০৮ দশমিক ২৫ থেকে ২ দশমিক ২৫ টাকা কমিয়ে ১০৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে অকটেন ১২৬ এবং পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ১২২ টাকা অপরিবর্তিত ছিল। এপ্রিলের জন্য ওই দর নির্ধারণ করেছিল সরকার।
মূল্যবৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন জারির পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তা মীর মোহাম্মদ আসলাম উদ্দিন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন, আমদানি, সরবরাহ মূল্যের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যের কারণে সরকারকে এ খাতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আর্থিক ক্ষতি/ভর্তুকি দিতে হবে প্রায় ৬ হাজার ৫৭০ দশমিক ৫৪ কোটি টাকা। কৃষি সেচ মৌসুম, রমজান মাস ও গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের চাহিদা আরও বেশি থাকে। গ্যাস খাতে ভর্তুকি সীমিত রাখার লক্ষ্যে শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ক্যাপটিভে ব্যবহৃত গ্যাসের নতুন দর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে শিল্প, গৃহস্থালি, সার উৎপাদন, সিএনজি, বাণিজ্যিক ও চা-শিল্পে গ্যাসের দাম অপরিবর্তিত থাকবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতায় বর্তমানে ডিজেল লিটারপ্রতি ৯০ দশমিক ৭৬ রুপি বা ১৩০ দশমিক ৬৯ টাকা (১ ভারতীয় রুপি=গড় ১.৪৪ টাকা) এবং পেট্রোল ১০৩ দশমিক ৯৪ রুপি বা ১৪৯ দশমিক ৬৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা বাংলাদেশ থেকে বেশি।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম এক প্রতিক্রিয়ায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এভাবে দাম বৃদ্ধির অভিঘাত মানুষ এবং দেশের অর্থনীতি বহন করতে পারবে না। দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধির ফলে জিডিপির প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয় কমেছে। বাজেট ঘাটতি বেড়ে গেছে। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে দারিদ্র্য বেড়েছে। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ নিম্ন ও স্বল্প আয়ের। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় আরেক দফা বাড়বে।’
তিনি বলেন, ‘অনিয়ন্ত্রিত ও ঊর্ধ্বগতির দ্রব্যমূল্যের এ বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরকারের বিবেচনা হতে পারে না। এর মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে ক্ষতির মুখে ফেলে সরকার অসাধু ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা দিচ্ছে। এটি বারবার প্রমাণ হচ্ছে।’
দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের ৭৫ শতাংশই ডিজেল। এটি সাধারণত কৃষি সেচে, জেনারেটর এবং পরিবহনে ব্যবহার করা হয়। অন্যান্য সময় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি করা হলেও এবার এক মাসের মধ্যে দু-দফায় ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩ টাকা কমানোর পর গণপরিবহনে যাত্রীভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১ পয়সা কমানো হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়েছে বলে শোনা যায়নি।
বিপিসির লোকসান হচ্ছে, এমন যুক্তিতে ২০২২ সালের ৫ আগস্ট দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ৪২ থেকে ৫২ শতাংশ বাড়ানো হয়। ওই সময় ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৮০ থেকে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয়। পেট্রোলের দাম ৮৬ থেকে ৪৪ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়। অকটেনের দাম ৮৯ থেকে ৪৬ টাকা বাড়িয়ে করা হয় ১৩৫ টাকা। ব্যাপক সমালোচনার মুখে ২০২২ সালের ৩০ আগস্ট এ চার ধরনের জ্বালানির দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা করে কমানো হয়। অর্থাৎ ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে মাত্র ৩-৪ শতাংশ কমানো হয়েছিল।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বদরূল ইমাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের সম্ভাবনা থাকলেও সরকার অনুসন্ধানে গুরুত্ব না দিয়ে অতিমাত্রায় আমদানি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আর উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানির ফলে গ্যাসের ব্যয় বেড়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হচ্ছে। কিন্তু তাদের ধরা হচ্ছে না। সরকার যদি এ লুটপাট বন্ধ করত তাহলেও সেই টাকা দিয়ে ভর্তুকির চাপ সামলানো যেত।’
এর আগে গত বছর জানুয়ারিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটারে ৫ টাকা ৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৪ এবং ক্যাপটিভে ১৬ থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করা হয়েছিল। তখন শিল্প, বিদ্যুৎ ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের কথা বলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পরও শিল্পমালিকরা গ্যাসসংকটে ভুগছেন।
এর আগে গণশুনানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করার একক ক্ষমতা ছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। সেখানে দাম বৃদ্ধির পক্ষে-বিপক্ষে নানারকম যুক্তিতর্ক হতো। ফলে ইচ্ছেমতো দাম বৃদ্ধির সুযোগ ছিল তুলনামূলক কম। কিন্তু গত বছর থেকে সরকার নির্বাহী আদেশে দাম বৃদ্ধির জন্য আইন করে। এরপর গণশুনানি ছাড়াই গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম তিন দফায় ১৫ শতাংশ এবং গ্যাসের দাম ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। পরে সেই একই কায়দায় গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করছে সরকার।