বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়া বাংলাদেশি অভিবাসন প্রত্যাশীদের অনেককেই জীবন বা সম্পদ বাজি রেখে বিদেশে পাড়ি জমাতে হয়। অভিবাসন, অভিবাসী ও তাদের পরিবার-পরিজনকে নিয়ে হৃদয়ছোঁয়া অনেক প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকরা দেশ থেকে শুরু করে নানান পর্যায়ে, নানান ধরনের শোষণ, বঞ্চনা, প্রতারণা, লাঞ্ছনা ও হয়রানির শিকার হন। কিন্তু অভিবাসন ও অভিবাসীদের সেবার ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করার কোনো দৃশ্যমান প্রবণতা নেই।
অথচ পৃথিবীতে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিবাসন সংকট। অভিবাসন প্রক্রিয়া বাড়ছে। ওয়ার্ল্ড মাইগ্রেশন রিপোর্ট ২০১৫ অনুযায়ী বিশ্বে প্রতি সপ্তাহে ৩০ লাখ মানুষ শহরে আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বে প্রতি ৩৫ জন মানুষের মধ্যে একজন অভিবাসী। যিনি নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে অন্য দেশে বসবাস করেন। বিশ্ব অর্থনীতির একটি বিরাট অংশ নির্ভর করে অভিবাসীদের শ্রমের ওপর। এই বাস্তবতায় অভিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা সংশ্লিষ্ট সবারই দায়িত্ব। দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে যেসব পরিবার রয়েছে, তাদের যদি রেমিট্যান্স প্রাপক পরিবারে রূপান্তর করা যায়, তাহলে সেসব পরিবার দরিদ্র থাকবে না। দেশকে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যেতে সহজ হবে। এটা সম্ভব হবে তখনই, যখন অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকবে।
পৃথিবীর ১৬৮ দেশে বাংলাদেশের মানুষ কর্মরত আছেন। এসব দেশে প্রায় ১ কোটি ২৬ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের জরিপ অনুযায়ী দেশ থেকে বিদেশ যাওয়া শ্রমিকদের ৬২ শতাংশ অদক্ষ, ৩৬ শতাংশ আধা দক্ষ এবং মাত্র ২ শতাংশ দক্ষ। প্রবাসে দেশের শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত প্রতারণা, হয়রানি, নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এমনকি প্রাণও হারাচ্ছেন। কিন্তু এর প্রতিকার নেই বললেই চলে। এসব বিষয়ে ভুক্তভোগী কিংবা দেশে থাকা স্বজনরা প্রতিকার চেয়ে জনশক্তি কমর্সংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোয় (বিএমইটি) অভিযোগ করে থাকেন। তবে বছরে কয়েক হাজার অভিযোগ জমা পড়লেও তা নিষ্পত্তির হার অর্ধেকেরও কম। গত পাঁচ বছরে হয়রানি-নির্যাতন নিয়ে সংস্থাটির কার্যালয়ে যত অভিযোগ জমা পড়েছে, তার ৬১ শতাংশ প্রবাসীই কোনো প্রতিকার পাননি। এমনকি যারা প্রতিকার পাচ্ছেন, ক্ষতিপূরণ হিসেবে তার পরিমাণও যৎসামান্য। প্রবাসীরা বিএমইটিতে মূলত চার ধরনের অভিযোগ করেন। এর মধ্যে বিদেশে গিয়ে চাকরি না পাওয়া, আকামা জটিলতা, বেতন ও চুক্তি অনুযায়ী কাজ না পাওয়া। এসব বিষয়ে সরকারের দপ্তরটিতে অভিযোগ জানালে তা তদন্ত ও অনুসন্ধান শেষে নিষ্পত্তি করে বিএমইটি।
নানা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে প্রতি বছরই বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা বাড়লেও সে তুলনায় প্রবাসী আয় বাড়ছে না। ২০২৩ সালের প্রথম ১১ মাসেই ১২ লাখ ১০ হাজার কর্মী বিদেশে গেছেন। যা ২০২২ সালে এর সংখ্যা ছিল ১১ লাখ ৪০ হাজার। সংশ্লিষ্টদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহ না বাড়ার পেছনে দায়ী প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর হওয়া নির্যাতন ও প্রতারণা। বিদেশে যেতে অনেক প্রবাসী জমি বিক্রি, ধার-দেনা এমনকি ঋণ করে সর্বস্ব হারাচ্ছেন। ভুয়া এজেন্সির মাধ্যমে, দালালের মাধ্যমে বিদেশে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন। এসব নানামুখী চ্যালেঞ্জ নিয়ে সেখানে গিয়ে কাজ না পাওয়া, বেতন ঠিকমতো না হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেই চলছে। প্রতারিত হয়ে দেশ থেকে পাঠানো টাকায় কোনো রকমে দিন যাপন করেন অনেকে। দেশে ফিরতেও পারেন না কিংবা খালি হাতে ফিরে আসেন অনেকেই। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বলছে, গত বছর ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত শূন্য হাতে দেশে ফিরে এসেছেন ৮০ হাজার ৮১১ প্রবাসী। প্রবাসে এসব হয়রানি-নির্যাতন বন্ধে বিএমইটির কাজের গতি ও তদারকি বাড়ানো আবশ্যক। অভিযোগ নিষ্পত্তির হার বাড়াতে হবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে এটি করা প্রয়োজন।
সাধারণত বিএমইটির কাছে কোনো প্রবাসী হয়রানি কিংবা নির্যাতনের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করলে সেটি এক মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু তথ্য-উপাত্ত বলছে, বছরের পর বছর নিষ্পত্তি না হওয়া অভিযোগের সংখ্যাই বেশি। দিনের পর দিন সংস্থাটির দোরগোড়ায় ঘুরেও প্রতিকার পান না ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনরা। তবে প্রতিকার পেতে এবং এ ধরনের বিপদ এড়াতে প্রবাসীদের সচেতন হওয়াও অতীব জরুরি।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। সরকারিভাবে বিদেশ যেতে যে অর্থ ব্যয় হয়, তুলনামূলক রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে অনেক বেশি পরিমাণ অর্থ দিতে হয়। আবার রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে যাওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকিও থাকে অনেক বেশি। তবু প্রবাস যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা কেন সরকারিভাবে না গিয়ে এজেন্সির মাধ্যমে যান তা জানা দরকার। সে অনুসারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
অনেকের অভিযোগ, এ মন্ত্রণালয়ের কাজে ধীরগতি ও ব্যর্থতায় প্রবাসে থাকা কর্মীদের হয়রানি-নির্যাতন বছরের পর বছর বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ মিশনগুলোকে তদারকি বাড়াতে হবে। হয়রানি ও প্রতারিত হওয়া থেকে প্রবাসী কর্মীদের রক্ষা করতে হলে প্রতিটি নিয়োগ ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। কাগজপত্র ঠিক থাকা সত্ত্বেও কর্মীরা যেন বিদেশে হয়রানির শিকার না হন, গন্তব্য দেশে তাদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে অনেক সময় দেখা যায়, প্রবাসী কর্মীরা ফিরে আসেন অদক্ষতার কারণে। কর্মীদের বিদেশ গমনের আগে যথাযথ ট্রেনিং দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। উন্নত প্রযুক্তির যুগে দক্ষতা ছাড়া মানবসম্পদকে কাজে লাগানো ভবিষ্যতে আরও মুশকিল হয়ে পড়বে।
বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, এশিয়া ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অভিবাসী রয়েছেন। এসব দেশে তারা নানাভাবে বঞ্চনা, শোষণ ও অবহেলার শিকার হচ্ছেন। কখনো কখনো নির্যাতিত হচ্ছেন আবার অনেকেই ন্যায়বিচার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। আবার কোনো কোনো দেশের কারাগারে বাংলাদেশিরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছেন।
অভিবাসীদের যথাযথ গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যতে দেশকে নেতিবাচক ফল ভোগ করতে হবে। এটি কাম্য নয়। এছাড়া নারী অভিবাসন একটি জাতীয় বিষয়। নারী অভিবাসীদের শতভাগ রেমিট্যান্স দেশে পাঠানো হয়। এটা গোটা দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু পাসপোর্ট থেকে শুরু করে বিমানের টিকিট কেনা পর্যন্ত প্রতিটি জায়গায় তাকে একেক ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। নারীর অভিবাসনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করলে নিরাপদ অভিবাসনের অপরাধগুলো দূর হবে।
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক
