নানার কবরে চিরশায়িত পাইলট আসিম জাওয়াদ

আপডেট : ১১ মে ২০২৪, ০১:৪৯ এএম

চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনায় নিহত বিমানবাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার আসিম জাওয়াদকে নিজ শহর মানিকগঞ্জে সমাহিত করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে তার মরদেহ হেলিকপ্টারে মানিকগঞ্জ পৌঁপছ। জুমার নামাজ শেষে বেলা ৩টার দিকে গার্ড অব অনার শেষে শহরের সেওতা কবরস্থানে নানা মো. আবদুর রউফ খানের পুনঃখনন করা কবরে তাকে সমাহিত করা হয়। বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান ও সহকর্মীসহ হাজারো মানুষ চোখের জলে শেষ বিদায় জানান বিমানবাহিনীর এ বৈমানিককে।

আসিম জাওয়াদের জানাজা গতকাল দুপুর ২টায় অনুষ্ঠিত হয় শহরের শহীদ তপন মিরাজ স্টেডিয়ামে। এর আগে বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে ঢাকায় বিমানবাহিনীর সদর দপ্তরে জানাজা শেষে একটি হেলিকপ্টারে মরদেহ আনা হয় এ স্টেডিয়ামে। আসিম জাওয়াদের মরদেহ বহনকারী হেলিকপ্টারে মরদেহের সঙ্গে ছিলেন তার বাবা আমানউল্লাহ, স্ত্রী অন্তরা খানম এবং দুই শিশুসন্তান। এর আগে থেকে সেখানে পরিবারের অন্যান্য সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও নানা শ্রেণি-পেশার শত শত মানুষ ভিড় করেন। এর কিছুক্ষণ আগে বিমানবাহিনীর উইং কমান্ডার আননুরের নেতৃত্বে ৫০ জন সদস্য সড়কপথ হয়ে স্টেডিয়ামে আসেন।

আসিম জাওয়াদের মরদেহ আনার পর স্টেডিয়া জুড়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। একমাত্র সন্তানের মরদেহ আনার পর মা নিলুফা আক্তার মাঠেই আহাজারি করে বলতে থাকেন ‘আমার বাবা (সন্তান) আমাকে কেন রেখে চলে গেল। আমার কী দোষ ছিল! কেন আমার বুক খালি হলো।’

হেলিকপ্টার থেকে আসিম জাওয়াদের মরদেহ নামিয়ে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে রাখা হয়। পরে জেলা ক্রীড়া সংস্থার মিলনায়তনে মরদেহ নেওয়া হয়। সেখানে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনরা আসিম জাওয়াদকে শেষবারের মতো দেখে নেন।

২০১৬ সালে স্কোয়াড্রন লিডার আসিম জাওয়াদ অন্তরা খানমকে বিয়ে করেন। তাদের আয়েজা খানম নামে ছয় বছরের এক মেয়ে এবং এক বছরের এক ছেলে রয়েছে। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি চট্টগ্রামে থাকতেন।

জানাজার আগে বক্তব্য রাখেন নিহত আসিম জাওয়াদের বাবা ডা. আমানউল্লাহ, মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট গোলাম মহিউদ্দিনসহ জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি এবং বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা।

শহীদ তপন মিরাজ স্টেডিয়ামে আসিম জাওয়াদের মরদেহ দেখতে আসা তাদের বাড়ির পাশের বাসিন্দা শাকিলা বেগম বলেন, ‘শহরের যেকোনো মানুষকে দেখলেই সে (আসিম জাওয়াদ) কথা বলত, সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করত। আমাকে চাচি বলে ডাকত। আর মায়া মুখে চাচি বলে ডাকবে না।’

চাচাতো বোন শ্রাবণী বলেন, ‘ওর স্বপ্ন ছিল পাইলট হয়ে দেশের সেবা করবে। কিন্তু অকাল মৃত্যুতে ওর পরিবারে কালো মেঘ নেমে আসল।’

জানাজায় অংশ নিতে আসা আবদুল্লাহ নামে এক যুবক বলেন, ‘আসিম জাওয়াদ অত্যন্ত মেধাবী পাইলট ছিলেন। তার বিমানে আগুন লাগলে, তিনি লোকালয়ে প্যারাশুট করে নামতে পারতেন। কিন্তু তখন জানমালের ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল। পরে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে বিমানটি কর্ণফুলী নদীতে নিয়ে যান। জনসাধারণকে নিরাপদ রাখতে গিয়ে নিজের জীবন দিয়ে গেলেন। তাই তার জানাজার নামাজ পড়তে এসেছি।’

জানাজার আগে দেওয়া বক্তব্যে আসিম জাওয়াদের বাবা ডা. আমানউল্লাহ বলেন, ‘শিশু অবস্থায় আসিম বিভিন্ন বিমানজাতীয় খেলনা কিনত। বাসায় বসে সেসব খুলে খুলে দেখত। প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল বিমান নিয়ে। সেই নেশায় জীবনে একটিমাত্র চাকরির পরীক্ষা দেয়। বিমানবাহিনীতে যোগদান করার পর বাহিনীর অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক সব প্রশিক্ষণেও সে প্রথম হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছে। পেয়েছে বিভিন্ন পুরস্কার। আজ সে অকালে চলে গেলেও আমি ওর সম্মান দেখে সন্তুষ্ট। সব বাহিনী আমার ছেলেকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে।’

গত বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পতেঙ্গার বানৌজা ঈসা খাঁ হাসপাতালে (নেভি হাসপাতাল) পাইলট জাওয়াদ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান ইয়াক-১৩০ বিধ্বস্ত হয়ে চট্টগ্রাম বোট ক্লাবের অদূরে কর্ণফুলী নদীতে আছড়ে পড়ে। এতে আসিম জাওয়াদসহ আরও এক বৈমানিক ছিলেন।

নিহত আসিম জাওয়াদের গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার গোপালপুর গ্রামে। তার বাবা চিকিৎসক আমানউল্লাহ। আর মা নিলুফা খানম সাভার ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা ছিলেন। এখন অবসরে গেছেন। তারা মানিকগঞ্জ শহরের গোল্ডেন টাওয়ারে নিজস্ব ফ্ল্যাটে বসবাস করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত