একটা গল্প দিয়ে লেখা শুরু করছি। এক প্রেমিকা তার প্রেমিককে পরীক্ষা করার জন্য বলল, তোমার ভালোবাসার পরীক্ষা নিতে চাই আমি! প্রেমিক বলল, কী পরীক্ষা নেবে? সব পরীক্ষার জন্য আমি প্রস্তুত। প্রেমিকা বলল, তোমার মায়ের হৃৎপিণ্ডটা নিয়ে আসো। প্রেমে অন্ধ ছেলেটি ছুটল মায়ের কাছে! মাকে হত্যা করে তার হৃৎপিণ্ড নিয়ে ছুটল প্রেমিকার কাছে, ভালোবাসার পরীক্ষায় পাস করতে। পথে হঠাৎ আছড়ে পড়ল, আর হাত থেকে ফসকে গেল মায়ের হৃৎপিণ্ডটা। হাতে তুলে নিতেই হৃৎপিণ্ড থেকে আওয়াজ এলো, ‘ব্যথা পেলি খোকা? তুই তো খুব পিপাসার্ত, ক্লান্ত। আমি যে দাঁড়াতে পারছি না, তোকে কীভাবে পানি পান করাব বাবা’। এরই নাম মা।
আজ বিশ্ব ‘মা’ দিবস। দিনটি কীভাবে, কবে কোথা থেকে এলো, কেন পালন করা হয়, এর গুরুত্ব কী, তা হয়তো অনেকের অজানা। দিনটি পালনে রয়েছে এক ইতিহাস। ১৯০৭ সালের ১২ মে আমেরিকার ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার গ্রাফটন শহরে প্রথমবার ‘মাদার্স ডে’ বা মা দিবস পালিত হয়। ভার্জিনিয়ায় অ্যান নামে এক সমাজকর্মী ছিলেন। তিনি নারী অধিকার নিয়ে কাজ করতেন এবং ‘মাদারস ডে ওয়ার্ক ক্লাব’ প্রতিষ্ঠা করেন। ছোট ছোট ওয়ার্ক ক্লাব বানিয়ে সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের এগিয়ে নিতে চেষ্টা এবং তাদের স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করতেন। অ্যানের একটি মেয়ে ছিল। একদিন মেয়ের সামনেই প্রার্থনা করেছিলেন ‘যেন কেউ একটা দিন মায়েদের জন্য উৎসর্গ করেন’। মায়ের সেই প্রার্থনা হৃদয়ে নাড়া দিয়ে যায় তার মেয়েটির। অ্যানের মৃত্যুর পর সেই দিনটিকে সারা বিশ্বের প্রতিটি মায়ের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন তার মেয়ে। আর এভাবেই মায়েদের প্রতি সম্মানে পালিত হয়ে আসছে মা দিবস। ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে ‘মা দিবস’ ঘোষণা করেন। এর পর থেকে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার আন্তর্জাতিক মাতৃদিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়ে থাকে।
‘মা’ কথাটি সবচেয়ে ছোট অথচ সবচেয়ে মধুর একটি শব্দ। মাত্র এক অক্ষরে শব্দটি হলেও এর ব্যাপকতা সাগরের চেয়েও বিশাল। মায়ের মতো এত মধুর আর আবেগী শব্দ পৃথিবীতে আর একটিও নেই। যে শব্দটিতে জড়িয়ে আছে স্নেহ– মায়া– মমতা– ভালোবাসা। ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, প্রতিটি সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা ও প্রেম স্বার্থহীন, সীমাহীন। মা সন্তানের অভিভাবক, পরিচালক, ফিলোসফার, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও বড় বন্ধু। জীবনে সবচেয়ে বড় শ্রমজীবী হচ্ছেন মা। যার কর্মবিরতি নেই, মজুরি নেই, দাবি নেই, শর্ত নেই, স্বার্থ নেই, তিনি শুধু শ্রম দিয়েই যাচ্ছেন। ‘মা’ই একমাত্র ব্যক্তি, যার কাছে সবকিছু চাইলেই পাওয়া যায়। ‘মা’ই জীবনের প্রথম এবং বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক।
গর্ভধারণের মুহূর্ত থেকেই সন্তানের সঙ্গে একজন মায়ের নিবিড় বন্ধন তৈরি হয়। গর্ভাবস্থায় একজন মা তার অনাগত সন্তানের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেন, যা তুলনাহীন। এই গভীরতা অন্য কারোর পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। এরপর শিশুটি যখন ভূমিষ্ঠ হয়ে পৃথিবীতে আসে, তখন মা হয়ে যান তার প্রথম এবং সাবর্ক্ষণিক পরিচর্যাকারী। সন্তানের জন্য অগণিত রাত জাগা, সারাক্ষণ যতœ নেওয়া, খাওয়ানো এবং আদরের আলিঙ্গনের মাধ্যমে তিনি সীমাহীন ধৈর্য প্রদর্শন করেন। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীই তার মায়ের কাছে ঋণী। এই ঋণ শোধ করার কোনো বিকল্প নেই। মা হলেন এমন একজন মানুষ, যিনি অন্য সবার স্থান নিতে পারেন, কিন্তু তার স্থান অন্য কেউ নিতে পারে না। চাওয়া-পাওয়ার পৃথিবীতে মায়ের ভালোবাসার সঙ্গে কোনো কিছুরই তুলনা হয় না।
ইসলামে মায়ের সম্মান ও অধিকার ইসলাম মাকে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা। জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম মাধ্যম করা হয়েছে মাকে। হাদিস শরিফে বলা হয়েছে- মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। তাই জান্নাত পাওয়ার আকাক্সক্ষাকারী কোনো সন্তানই মাকে এড়িয়ে যেতে পারে না।
আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তোমার পরওয়ারদেগার আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাকে ছাড়া অন্য কারও এবাদত কোরো না এবং তুমি মাতা-পিতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো, যদি তোমার সম্মুখে তাদের একজন অথবা উভয়ে বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদের উহ পর্যন্তও বলো না, আর তাদের ধমক দিয়ো না এবং তাদের সঙ্গে খুব আদবের সঙ্গে কথা বলো। এবং তাদের সম্মুখে করুণভাবে বিনয়ের সঙ্গে নত থাকবে, আর এইরূপ দোয়া করতে থাকবে, হে আমার পরওয়ারদেগার! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন, যেইরূপ তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন শৈশবকালে’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৩-২৪)।
হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন কোনো অনুগত সন্তান নিজের মা-বাবার দিকে অনুগ্রহের নজরে দেখে, আল্লাহ তায়ালা তার প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে একটি করে কবুল হজের সাওয়াব দান করেন’ (বায়হাকি-মিশকাত, পৃ. ৪২১)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.) এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! কে আমার উত্তম আচরণ পাওয়ার বেশি হকদার? তিনি বললেন তোমার মা; সে বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা; সে আবারও বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে পুনরায় বলল, এরপর কে? তিনি বললেন, তোমার পিতা। (বুখারি শরিফ ও মুসলিম শরিফ)।
মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব
সন্তানের সব সময় মনে রাখা উচিত, মায়ের ত্যাগের কারণেই আজ সে এই সুন্দর পৃথিবীতে এসেছে। যদি সে মাকে ভুলে যায়, কষ্ট দেয় বা অবহেলা করে- তাহলে সবই মিছে। সন্তানের পর্বত সমান সফলতা তখন মূল্যহীন। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে লিখতে হচ্ছে, সেই মায়ের প্রতি অনেক সন্তান আজ উদাসীন, বেপরোয়া। এমনও শোনা যায় সন্তান তার মাকে প্রহার করছেন, ঘর থেকে বের করে দিচ্ছেন, জঙ্গলে ফেলে এসেছেন, নিজে সুন্দর ঘরবাড়িতে বাস করে মাকে রেখেছেন রান্নাঘরে। এমনও দেখা যায়, পিতা-মাতাকে সন্তান ঠিকমতো ভরণপোষণ দিচ্ছেন না। তারা বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের ‘বৃদ্ধাশ্রম’ নামের কারাগারে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। অথচ স্ত্রী সংসার নিয়ে নিজেরা বেশ আরাম আয়েশে থাকছেন। তাদের পরিবারে বাবা-মা যেন বোঝা। নাড়ি ছেঁড়া ধন সন্তানের কাছ থেকে কোনোভাবেই এসব কাম্য নয়। এতে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে; জমিন অভিশাপ দেয়। নিশ্চয় কঠিন কেয়ামতের দিন সেই সন্তানকে আল্লাহর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। কী উপায় হবে সেদিন?
মা শ্রদ্ধার আধার, স্নেহের কাণ্ডারি। সব ধর্মেই মা আশীর্বাদস্বরূপ। তাই সন্তানের সর্ব প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে মাকে শ্রদ্ধা করা, অন্তরের শ্রেষ্ঠতম আসনে তাকে প্রতিষ্ঠা করা, ভক্তি ও শ্রদ্ধায় মাকে অভিষিক্ত করা। মায়ের ঋণ কোনোদিন কখনো কোনোভাবেই শোধ করা যাবে না। তিনিই যে পরম শিক্ষক।
পৃথিবীর সবচেয়ে আপন হলো মা। আমাদের কোনো আচরণে যেন মাকে কষ্ট না দিই। যাদের মা বেঁচে আছেন, সেই মায়ের জন্য জীবনের সর্বোচ্চটাই করার চেষ্টা করি। মা-বাবার সেবাযত্ন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত অর্জন করি। আল্লাহ আমাদের সবার পিতামাতাকে ভালো রাখুন। তাদের উত্তম সেবা করার তৌফিক দান করুন।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক
