ইংল্যান্ডে মুসলিম ভোটাররা চিন্তায় ফেলে দিয়েছে লেবার পার্টিকে। গাজার পক্ষে সমর্থন না দিলে ভোট দেবে না মুসলিমরা। বিভিন্ন সূত্র অবলম্বনে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
যুক্তরাজ্যে হয়ে গেল স্থানীয় নির্বাচন। যাতে লেবার পার্টির কাছে বড় ব্যবধানে ধরাশায়ী হয়েছে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ। ১০৭ কাউন্সিলে প্রায় ২৬০০ কাউন্সিলর নির্বাচন করতে এ ভোট হয়। এতে লেবার পার্টি বড় জয় পায়। তবে এ নির্বাচনে মুসলিম ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ এক ভূমিকা রাখেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে, গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলকে সমর্থন মুসলিমদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাবক ভূমিকা পালন করে। যেমন দ্য গার্ডিয়ান বলছে, লন্ডনের মেয়র হিসেবে সাদিক খান বিজয় পেয়েছেন। গাজা যুদ্ধের বিষয়ে তার দলের অবস্থান অস্পষ্ট ছিল। যে কারণে মুসলিম ভোটাররা লেবার পার্টিকে ভোট দিয়েছে কম। যার ফলাফল হলো, বিভিন্ন স্থানে লেবার পার্টির ভোট কমে গেছে। ৫৩ বছর বয়সী সাদিক গত শনিবার লন্ডনের মেয়র হিসেবে তৃতীয় মেয়াদে জিতেছেন। তিনি নির্বাচনের আগে গাজায় যুদ্ধবিরতির দাবি তোলেন। কিন্তু ইংল্যান্ডের অন্যত্র লেবার প্রার্থীরা মুসলিম ভোটারদের ভোট হারিয়েছেন।
লেবার নেতা কিয়ের স্টারমা যদিও গাজা যুদ্ধে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভদের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছেন। এ ইস্যুতে তার দলে বিভাজনও দেখা দিয়েছে। যা সর্বশেষ স্থানীয় নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করে। ইংল্যান্ডের ইতিহাসে মুসলমানরা লেবার পার্টিকে সবসময় ভোট দিয়ে আসছে। তবে গাজাবাসীর পক্ষে না দাঁড়ানোয় তাদের মুসলিম ভোট কমেছে। অন্য দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তাদের ভোট পেয়েছে। টানা ১৪ বছর ক্ষমতায় থাকা কনজারভেটিভরা এমনিতে দুর্বল অবস্থায় আছে। লেবারের ক্ষমতায় আসা সময়ের ব্যাপার মাত্র। এ অবস্থায় তারা যদি মুসলিম ভোট হারাতে থাকে, তাহলে সমীকরণ পাল্টেও যেতে পারে।
ফিলিস্তিনের সমর্থনে
বিবিসি জানাচ্ছে, গাজা বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করে লেবার পার্টিকে মুসলিম ভোটারদের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার কাজ করতে বলেছেন তাদের এক নেতা। গাজায় ইসরায়েলি হামলা বিষয়ে দলটির অবস্থান ইংল্যান্ডের স্থানীয় নির্বাচনে মুসলিম সমর্থন হ্রাস করেছে বলে মনে করেন ওই নেতা। বিবিসি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, ৫৮টি স্থানীয় কাউন্সিল ওয়ার্ডে পাঁচজনের একজনের বেশি বাসিন্দা মুসলিম। এসব এলাকায় ২০২১ সালের তুলনায় লেবার ২১ শতাংশ ভোট কম পেয়েছে।
লন্ডনের যেসব এলাকায় মুসলিম ভোটার ১৫ শতাংশের বেশি, সেখানে লেবার পার্টির ভোট বেড়েছে তিন পয়েন্ট। আর যেসব এলাকায় মুসলিম ভোটারের হার কম, সেখানে তাদের ভোট বেড়েছে সাড়ে চার শতাংশের বেশি। বিবিসি আরও জানাচ্ছে, ‘বড় মুসলিম জনসংখ্যা আছে এমন এলাকায় লেবারের ভোট কমে যাওয়াটা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সুবিধা করে দিয়েছে। লেবার মুসলিম নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান আলী মিলানি বলেন, ‘গাজা নিয়ে লেবারদের অবস্থান নির্বাচনে গুরুতর পরিণতির কারণ হতে চলেছে। আমি যদি ব্র্যাডফোর্ড বা বার্মিংহাম বা লিসেস্টার বা লন্ডন বা ম্যানচেস্টারের কিছু অংশে লেবার এমপি হতাম তবে আমি গুরুতরভাবে এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন হতাম’। যারা যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ পর অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছিল তাদেরও ২০২১ সালের তুলনায় ভোট বেড়েছে। অপর দিকে, গাজার পক্ষে থাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী আখমেদ ইয়াকুব প্রায় ৭০,০০০ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন।
দ্য নেশন তাদের প্রতিবেদনে জানায়, ব্রিটেনের স্থানীয় নির্বাচনে প্রায়ই দেখা যায় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতে আসছেন। তবে এবার সেটি ভিন্ন ছিল। স্বতন্ত্রদের ৯৩ আসনের বেশ কয়েকজন সাবেক লেবার কাউন্সিলর যারা গাজা ইস্যুতে দল থেকে পদত্যাগ করেন। আল আরাবিয়া মে মাসের শুরুতে এক প্রতিবেদনে জানায়, ফিলিস্তিনপন্থিরা ব্রিটেনের বিরোধী লেবার পার্টির নেতা স্টারমারের কাছে ১৮টি দাবির একটি তালিকা পেশ করেন। তারা জানান, এসব দাবি পূরণ না হলে সাধারণ নির্বাচনে লেবারকে ভোট দেবেন না তারা। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক ছিন্ন করা, গাজা হামলায় জড়িত ইসরায়েলি রাজনীতিবিদদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা এবং কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রতিশ্রুতি দেওয়া। তারা স্টারমারকে বলেছিলেন, এসব বিষয়ে অবশ্যই বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। তারা গ্রিন পার্টি বা লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেবেন, যদি তিনি তাদের দাবিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না হন।
দ্য ন্যাশনাল জানাচ্ছে, আরেকটি জাতীয় নির্বাচনের আগে ইংল্যান্ডের ক্রমবর্ধমান মুসলিম ভোট কী ভূমিকা রাখে তা বুঝতে নড়েচড়ে বসেছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘ইসলামভীতি’ মোকাবিলা এবং গাজা ইস্যুতে সমর্থনের জন্য কনজারভেটিভরা বেশ কয়েকটি আসন হারাতে পারেন।
লেবার মুসলিম নেটওয়ার্কের সভাপতি আফজাল খান বলেন, রেকর্ড সংখ্যক মুসলিম সদস্য এ বছর সংসদে প্রবেশ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে লেবারে ১৯ মুসলিম এমপি রয়েছেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বেন আনসেলের নির্বাচনী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইংল্যান্ডের জাতীয় নির্বাচনে ১০ শতাংশের বেশি মুসলিম বা ২০ শতাংশ এশিয়ান লেবারদের বাড়তি সুবিধা দেন।
ইরাক যুদ্ধ
দ্য গার্ডিয়ান জানাচ্ছে, লেবারের দুই জ্যেষ্ঠ নেতা স্বীকার করেছেন যে, ইসরায়েল-গাজা দ্বন্দ্বের প্রতিক্রিয়ার জন্য দলটি কিছু ভোটারের আস্থা হারিয়েছে। এ দুই নেতা হলেন ছায়া চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস এবং লন্ডনের মেয়র সাদিক খান। তারা বলছেন, এসব ভোটারকে ফিরে পেতে হলে তাদের কথা শুনতে হবে। গত মঙ্গলবার তারা রাফায় ইসরায়েলি আক্রমণের বিরোধিতা করেন। সাদিক বলেন, এ ধরনের আক্রমণ বিপর্যয় ডেকে আনবে। লেবারের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি অবশ্য নতুন নয়। ইরাক যুদ্ধে সমর্থন দেওয়ার ফলে ২০০৫ সালে তাদের সবচেয়ে আলোচিত নেতা টনি ব্লেয়ারকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। এ বিষয়ে গার্ডিয়ানে নিবন্ধকার মার্টিন কাটেল লেখেন, ইতিহাস নিজে থেকে পুনরাবৃত্তি ঘটায় না, তাই ইরাকের সঙ্গে গাজার পরিস্থিতি খুব যান্ত্রিকভাবে সমান ভাবা বিভ্রান্তিকর হবে। ২০০৩ সালে লেবার পার্টি দৃঢ়ভাবে ক্ষমতায় ছিল, এখনকার মতো বিরোধী দল ছিল না। ব্লেয়ার চেয়েছিলেন ব্রিটেন সরাসরি সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য জড়িত হোক। যেখানে বর্তমান লেবার নেতা কিয়ের স্টারমার বর্তমান ইউকে সরকারের মতো গাজা সংঘাত নিয়ে সরাসরি কোনো অবস্থানে নেই। ব্লেয়ার সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে পছন্দ করতেন। তুলনায় স্টারমার সতর্ক। তার লেখা থেকে জানা যায়, ব্লেয়ারের ইরাক নীতির কারণে ২০০৫ সালে লেবারের ভোট কমে যায়। সরকার গঠন করলেও তার সঙ্গে বিরোধিতা বাড়তে থাকে অন্যদের। যার ফলে ক্ষমতা ছাড়তে হয় ব্লেয়ারকে। ডেভিড ক্যামেরনের অধীনে ব্রিটিশ রাজনীতিতে রক্ষণশীলদের প্রত্যাবর্তন ঘটে। আরেকটি ঘটনা ঘটে ইরাক ইস্যুতে। স্কটল্যান্ডে লেবারদের পরাজয় ঘটে লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের কাছে। এর নেতা জর্জ গ্যালোওয়ে। তিনি মুসলিম এবং ছাত্রদের সমর্থন নিয়ে দল গড়ে তোলেন। এই গ্যালোওয়ে গাজায় ইসরায়েলি হামলার বিরোধিতা করে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। আর লেবার পার্টিতে জেরেমি করবিন নেতা নির্বাচিত হন।
পরিসংখ্যান
করোনা মহামারী ও মন্দা, ছয় বছরে পাঁচ প্রধানমন্ত্রী এবং কিছু কেলেঙ্কারির ঘটনার পর কনজারভেটিভরা বিপর্যয়ের মুখে আছেন। যা সুবিধা করে দিয়েছে লেবারদের। তবে এ সুযোগ ঘরে তুলতে হলে তাদের অবশ্যই মনোযোগ দিতে হবে মুসলিম ভোটের দিকে। দ্য কনভারসেশন ডটকম জানাচ্ছে, যুক্তরাজ্যে ২০ নির্বাচনী এলাকা রয়েছে যেখানে ৩০ শতাংশের বেশি মুসলিম ভোটার। ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে এসব এলাকায় লেবার প্রার্থীরা এমপি হন। মুসলিম ভোটারদের সবচেয়ে বেশি বার্মিংহাম হজ হিলে, যা জনসংখ্যার ৬২ শতাংশ। এ ছাড়া ব্র্যাডফোর্ড পশ্চিমে জনসংখ্যার ৫৯ শতাংশ, ইলফোর্ড দক্ষিণে ৪৪ এবং লিসেস্টার দক্ষিণে ৩২ শতাংশ মুসলিম। আলোচিত গ্যালোওয়ে যে এলাকা থেকে এমপি নির্বাচিত হন তা রচডেল। যেখানে মুসলিম বাসিন্দাদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। মজার ব্যাপার হলো সর্বোচ্চ লেবার নেতা কেয়ার স্টারমারের নির্বাচনী এলাকা হলবর্ন এবং সেন্ট প্যানক্রাসের ভোটারদের প্রায় ১৯ শতাংশ মুসলিম। কনভারসেশন আরও জানাচ্ছে, হাউজ অব কমন্সে বর্তমানে ১৯৯ জন লেবার এমপি রয়েছেন। ৯-এর নির্বাচনে এ সংখ্যা ছিল ২০২। হাউজ অব কমন্সে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ৩২৬ এমপি এবং ৩৪৬টি কার্যকরী সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। লেবারের জন্য যে কারণে মুসলিম ভোট জরুরি হয়ে পড়েছে এবার। এ পরিস্থিতিতে গাজায় মৃত্যু নিয়ে স্টারমারের মন্তব্য ও ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সুর মেলানোয় আপত্তি উঠেছে তার দলের ভেতরেই।
কনভারসেশনের প্রতিবেদনে জানা যায়, চার্চ অব ইংল্যান্ডের ৬৪ শতাংশ কনজারভেটিভদের সমর্থন করে আসছে আর মাত্র ২৫ ভাগ লেবার সমর্থক। এ ছাড়া রোমান ক্যাথলিকদের ৪১ শতাংশ কনজারভেটিভ, ৪২ ভাগ লেবারকে সমর্থন দিয়ে আসছে। প্রটেস্ট্যান্ট চার্চের সঙ্গে যুক্ত ভোটারদের ৪৮ শতাংশ করজারভেটিভদের এবং ২৫ ভাগ লেবারকে সমর্থন করেন। আর অবিশ্বাসী ও অজ্ঞেয়বাদীরা লেবারকে সমর্থন করেন ৪৩ শতাংশ, কনজারভেটিভদের ৩৪ ভাগ। ইহুদিদের ৫৬ শতাংশ করজারভেটিভদের পক্ষে যেখানে লেবাররা পান মাত্র ৩০ শতাংশ ভোট। অথচ মুসলিমরা এতদিন কনজারভেটিভদের ভোট দিয়ে আসছেন ১৩ শতাংশ হারে, লেবারদের ক্ষেত্রে যা ৮০ শতাংশ।
অবশ্য কনভারসেশন জানাচ্ছে, গাজার পক্ষে অবস্থান না নিলে লেবার পার্টি ইংল্যান্ডের জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবে, এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে এ ইস্যুতে মুসলিমদের বাইরেও জনমত বাড়ছে এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। রক্ষণশীলদের পক্ষে এ ভোটারদের হারানোর ঝুঁকি নেই। ঝুঁকিটা লেবারের জন্যই।
