মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

রোগীর মৃত্যুতে দায়ী লিফট ব্যবহারকারীরা!

আপডেট : ১৪ মে ২০২৪, ০৬:৫৫ এএম

গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল লিফটে আটকা পড়ে এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় ওই লিফট ব্যবহারকারীদের দায়ী করেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। রবিবার রাতে ঢাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর প্রেরিত এক পত্রে এ তথ্য জানানো হয়।

অপর দিকে হাসপাতালের লিফটে আটকা পড়ে রোগী মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি তদন্ত দল সোমবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ ছাড়া জেলা প্রশাসন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গঠিত তদন্তকারী দলও ঘটনাটির তদন্ত কাজ শুরু করেছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, ‘লিফটে আটকে পড়া রোগীসহ লোকজন দরজা ধাক্কা-ধাক্কি করায় লিফটের দরজার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ডোর সেফটি কাজ করেনি বলে দাবি করা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয় লিফটে রোগীসহ অন্যরা ৪৫ মিনিট নয়, মাত্র ১০-১৫ মিনিট আটকে ছিলেন।

ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করছেন শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম ও গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-১০, ঢাকার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল হালিম।

হাসপাতালের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চিঠিটি গণপূর্ত বিভাগের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে যা বলা হয়েছে, এটি তাদের প্রাথমিক ধারণা।

চিঠিতে লিফটটি কাজ না করার জন্য লিফটে আটকে পড়া রোগীসহ লোকজনকে দায়ী করে বলা হয়, ‘প্রাথমিকভাবে লিফটটি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য নবম ও দশম তলার মাঝখানে আটকে গেলে লিফটির স্বয়ংক্রিয় রেসকিউ ডিভাইস কাজ করার জন্য এক মিনিট সময়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু লিফটে আটকে পড়া রোগীসহ লোকজন দরজা ধাক্কা-ধাক্কি করায় লিফটের ডোর সেফটি কাজ করে নাই।’

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ‘পরে লিফট অপারেটর লিফট মেশিন রুমে হাত দিয়ে ম্যানুয়ালি লিফটটি একটি ফ্লোরে আনার পূর্বেই রোগীসহ লোকজন দরজা খুলে বের হয়ে আসে। এই সব কাজ সম্পন্ন হতে ইতিমধ্যে ১০-১৫ মিনিট সময় অতিবাহিত হয়।’

চিঠিতে রোগীর অসুস্থতা নিয়ে বলা হয়েছে, ‘রোগীটি হার্টের রোগী ছিল। তৎক্ষণাৎ রোগীকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয় এবং কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’

মাঝপথে ত্রুটি দেখা দেওয়া লিফটটি আগে থেকে ত্রুটিপূর্ণ ছিল না দাবি করে চিঠিতে লিফটির সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘লিফটটি নিয়মিত সার্ভিস ও মেইনটেন্যান্স করা হয় এবং বর্তমানে লিফটি চালু আছে। আটকে পড়া রোগীসহ অন্য লোকজন দরজা ধাক্কা-ধাক্কি করায় লিফটির সমস্যা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

চিঠিতে গণমাধ্যমকে ভুল তথ্য প্রচারের জন্য অভিযুক্ত করে বলা হয়েছে, পত্রিকাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে যে, রোগীটি ৪৫ মিনিট লিফটে আটকা পড়ে ছিল তথ্যটি সঠিক নয়।

গতকাল সকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (ডেন্টাল) ডা. মাহমুদা বেগম, উপপরিচালক ডা. খায়রুজ্জামান ও সহকারী পরিচালক ডা. মাসুদ রেজা খান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় ডা. খায়রুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ ঘটনার জন্য কারও কোনো গাফিলতি আছে কি না, দায়িত্বে কোনো অবহেলা আছে কি না এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গাজীপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মতিউর রহমান বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছেন। তিনি বলেন, তদন্তকাজ শুরু করেছি। আশা করি প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করতে সক্ষম হব।

এ ব্যাপারে গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগের (বিদ্যুৎ ও রক্ষণাবেক্ষণ) নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হালিমের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

তবে উপসহকারী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক বলেন, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পল্লী বিদ্যুতের জয়দেবপুর বাজার ও বারি ফিডার ব্যবহার করা হয়। এর একটি বন্ধ হলে অপরটি পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যায়। আবার দুটি ফিডারে বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে গেলে সাত থেকে আট সেকেন্ডের মধ্যে হাসপাতালের জেনারেটর চালু করা হয়। জেনারেটরের বিদ্যুৎ ১০ সেকেন্ডের মধ্যে সব স্থানে চলে যায়। ঘটনার দিন লাইনে বিদ্যুৎ ছিল। লিফটি যখন ১১ তলায় ছিল তখন ভোল্টেজ আপ-ডাউন হয়ে থাকতে পারে। বৈদ্যুতিক ফল্টের কারণে ওই সময় লিফট বিদ্যুৎ না পাওয়ায় লিফটি আটকে যায়।  বিদ্যুৎ ফল্ট করার কারণে লিফটে ঝাঁকি লাগে এতে লিফটে থাকা লোকজন আতঙ্কিত হয়ে যায়। তারা লিফটের দরজা টানাটানি করাতে লিফটের দরজা স্থানচ্যুত হয়। এ সময় সেন্সর কাজ না করায় দরজাটি খুলেনি। খবর পেয়ে লিফটম্যান এসে চেষ্টা করেও দরজা খুলতে পারেনি।

হাসপাতালের পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, লিফট রক্ষণাবেক্ষণ, লিফটম্যান গণপূর্ত বিভাগের নিয়ন্ত্রণে। ছয়টি লিফটের জন্য কাগজে কলমে নয়জন লিফট অপারেটর থাকলেও সকালে পাঁচজন এবং বিকেলে ও রাতে চারজন দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তবে হাসপাতালে ভিজিটে বের হলে তিনি নিজেও লিফটে কোনো লিফট অপারেটরদের দেখতে পান না। এসব লিফট অপারেটর  নিয়োগ দেওয়া হয় আউটসোর্সিংয়ের মধ্যেমে তাদের বেতনও দেয় গণপূর্ত বিভাগ। বিভিন্ন সময়ে লিফটের সমস্যার কথা জানতে পেরে আমরা গণপূর্ত বিভাগকে বিষয়গুলো জানিয়ে থাকি।

গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবার লিফট আটকে এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। রবিবার সকাল পৌনে ১১টার দিকে মেডিসিন বিভাগ থেকে সিসিইউতে স্থানান্তরের সময় লিফটে ৪৫ মিনিট আটকে থেকে রোগীর মৃত্যু হয়। মারা যাওয়া রোগীর নাম মমতাজ (৫৩)। তিনি গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার বারিগাঁও গ্রামের শরীফ উদ্দীনের স্ত্রী।

দেশের সব সরকারি হাসপাতালের লিফট নিরাপদ রাখার নির্দেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের : দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে লিফট সব সময় নিরাপদ রাখার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। দেশের সব সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্সে অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে, সব প্রতিষ্ঠানের জরুরি সেবা, লিফট সেফটি সিস্টেম ও সার্ভিস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সব সময় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রোগীদের উপযোগী রাখতে হবে।

গতকাল সোমবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সারা দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের সঙ্গে এই ভিডিও কনফারেন্স করে। সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। এ সময় অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. মঈনুল আহসান, পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. হারুন-অর-রশীদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

কনফারেন্সের শুরুতে শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লিফট দুর্ঘটনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এরপর হাসপাতাল প্রধানদের জরুরি সেবা, লিফট ও সার্ভিস ম্যানেজমেন্টসহ বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত