শুক্রবার, ৩১ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

জলবায়ু বিপর্যয়ে সন্তান নিতে অনীহা!

আপডেট : ১৫ মে ২০২৪, ১২:০৩ এএম

পরিবেশ বিপর্যয় এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন সন্তানধারণে। দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

সুকান্ত ভট্টাচার্য সেই কবে লিখেছিলেন শিশুর জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে যাওয়ার কথা। কিন্তু তার আহ্বান কানে নেয়নি কেউ। পৃথিবী ক্রমে অবাসযোগ্য হয়ে উঠছে। জলবায়ু বিপর্যয়ের কবলে পড়ে পৃথিবী স্বয়ং ‘নরক’ হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় কয়েকজন পরিবেশবিদ জানিয়েছেন, তারা সন্তান নিতে চান না। তারা চান না এমন এক পৃথিবীতে শিশুরা আসুক, যা তাদের বেঁচে থাকার জন্য কষ্টকর হয়ে উঠছে ক্রমে। ভবিষ্যতের পৃথিবী হবে আরও বিপর্যয়ের। ধুঁকতে হবে মানুষকে। কষ্টকর হয়ে উঠবে জীবনযাপন। এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি তারা নিজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ফেলতে চান না। তাই পরিবার গঠনে অনীহা প্রকাশ করছেন। যদিও এ সিদ্ধান্ত তাদের জন্য কষ্টকর।

দ্য গার্ডিয়ান জানাচ্ছে, তারা এমন কয়েকজন পরিবেশবিদের সন্ধান পেয়েছেন, যারা ২০১৮ সাল থেকে পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে কাজ করা ‘আন্তঃসরকারি প্যানেল’র প্রধান লেখক বা পর্যালোচনা সম্পাদক। এমন ৮৪৩ বিশেষজ্ঞের মধ্যে ৩৬০ জন ভবিষ্যৎ জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন। ৯৭ জন নারী প্রশ্নের উত্তর দেন। যাদের মধ্যে ব্রাজিল, চিলি, জার্মানি, ভারত এবং কেনিয়ার নারী বিশেষজ্ঞ ছিলেন। ১৭ নারী জানিয়েছেন, তারা কম সন্তান নিতে আগ্রহী ছিলেন। বিশেষজ্ঞদের এক শতাংশের বয়স ৪০ বছরের এবং দুই-তৃতীয়াংশের বয়স ৫০-এর বেশি। আর সাত শতাংশ পুরুষ বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, তারা হয় সন্তান নেবেন না অথবা কম নেবেন।

নারী বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ গত দশকে সন্তান জন্ম দেন, যখন বৈশ্বিক উষ্ণতার বিপদ কম স্পষ্ট ছিল। তাদের মন্তব্য হলো, তারা এমন পৃথিবী চান না, যেখানে পরিবেশ বিপর্যয় প্রতিরোধে মানুষকে টোল দিতে হবে। কেউ কেউ এমন আতঙ্কে আছেন যে, পরিবেশ বিপর্যয় এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছাবে যে, তাদের সন্তানরা সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারবে না।

এ বিষয়ে ভিন্ন দুটি জরিপ পরিচালিত হয় যুক্তরাষ্ট্র এবং সুইডেনে। যুক্তরাষ্ট্রের জরিপে অংশ নেয় ২৭ থেকে ৪৫ বছর বয়সীরা। যেখানে দেখা যায়, বেশিরভাগ অংশগ্রহণকারী পরিবেশ বিপর্যয়ের এমন অবস্থায় সন্তান নেবে কিনা তা নিয়ে চিন্তিত। অথবা তাদের সন্তান এ পৃথিবীতে কতটা সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারবে, তা নিয়ে সংশয়ে আছে। একই ধরনের ফলাফল পাওয়া যায় সুইডেনের জরিপেও। বিরূপ পরিবেশের বিষয়টি সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ভাবিয়ে তুলছে। যদিও আফ্রিকা অঞ্চলে এ বিষয়ে কেমন ভাবনা চলছে তা জানা যায়নি।

দায় কার

ফ্রান্সের শীর্ষ জলবায়ু বিজ্ঞানীদের একজন অধ্যাপক ক্যামিল পারমেসান বলেন, আমরা কি সত্যিই একটি শিশুকে এই পৃথিবীতে আনতে চাই, যাকে আমরা বিপর্যস্ত করে তুলছি? তিনি বলেন, আমার বয়স এখন ৬২ এবং আমি সত্যি আনন্দিত যে, আমার সন্তান হয়নি। গার্ডিয়ান বলছে, পারমেসান একা নন। গবেষকদের প্রায় পাঁচ ভাগ জলবায়ু বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, তারা পরিবেশগত সংকট বিবেচনায় সন্তানহীন থাকার বা কম সন্তান নেওয়ার বিষয়ে ভেবেছেন।

১৯৬৮ সালে অধ্যাপক পল এহরলিচের বলেন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কথা। তার মতে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা পরিবেশ বিপর্যয়কে ডেকে আনছে। কারণ মানুষ পরিবেশ ধ্বংস করছে। এর জন্য তিনি আফ্রিকা ও এশিয়া অঞ্চলের জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। অবশ্য এ অভিযোগের ভেতর বর্ণবাদ লুকিয়ে আছে। তারপরও তার মতে, নারীদের শিক্ষিত করা এবং জন্মনিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা চালু হলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি কমানো যায়। একই কথা বলছেন পারমেসান। তার মতে, এটা খুব স্পষ্ট ছিল যে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি একটি সমস্যা ছিল,  জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্পূর্ণভাবে জনসংখ্যা স্থিতিশীল করার ওপর নির্ভরশীল। ব্রাজিলের ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব সান্তা ক্যাটারিনার সমুদ্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রেজিনা রড্রিগেসও সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সাও পাওলোর কাছে উপকূলীয় শহরে পরিবেশ ধ্বংস প্রত্যক্ষ করেন। যার কারণে তার ভেতর সন্তান না নেওয়ার ইচ্ছা জাগ্রত হয়। তিনি বলেন, সম্পদের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি আমার কাছে অল্প বয়স থেকে স্পষ্ট ছিল। তারপর আমি জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে শিখেছি। আমার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজন নেই। আমার স্বামী এবং আমি এক মুহূর্তের জন্য অনুশোচনা করি না। আমরা দুজনই জলবায়ু নিয়ে কাজ করছি এবং আমরা লড়াই করছি।

জার্মানির বন ইউনিভার্সিটির জলবায়ু দুর্বলতা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক লিসা শিপার একটি সন্তানের পক্ষে আছেন। তিনি বলেন, বিশে^র উত্তর প্রান্তের প্রতিটি ব্যক্তির কার্বন ফুটপ্রিন্ট দক্ষিণে বসবাসকারীদের চেয়ে অনেক বড়। এ বিষয়ে (সন্তান নেওয়া) সাবধানে চিন্তা করা দরকার। তিনি বলতে চেয়েছেন, ইউরোপ অনেক বেশি কার্বন নিঃসরণ করে বিশ্বের অন্যান্য এলাকার তুলনায়। তিনি বলেন, সত্যি বলতে এখনই আমি সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত হতে শুরু করছি। যখন সে ২০১৩ সালে জন্মগ্রহণ করে, আমি কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করার সম্ভাবনা সম্পর্কে আশাবাদী ছিলাম। এখন আমি তাকে সুরক্ষা ছাড়াই এই পৃথিবীতে ছেড়ে যাওয়ার জন্য দোষী বোধ করছি এবং জলবায়ু বিপর্যয়ে ভূমিকা পালনের জন্য দোষী বোধ করছি।

পরিবেশ বিপর্যয়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ভূমিকা নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। বিশেষজ্ঞ শিপার বলেন, পৃথিবীতে কত জনসংখ্যা আছে তা অপ্রাসঙ্গিক যদি শুধু একটি ছোট শতাংশ বেশিরভাগ ক্ষতি করে থাকে। পারমেসান এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, মূল প্রভাব হলো মানুষের ভোগের স্তর এবং মোট জনসংখ্যার সমন্বয়। তিনি বলেন, অর্ধেককে দায়ী করে বাকি অর্ধেককে উপেক্ষা করলে হবে না।

ধনীরা স্বার্থপর

এক ভারতীয় বিজ্ঞানী নাম প্রকাশ না করে জানান, তিনি নিজে সন্তান জন্ম দেওয়ার পরিবর্তে দত্তক গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভারতে অনেক শিশু আছে, যারা ন্যায্য সুযোগ পায় না। আমরা এত বিশেষ কেউ নই যে, আমাদের জিনপ্রবাহ অব্যাহত রাখা দরকার। তিনি আরও বলেন, ধনী পরিবারগুলো স্বার্থপর। তাদের শিশুমৃত্যুর হার কম। তারা শুধু নিজেদের পরিবার নিয়ে চিন্তা করে। অথচ তাদের কারণে কার্বন নিঃসরণ বেশি হয়। ধনীরা আত্মকেন্দ্রিক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, উন্নয়নশীল দেশগুলো অনেক দিন ধরে বলে আসছে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তাদের দায় খুব সামান্য। কিন্তু তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির ঝুঁকিতে আছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) দ্য স্টেট অব দ্য ক্লাইমেট ইন এশিয়া ২০২৩ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে জানা যায়, বিশ্বব্যাপী গড় উষ্ণতার চেয়ে দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে এশিয়ার দেশগুলোর আবহাওয়া। ১৯৬১ থেকে ১৯৯০ সালের গড় তাপমাত্রার চেয়ে শুধু ২০২৩ সালেই এই মহাদেশে উষ্ণতা বেড়েছে প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশ, ভারতসহ কিছু দেশ একদিকে তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত, আবার নিকটবর্তী চীন-পাকিস্তানের কোনো এলাকায় চরম বৃষ্টির সঙ্গে বন্যা দেখা দিয়েছে। চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ গুয়াংডংয়ে ভারী বৃষ্টিপাতে বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে শহর-নগর থেকে শুরু করে সব এলাকা।

বিবিসি বাংলা আরও জানাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বিপদাপন্ন ৫৫ দেশে ইতিমধ্যেই (২০০০ সাল থেকে ২০২০ পর্যন্ত) যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে তার পরিমাণ ৫০,০০০ কোটি ডলারেরও বেশি। আগামী দশক এ ক্ষতি আরও ৫০,০০০ কোটি ডলার বেড়ে যাবে। পৃথিবীর তাপমাত্রা এক ভগ্নাংশ বৃদ্ধির অর্থ হচ্ছে আরও ক্ষতি। আর উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ২০৩০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির পরিমাণ হবে ২৯০০০ কোটি ডলার থেকে ৫৮০০০ কোটি ডলার পর্যন্ত। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত ২০২২ সালের রিপোর্টে বলা হয়েছে বিশ্বের তাপমাত্রা এখন প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে ১.১৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বেড়ে গেছে।

শিশুদের ঝুঁকি

জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে জানা যাচ্ছে, চিলড্রেনস এনভায়রনমেন্টাল রাইটস ইনিশিয়েটিভ (সিইআরআই) জোটের সদস্য প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল, সেভ দ্য চিলড্রেন ও ইউনিসেফ প্রকাশিত নতুন এক প্রতিবেদন অনুসারে, জলবায়ু সংকটের কারণে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা প্রতিশ্রুত জলবায়ু তহবিল পাচ্ছে না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিলের মাত্র ২.৪ শতাংশ শিশুদের জন্য শ্রেণিবদ্ধ করা যেতে পারে। ইউনিসেফের ‘শিশুদের জলবায়ু ঝুঁকি সূচক’ অনুসারে, ১০০ কোটির বেশি শিশু জলবায়ু সংকটজনিত প্রভাবের অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। তারা আরও জানায়, শিশুরা পানি ও খাদ্যের অভাব, পানিবাহিত রোগ এবং শারীরিক ও মানসিক আঘাতের ক্ষেত্রে ঝুঁকিতে রয়েছে, যার সবই চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা এবং ধীরগতিতে শুরু হওয়া জলবায়ু প্রভাব উভয়ের সঙ্গে সংযুক্ত। প্রমাণ রয়েছে যে, আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তন শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিশুদ্ধ খাবার পানির মতো মৌলিক পরিষেবার সুযোগ ব্যাহত করছে। ইউনিসেফের জলবায়ু অ্যাডভোকেসির বিশেষ উপদেষ্টা পালোমা এসকুদেরো বলেন, প্রতিটি শিশু অন্তত একটি এবং অনেক ক্ষেত্রে একাধিক জলবায়ুজনিত বিপত্তির সম্মুখীন হয়।

বিশেষজ্ঞদের বার্তা হলো, সার্বিক বিপর্যয় মোকাবিলায় কাজ করতে হবে একসঙ্গে। শুধু যার দায় বেশি সে ক্ষতিপূরণ বেশি দেবে এমন নয়, বরং যার সক্ষমতা রয়েছে, তাকে বেশি এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষত ধনীরা তাদের অতিরিক্ত সম্পদ পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবিলায় ব্যবহার করতে পারেন বলেও মত দিচ্ছে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ। তা না হলে যে বিপর্যয় নেমে আসবে, সেটা সবার জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠবে। মানবজাতি গভীর সংকটে পড়বে এ ধারা চলতে থাকলে। ইতিমধ্যে যার লক্ষণ পরিস্ফুটিত। উচ্চতাপ, অতি বৃষ্টি, খরার মতো বিপর্যয় মোকাবিলা করতে হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত