হাসপাতালের লিফট যেন মৃত্যুকূপ

আপডেট : ১৬ মে ২০২৪, ১২:৪২ এএম

হাসপাতালে লিফট থাকা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং রোগীদের জন্য অত্যাবশ্যক। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে লিফট হয়ে উঠছে মৃত্যুকূপ। দেশের অধিকাংশ হাসপাতালের লিফটগুলো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অচল অথবা বিপজ্জনক হয়ে আছে। গত ১২ মে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিফটে দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে এ রকম করুণ মৃত্যু দেশজুড়ে বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এ রকম ট্র্যাজেডি নতুন নয়। মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ৯ তলা থেকে লিফটে উঠতে গিয়ে নিচে পড়ে এক রোগীর মৃত্যু হয়।

কেবল রোগী নয়, স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রীও লিফটজনিত বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে জানা যায়, ৩১ মার্চ রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে লিফট দুর্ঘটনার কবলে পড়েন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন ও প্রতিমন্ত্রী ডা. রোকেয়া সুলতানা। প্রতিষ্ঠানটির ১০তলা থেকে চিকিৎসকদের জন্য নির্ধারিত লিফটে নিচে নামার সময় তারা লিফটে আটকা পড়ে ভয় পান। ওই ঘটনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী লিফটের বেহাল দশা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তবে শুধু নিউরোসায়েন্স কিংবা তাজউদ্দীন আহমদ হাসপাতালই নয়, দেশের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালের লিফটগুলো যেন পরিণত হয়েছে মরণফাঁদে। রাজধানী ঢাকার বড় বড় সরকারি হাসপাতাল থেকে শুরু করে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে স্থাপিত লিফটগুলোর চিত্র প্রায় একই। এসব হাসপাতালে স্থাপন করা লিফটগুলোর অর্ধেকের বেশি অকেজো কিংবা বছরের অর্ধেক সময় নষ্ট থাকে। নির্দিষ্ট মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া কিংবা যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামত না করে অচল ফেলে রাখায় দুর্ভোগ পোহাতে হয় রোগীদের। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদকরা ঢাকাসহ নানা জেলায় ঘুরে দেখেছেন বেশিরভাগ হাসপাতালের লিফটের তলা (ফ্লোর) নির্দেশক ডিসপ্লে নষ্ট, ফলে লিফট কোন তলায় অবস্থান করছে, তা বোঝা যায় না। প্রায়ই লিফটের দরজা আটকে গেলে তা টেনে খুলতে হয় এবং এভাবেই দিনের পর দিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনরা এসব হাসপাতালে সেবা নিতে যাচ্ছেন। পুরনো এসব লিফট চালু হওয়ার পর উৎকট শব্দ শুরুর পাশাপাশি দুলতে থাকে, যা আতঙ্ক তৈরি করে।

লিফট সচল না থাকায় সিজারিয়ান, হৃদরোগ, অস্ত্রোপচারের রোগীদের স্ট্রেচারে সিঁড়ি দিয়ে টেনে তুলতে হয়, যা জীবনের ঝুঁকি বাড়ায়। আর অন্য রোগীদের সিঁড়ি বেয়ে বহুতল ভবনে উঠতে হয় লিফট নষ্ট থাকায়। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে প্রসূতি, শিশু, বৃদ্ধ ও শারীরিকভাবে দুর্বল রোগীদের। এ ছাড়া জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের জীবন পড়ছে ঝুঁকিতে। খোদ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুরনো ভবনের সাতটি লিফটই মেয়াদোত্তীর্ণ। এসব লিফট ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নতুন ভবনগুলোয় যেসব লিফট লাগানো হয়েছে, তা-ও নষ্ট হওয়ার পথে। দেশের কিডনি রোগীদের জন্য একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট। এই হাসপাতালের ছয়টির মধ্যে চারটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

লিফটের এ রকম বেহাল দশা দেশের প্রতিটি বিভাগীয় প্রধান হাসপাতালগুলোতেই। চিকিৎসার আশায় হাসপাতালে আসা রোগীদের জন্য লিফট হয়ে উঠেছে জীবনহানির অন্য নাম। বাংলাদেশে সরকারি সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ একটি বড় সমস্যা। সরকারি টেন্ডারে অনেক বেশি টাকা দেখিয়ে নতুন যন্ত্র কেনার ব্যাপারে কর্মকর্তাদের যতটা আগ্রহ থাকে, সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে সেই পরিমাণ অর্থ তছরুপ করার সুযোগ না থাকায় এই ব্যাপারে আগ্রহ কম দেখা যায়। এছাড়া, দেশের মানুষ নিজেদের অধিকার নিয়ে অনেকটাই অসচেতন আর সরকারি জায়গায় অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও প্রতিকার পাওয়া যায় না বেশিরভাগ সময়েই। এসব কারণ ছাড়াও, সরকারি হাসপাতালগুলোকে অকার্যকর করে একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী রোগীদের অনেক টাকা খরচ করে প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য করেন।

হাসপাতালে লিফট রক্ষণাবেক্ষণের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও অনীহা দুর্নীতি ও জবাবদিহিহীনতার ফলাফল। সরকারি হাসপাতালে দুর্নীতি দূরীকরণ ও কঠোর জবাবদিহি প্রচলন না করতে পারলে, করুণ ও নিদারুণ মৃত্যু ঘটতেই থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত