শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সামনে তাকাতে চাই পেছনে নয়

আপডেট : ১৬ মে ২০২৪, ০৬:২৪ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু বলেছেন, বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং সহিংসতামুক্ত নির্বাচন নিশ্চিতে গত বছর জুড়ে যুক্তরাষ্ট্র অনেক চেষ্টা করেছে, যা দুই দেশের সম্পর্কে খানিকটা টেনশন বা উত্তেজনা তৈরি করেছিল। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র এখন আর পেছনে তাকাতে চায় না, বরং সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে শুধুই সামনে তাকাতে চায়।

গতকাল বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং পররাষ্ট্র সচিব (সিনিয়র সচিব) মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট করেন ডোনাল্ড লু। এর আগে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন।

গত মঙ্গলবার বেলা ১১টার পর শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো থেকে ঢাকায় আসেন ডোনাল্ড লু। সফরের প্রথম দিনও তিনি ব্যস্ত সময় পার করেন। তিন দিনের সফর শেষে আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা ছাড়বেন লু।

ব্রিফিংয়ের শুরুতেই ডোনাল্ড লু তার সফরবিষয়ক বিবৃতি পড়ে শোনান। তবে উপস্থিত সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন গ্রহণ করেননি তিনি। উপস্থিত সবার উদ্দেশে সালাম ও শুভেচ্ছা জানিয়ে লু বলেন, ‘আমি দুদিন ধরে ঢাকায় আছি, দুদেশের জনগণের মধ্যে নতুন করে আস্থা-বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করার জন্য। এখানে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং অহিংস নির্বাচন নিশ্চিতে গত বছর জুড়ে যুক্তরাষ্ট্র অনেক পরিশ্রম করেছে; যা আমাদের সম্পর্কে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি করেছিল। যদিও এটি আমাদের সম্পর্কে খুবই সাধারণ বিষয়। কিন্তু এখন আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই, মোটেও পেছনে ফিরতে চাই না। আমরা আমাদের সম্পর্ককে দৃঢ় করার উপায় খুঁজে বের করতে চাই।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে যুক্তরাষ্ট্রের এই সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘দুদেশের মধ্যে এখনো অনেকগুলো অস্বস্তিকর ইস্যু রয়েছে। যার মধ্যে র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা, শ্রম অধিকার, মানবাধিকার, ব্যবসায়িক পরিবেশের সংস্কারসহ অনেক ইস্যু রয়েছে, যা নিয়ে আমি আজ (গতকাল) পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্যদের সঙ্গে কথা বলেছি। এই হার্ড ইস্যুগুলো নিয়ে আমাদের আলোচনা চলমান থাকবে। পাশাপাশি দুদেশের সম্পর্কের ইতিবাচক অনেক বিষয় রয়েছে। যেখানে আমাদের পরস্পরের সহযোগিতা দরকার।’

 লু বলেন, ‘আমরা এখানে নতুন নতুন বিনিয়োগের কথা ভাবছি। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ অবারিত করা, ক্লিন জ¦ালানিসহ ভবিষ্যতের জন্য আমাদের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করার সুযোগ আছে।’

ডোনাল্ড লু তার বিবৃতিতে দুর্নীতি প্রতিরোধের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আজকে আমি মন্ত্রীদের সঙ্গে দুর্নীতি প্রতিরোধের বিষয়ে আলোচনা করেছি। আমরা একসঙ্গে সরকারি কাজের স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করতে পারি। এর মাধ্যমে যেসব কর্মকর্তা দুর্নীতি করেছেন, তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে পারি।’

গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের জন্য নতুন ভিসানীতিও ঘোষণা করেছিল ওয়াশিংটন। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য দায়ী বা জড়িত বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়া হবে না।

এরপর বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়াই দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচন ‘অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি’ বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশ সফরে এসে সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নেওয়ার কথা বললেন ডোনাল্ড লু।

কর ফাঁকি বন্ধে বাংলাদেশকে সাহায্যের প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের : ডোনাল্ড লুর সঙ্গে বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিদ্যমান সম্পর্ক আরও গভীর ও বিস্তৃত করার লক্ষ্যে আলোচনা হয়েছে। দুদেশের সম্পর্ককে বহুমাত্রিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অভিযাত্রায় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ভূমিকা রয়েছে।

বাংলাদেশের করব্যবস্থাকে আধুনিক করা এবং কর ফাঁকি বন্ধের উপায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করতে চায় বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে ২৫ লাখ লোক কর দেয়। এখানে কয়েক কোটি লোকের কর দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু কর দেয় না। করব্যবস্থাকে আধুনিক করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করতে চায় এবং একই সঙ্গে কর ফাঁকি যে দেওয়া হয়, সেটি বন্ধের জন্য সহায়তা করতে চায় তারা।’

বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছে এবং এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য এবং আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করার জন্য তিনি (ডোনাল্ড লু) তাদের ডেভেলপমেন্ট ফিন্যান্স করপোরেশন থেকে বাংলাদেশকে অর্থায়ন করতে চান।’ তিনি আরও বলেন, ‘২০২৬ সালে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ এবং আমরা এখন যে সুবিধা পাই, সেটি আর থাকবে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশের যাত্রা যেন মসৃণ হয়, সেটির জন্যও সহায়তা চেয়েছি।’

নির্বাচন বা মানবাধিকার ইস্যু নিয়ে ডোনাল্ড লুর সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘উভয় পক্ষ আলোচনা করেছি যে অতীতে কী ঘটেছে, সেটি আমরা দেখতে চাই না। আমরা ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে চাই। তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে চায়। আমরাও চাই।’

ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ডোনাল্ড লু জানিয়েছেন, এটি তাদের বিচার বিভাগের অধীনে এবং সেখানে হোয়াইট হাউজ বা স্টেট ডিপার্টমেন্টের এখতিয়ার নেই। তবে তারা তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য সহায়তা করবে।’

মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের পরই সবচেয়ে বেশি ত্রাণ সহায়তা দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। হাছান মাহমুদ বলেন, ‘লু জানিয়েছেন, তিনি এ সহায়তা বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করবেন। পাশাপাশি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গাজায় শান্তি স্থাপন করার বিষয়টি আমরা আলোচনা করেছি। ডোনাল্ড লু বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার, সেক্রেটারি অব স্টেট মিস্টার ব্লিঙ্কেন অক্লান্তভাবে কাজ করছেন, যাতে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তিনি আমাকে যেটুকু বলেছেন, আমরা আশাবাদী। আমরা বলেছি, গাজায় যে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, নিরীহ শিশুদের, নারীদের হত্যা করা হচ্ছে। ৩৫ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, তার মধ্যে ৭০ শতাংশ নারী ও শিশু। এটি আসলে মেনে নেওয়া যায় না। আমি বলেছি, টেলিভিশনে যখন এগুলো দেখি তখন টেলিভিশন দেখা কনটিনিউ করতে পারি না। সেখানে শান্তি স্থাপন করা দরকার। তিনিও একমত যে সেখানে শান্তি স্থাপন করা দরকার।’

সম্পর্ক কীভাবে আরও সুদৃঢ় হবে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে : পরিবেশমন্ত্রী

সামনের দিনে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কীভাবে আরও সুদৃঢ় হবে, সেটা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী। গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে লুর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এ কথা বলেন।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পরিবেশমন্ত্রী বলেন, ‘দুদেশের মধ্যে সম্পর্কের কিছু বিষয় আছে, যার একটা স্থায়িত্ব থাকে। আবার কিছু কিছু বিষয় তৈরি হতে পারে, যেটা বিশেষ একটা প্রেক্ষাপটে তাদের অবস্থান থাকতে পারে। আমরা আজকে আমাদের যে মৌলিক বিষয়গুলো আছে, যেগুলো আমরা মনে করি অভিন্ন সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি।’

সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচনের আগে তাদের একটা দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। তাদের হয়তো কিছু অস্বস্তি ছিল, সেটা তো আমাদের মধ্যে ছিল না। আমরা আমাদের নির্বাচন করেছি। সেটা ওই সময়ের জন্য তাদের একটা অবস্থান ছিল। আমি এভাবে দেখি। এখন তো ওই পর্বটা আর নেই। আবার নির্বাচন হবে চার বা সাড়ে চার বছর পরে। তো এখন তো নির্বাচনের বিষয়টি এই আলোচনায় ভ্যালিডেড না। আর আমি প্রথমেই বলেছি, আমরা সামনের দিকে কীভাবে আমাদের সম্পর্কটাকে আরও সুদৃঢ় করব, সেটা নিয়েই মূলত আলোচনা করেছি।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত