সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

‘প্রতিটি রাত নির্ঘুম কেটেছে কখন না গুলি করে’

আপডেট : ১৬ মে ২০২৪, ০৬:৩৬ এএম

‘ভেবেছিলাম তোমাদের মাঝে আর ফিরে আসা হবে না। আল্লাহর অশেষ রহমতে আবারও সবার মাঝে ফিরে আসতে পেরেছি। জিম্মিদশায় প্রতিটি রাত নির্ঘুম কেটেছে, একটু ঘুমানোর চেষ্টা করেছি তো কিছুক্ষণ পরই আতঙ্কে জেগে উঠে দেখতে পেয়েছি জলদস্যুরা বন্দুক তাক করে রেখেছে। ভয়ে গা শিউরে উঠেছে, এই বুঝি এখনই গুলি করে মেরে ফেলবে।’ বাড়িতে ফিরে মা-বাবাকে বুকে জড়িয়ে ধরে অশ্রুসজল চোখে কথা বলছিলেন জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর নাবিক সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার চর-নুরনগর গ্রামের নাজমুল হক হানিফ। সোমালিয়ান জলদস্যুদের হাতে ৩৩ দিনের জিম্মিদশা শেষে দুই মাসের বেশি সময় পর গতকাল বুধবার সকালে বাড়ি ফেরেন তিনি।

জিম্মি অবস্থায় সোমালি জলদস্যুদের সঙ্গে কাটানো ভয়ংকর অভিজ্ঞতা নিয়ে ফেরা এমভি আবদুল্লাহর এ নাবিক জিম্মি থাকার দিনগুলোর পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘জলদস্যুরা পালা করে আমাদের ওপর নজর রাখত। তারা আগে রান্না করে খাওয়ার পর আমরা রান্না করার সুযোগ পেতাম। খাবারের বিশুদ্ধ পানি না দিয়ে আমাদের কষ্ট দিত। পানির অভাবে কয়েক দিন পরপর গোসল করতাম। পেট ভরে খাবার দিত না। ভয়ে গলা দিয়ে খাবারও ঢুকত না।’

নাবিক নাজমুলের বাড়ি ফেরায় শুধু তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই যে খুশির ঢেউ খেলছে তা নয়, পুরো চর-নুরনগর গ্রামে চলছে আনন্দ উৎসব। ছেলেকে বুকে ফিরে পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়েছেন নাজমুলের মা নার্গিস বেগম ও বাবা আবু সামা শেখ। তারা গতকাল সকালে গ্রামবাসী ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করেন।

এই চিত্র শুধু নাজমুলের পরিবারেই নয়, সোমালি জলদস্যুদের জিম্মিদশা থেকে ফেরা এমভি আবদুল্লাহর ২৩ নাবিকের পরিবার এবং তাদের স্বজনদের ঘরে এখন চলছে উৎসবের আমেজ। নাবিকদের ঘরে ফেরার আনন্দে বিভোর তাদের পরিবারের সদস্যরা। গত ঈদুল ফিতরে যাদের পরিবার ছিল শোকাচ্ছন্ন, ঈদের এক মাসেরও বেশি সময় পর যেন তাদের পরিবারে ফিরে এসেছে উৎসবের জোয়ার। যেন না ফেরার দেশ থেকে ঘরে ফিরেছেন এই ২৩ নাবিক।

নাজমুলের বাবা আবু সামা শেখ বলেন, ‘আমার পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনজন মারা গেছে। এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। একমাত্র জীবিত ছেলে নাজমুলকে নিয়ে আমাদের অনেক আশাভরসা। জলদস্যুদের হাতে জিম্মির খবরে আমরা চরম ভেঙে পড়ি। আমাদের নাওয়া খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হই।’

নাজমুলের মা নার্গিস বেগম বলেন, ‘ছেলে বাড়িতে ফিরে আসায় আমার বাড়িতে ঈদ উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। ছেলের পছন্দের সব খাবার রান্না করেছি।’

এমভি আবদুল্লাহর আরেক নাবিক নাটোরের বাগাতিপাড়ার জয় মাহমুদ বাড়িতে ফেরায় তার পরিবারেও যেন বইছে ঈদের আনন্দ। তিনি ওই জাহাজের সাধারণ নাবিক (ওএস) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গতকাল সকালে নিজ বাড়িতে ফেরেন বাগাতিপাড়ার ১ নম্বর পাকা ইউনিয়নের সালাইনগর দক্ষিণপাড়া গ্রামের জিয়াউর রহমান ও আরিফা বেগম দম্পতির ছেলে জয়।

তার মা আরিফা বেগম (৫০) বলেন, জলদস্যুদের হাতে ছেলের আটক হওয়ার খবরে তাদের পরিবারে ঈদের আনন্দ হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ছেলে ফিরে আসায় তার মনে হচ্ছে আজ ঈদের দিন।

জয় মাহমুদ বলেন, ‘জলদস্যুদের হাতে আটক হওয়ার পর আর বাড়ি ফিরতে পারব কি না, সেই আতঙ্কে ছিলাম। দস্যুরা সবসময় বন্দুক তাক করে রাখত। বাড়ি ফিরে আসাটা ছিল আমাদের কাছে স্বপ্নের মতো।’

এমভি আবদুল্লাহর থার্ড অফিসার তারেকুল ইসলামের বাড়ি ফরিদপুরের মধুখালীর ছকড়িকান্দি গ্রামে বইছে আনন্দের জোয়ার। গতকাল ভোরে বড় ভাই হাসানের সঙ্গে বাড়িতে এসে পৌঁছান তারেকুল। তাকে দেখে আনন্দের অতিশায্যে কেঁদে ফেলেন স্বজনসহ গ্রামবাসীর অনেকে। তারেকুল বাড়িতে ঢুকতেই হাসি ফোটে তার পরিবারের সদস্যদের মুখে। তাকে দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন ও গ্রামবাসী। বাড়িতে ঢোকার পরই বাবা দেলোয়ার হোসেন ও মা হাসিনা বেগম বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করেন তারেকুলকে। এ সময় তার স্ত্রী নুসরাত জাহানসহ সবার চোখেই ছিল আনন্দ অশ্রু। তারেকুল তার দেড় বছর বয়য়ী একমাত্র কন্যাসন্তানকে তানজিহাকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করেন।

জিম্মিদশা কাটিয়ে এমভি আবদুল্লাহর নাবিক ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের মমারিজপুর এলাকার ইব্রাহিম খলিল উল্যাহ বিপ্লব গত মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে শহরের নাজির রোডের বাসায় ফেরেন। বাবা আসবে এমন খবরে সকাল থেকে অপেক্ষায় ছিল তার দুই শিশু সন্তান দ্বিতীয় শ্রেণিতে পডুয়া রেদোয়ান বিন ইব্রাহিম ও দুই বছর বয়সী রিহান বিন ইব্রাহিম। আর ফুল নিয়ে বরণের অপেক্ষায় ছিলেন বিপ্লবের মা ও স্ত্রী। বাবাকে পেয়েই জড়িয়ে ধরে গালে-মুখে চুমু দিয়ে আদর করতে থাকে দুই ছেলে। এমন দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন উপস্থিত অনেকেই।

বাড়িতে ফেরার পর এমভি আবদুল্লাহর দ্বিতীয় প্রকৌশলী ক্যাপ্টেন তৌফিকুলকে দেখে আনন্দে অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তার বৃদ্ধা মা দিল আফরোজ। গতকাল সকাল ৯টায় খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গার করিমনগরের বাসায় ফেরেন তৌফিকুল। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে দিল আফরোজ বলেন, ‘জিম্মি অবস্থা থেকে ছেলে ফিরে আসার খবর ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না, সে অন্যরকম অনুভূতি। ছেলেসহ অন্য নাবিকরা জিম্মি থাকায় চিন্তা ছিল কী হয়, না হয়। এখন ছেলে ফিরে এসেছে, তার জন্য আল্লাহর নিকট হাজারো শুকরিয়া জানাই।’

এমভি আবদুল্লাহর ইঞ্জিন ক্যাডেট আইয়ুব খান গতকাল দুপুরে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের সোনাপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রাখালিয়া গ্রামের বাড়িতে ফেরেন। বাড়ি ফেরার প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘প্রচণ্ড ভয়ে আমাদের দিন কাটাতে হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভয় হয়েছে মাকে নিয়ে। কারণ বাবাকে হারানোর এক মাস পরই আমি বিপদে পড়েছি। এটি কীভাবে মা সহ্য করছেন তা নিয়েই সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা হয়েছিল। এখন মায়ের কোলে ফিরেছি। এ আনন্দ সব কষ্ট, সব ভয় জয় করে নিয়েছে।’

জিম্মিদশার বিভিন্ন ঘটনা দেশ রূপান্তরের কাছে তুলে ধরেন এমভি আবদুল্লাহর চিফ অফিসার মো. আতিক উল্লাহ খান। তিনি বলেন, ‘যতদিন জিম্মি ছিলাম আমাদের জাহাজের ব্রিজে রাখা হয়। মুক্ত হওয়ার আগপর্যন্ত আমাদের সবাইকে ব্রিজে থাকতে হয়েছে। সেখানে মাত্র একটি ওয়াশরুম থাকায় সবার কষ্ট হয়েছে। পানির রিজার্ভ কমে আসায় আমাদের সমুদ্রের পানি ব্যবহার করতে হয়েছে। মোজাম্বিক থেকে ফেরার পথে আমরা প্রায় দুই মাসের খাবার জাহাজে করে এনেছিলাম। কিন্তু কতদিনে মুক্ত হব বুঝতে না পারায় কম করে আমাদের খেতে হয়েছে। তার ওপর দস্যুরা আমাদের খাবার খাওয়ায় খাদ্য সংকটে পড়ার আশঙ্কায় ছিলাম। এ কারণে স্বাভাবিক অবস্থায় যেভাবে খেতাম, সেভাবে খেতে পারিনি।’

নিজস্ব প্রতিবেদক এবং সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত