সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ত্রিমুখী সংকট, জি এম কাদের এখন কি করবেন?

আপডেট : ১৬ মে ২০২৪, ১১:০৬ পিএম

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা জি এম কাদের এখন ত্রিমুখী সংকটে পড়েছেন। এই ত্রিমুখী সংকটের সূত্রপাত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণে বিএনপিসহ সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়ে যায় এবং সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। বিএনপির নেতারা জি এম কাদেরের তীব্র সমালোচনা করেছেন জি এম কাদেরও সভা সেমিনারে তার জবাব দিয়েছেন।

আবার নির্বাচনের আগে দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের স্ত্রী ও দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ফলশ্রুতিতে নির্বাচন থেকে ছিটকে যান রওশন এরশাদ আর দলের ভাঙন নিশ্চিত হয়।

এদিকে শাসকদল আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিলেও সরকারের সঙ্গে বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে জি এম কাদের ও তার দল জাতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগের নীতনির্ধারক মহল জি এম কাদের ও তার অনুসারীদের বিশ্বাস করতে পারছেন না। শুধু তাই নয় জি এম কাদের মনে করছেন তার যাবতীয় সংকটের পেছনে সরকারি দায়ী। সব মিলিয়ে সরকার কিংবা বিরোধী উভয় বলয়ের সঙ্গেই জি এম কাদেরের স্থায়ী দূরত্ব দেখা দিয়েছে। অপরদিকে নিজ দলের ব্রাকেটের সংখ্যা আরেকটা বেড়েছে।

নির্বাচনের এক বছর আগে থেকে জি এম কাদের সরকার বিরোধী অবস্থান নেন। এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবেন না এমন বার্তা দেন। ফলে বিরোধী দল বিএনপির শীর্ষ মহলের সঙ্গে জি এম কাদেরের যোগাযোগ স্থাপিত হয়। দেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও জি এম কাদেরকে গুরুত্ব দেওয়া শুরু করেন। কিন্তু নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় বিএনপির শীর্ষ নেতারা জি এম কাদের ও জাতীয় পার্টির ওপর ক্রুদ্ধ হন।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী চলতি বছরের ১৫ ই জানুয়ারি রাজধানীতে এক সমাবেশে বলেন, আমাদের সামনে উদাহরণ হয়ে থাকবে জাতীয় পার্টি। এই নির্বাচনে তাদের প্রধান নেতা জি এম কাদের সাহেব কত কথা বললেন- এই সরকারের অধীনে নির্বাচন করা যাবে না, এরা গতবার রাত্রে বেলা নির্বাচন করেছেন কত কথা বললেন। তারপরে শুধুমাত্র নিজের স্ত্রীর (শরীফা কাদের) জন্য গোটা দলকে বিক্রি করে দিলেন।

এদিকে সম্প্রতি বিএনপিকে ইঙ্গিত করে জি এম কাদের বলেন, বিএনপি আন্দোলনে পরাস্ত হয়েছে, বিএনপি বলছে আমি নির্বাচনে না গেলেই নাকি নির্বাচন বানচাল হতো আর তারা ক্ষমতায় আসতে পারতো। এগুলো হচ্ছে নিজেদের দোষ ঢাকার জন্য আমার ঘাড়ে দোষ দেয়া। আমি তাদের দোষ দিচ্ছি না। দেশের স্বার্থে তারা কাজ করছে কিন্তু তারা সফল হয়নি। তাদের দোষটা আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে।

তিনি বলেন, 'তারা বলছে, আমি একটা বিশাল নেতা। আমি নির্বাচনে না গেলে নাকি দেশের ভবিষ্যতই চেঞ্জ হয়ে যেতো। আমি নিজেকে এত বড় নেতা মনে করি না। আমি নির্বাচনে যেতাম আর না যেতাম দেশ এভাবেই চলতো। এমন পরিস্থিতিই থাকতো। আমাকে দোষ দিয়ে নিজেদের দোষ ঢাকার চেষ্টা করবেন না'।

শাসকদল আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহল জি এম কাদেরের কর্মকাণ্ডে বিরক্ত। গত রোজায় জাপার ইফতার মাহফিলে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীকে দেখা যায়নি। একই ইফতারে বিএনপিরও কাউকে দেখা যায়নি।

রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে তাকে ও তার দল জাপাকে সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসানো হয়েছে বলে মনে করেন জি এম কাদের। তাকে যেকোনো মুহূর্তে সরিয়ে দেবে সরকার এমনটাই মনে করেন জি এম কাদের ঘনিষ্ঠরা। জি এম কাদের মনে করেন, জাপার চলমান সংকটের জন্য সরকার দায়ী। সরকার তাকে দুর্বল করতেই জাপায় দ্বন্ধ সৃষ্টি করে রাখে। নির্বাচনে তার নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই জাপাকে আসন ছাড় দেয় সরকার।

নির্বাচনের পর থেকে সংসদ কিংবা সভা সেমিনারে লাগাতর সরকারের সমালোচনা করে যাচ্ছেন জি এম কাদের। সম্প্রতি তিনি বলেন, এখন আমার কাছে মনে হয়, আমরা ছোটবেলায় রূপকথার গল্প পড়তাম, আরব্য রজনী। সেখানে বলা হতো, সিন্দাবাদকে একবার দৈত্য নদী পার হওয়ার কথা বলে—আমি পঙ্গু, আমাকে পাড় করে দেন। ঘাড়ের মধ্যে উঠেছে, আর তারপর ঘাড় থেকে নামে না। এখন বর্তমান সরকার সিন্দাবাদের সেই দৈত্য হয়ে জনগণের কাঁধে চেপেছে। এখন জনগণের কথায় সে চলবে না, জনগণকে তার কথায় চলতে বাধ্য করছে। এটি হলো আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য।'

এদিকে রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাপা আরেকবার ভেঙেছে। এবার রওশনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন কাজী ফিরোজ, আবু হোসেন বাবলার মতো বড় নেতারা। ফলে দল ও দলের বাইরে জি এম কাদেরের গ্রহণযোগ্যতা কমেছে ক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত