যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে দুদেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দুই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম বৈঠকেই এটি স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন খারিজ হওয়া, অন্য দেশের অপরাধী এবং ভিসার মেয়াদ পার হয়ে যাওয়া অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সহজ হবে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার।
ব্রিটেনের প্রভাবশালী সংবাদপত্র দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের মার্চ মাস থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত ১১ হাজার বাংলাদেশি সে দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন।
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে সাধারণত তিন ধরনের ভিসা নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন বলে জানাচ্ছে দ্য টেলিগ্রাফ। সংবাদমাধ্যমটির তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক বা ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে থাকার প্রত্যাশায় অ্যাসাইলাম বা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন অনেকে।
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অভিবাসীদের আইনি সহায়তা দিয়ে থাকেন সিনিয়র কোর্ট অব ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলসের সলিসিটর আবদুর রকিব।
বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী যেসব শর্ত মিললে অ্যাসাইলাম পাওয়া যায়, সেগুলো মিলছে না।
আবদুর রকিব বলেন, ‘নিজ দেশে জীবনের ঝুঁকি আছে, এটি প্রমাণ করতে না পারলে, রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ থাকে না।’
আরেক আইনজীবী জুয়েল চক্রবর্তী বলেন, ‘অনেকে কাগজপত্র অনুযায়ী যথাযথভাবে সাক্ষাৎকার দিতে পারেন না।’
নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের খবরে অভিবাসনবিষয়ক আইনজীবীদের উদ্বিগ্ন হয়ে কেউ কেউ ফোন করছেন বলেও জানিয়েছেন আইনজীবী জুয়েল।
টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১ বছরে ১১ হাজার বাংলাদেশি যুক্তরাজ্যে এসেছেন ছাত্র, কর্মী কিংবা ভ্রমণ ভিসা নিয়ে। এরপর তারা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশের আবেদন সফল হয়েছে।
সর্বাধিক আবেদন করেছেন পাকিস্তান থেকে আসা ব্যক্তিরা। তাদের সংখ্যা ১৭ হাজার ৪০০-এর মতো। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত, যাদের আবেদনের সংখ্যা ৭ হাজার ৪০০।
লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশন থেকে জানানো হয়েছে, আগে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে থাকা চুক্তির আওতায় যুক্তরাজ্য থেকে অবৈধ নাগরিকদের ফেরত পাঠানো হলেও ব্রেক্সিটের পর দেশটির সঙ্গে কোনো চুক্তি ছিল না। তাই এই সমঝোতা করা হয়েছে।
আগে থেকেই অবৈধ অভিবাসীদের প্রত্যাবাসনের জন্য ইইউর সঙ্গে বাংলাদেশের একটা স্ট্যান্ডার্ড অপারেশন প্রসিডিউর (আদর্শ কর্মপ্রক্রিয়া) বা এসওপি ছিল।
এর আওতায়ই ইউরোপের কোনো দেশে অনুমোদনহীন কোনো বাংলাদেশি থাকলে তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হতো। ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ থেকে বেরিয়ে যায়। ফলে, দেশটির বেলায় আর এসওপি প্রযোজ্য ছিল না। যে কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন করে আলাপ-আলোচনা শুরু করতে হয় বলে জানিয়েছেন লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম।
এত দিন কাউকে ফেরত পাঠাতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে তার একটি সাক্ষাৎকার নিতে হতো নিজ দেশের দূতাবাসকে। এখন থেকে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ থাকলে এই বাধ্যতামূলক সাক্ষাৎকারের প্রয়োজন হবে না।
লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার বলেন, ‘এখন যেহেতু এমআরপি আছে বা ই-পাসপোর্ট আছে, এখন ইন্টারভিউয়ের (সাক্ষাৎকার) প্রয়োজন পড়ে না।’
যুক্তরাজ্যে অবৈধ বাংলাদেশির সংখ্যা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম বলে জানান হাইকমিশনার তাসনিম। তিনি বলেন, ‘২০১২-১৩ সালের দিকে প্রতি মাসে ১ থেকে ১৫০ জনকে ফেরত পাঠানো হতো। কিন্তু এখন প্রতি মাসে মাত্র ছয়-সাতজনের ইন্টারভিউ নিই। সেখান থেকে হয়তো তিনজনকে পাঠানো হয়।’
সুনির্দিষ্ট অবস্থান না বলতে পারলেও বাংলাদেশের হাইকমিশনারের ধারণা, যুক্তরাজ্যে অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যার তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ২০-এরও পরে হবে। অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যার ভিত্তিতে জানা না গেলেও রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীর দিকে বাংলাদেশ অষ্টম অবস্থানে আছে।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ১২ বছরে ১৫ হাজার ৯৫০ বাংলাদেশি রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছে। তবে, দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, এসব আবেদনের ৯৫ শতাংশই খারিজ হয়ে গেছে।
বিবিসি বাংলা বলছে, যুক্তরাজ্য সরকারের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২২ সালে দেশটিতে ৭ লাখ ৪৫ হাজার মানুষ অভিবাসন গ্রহণ করেছে, যেটি যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অভিবাসন কমানোর উদ্দেশ্যে ২০২৩ সালের শেষদিকে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘পাঁচ দফা পরিকল্পনা’ ঘোষণা করে। এতে সোশ্যাল কেয়ার ওয়ার্কারদের (সামাজিক সেবা প্রদানকারী) ভিসার ভিত্তিতে স্বামী-স্ত্রী, সন্তানদের নেওয়ার সুযোগ বাতিলের কথা জানানো হয়। একইভাবে, স্পাউস বা পার্টনার ভিসায় স্বামী, স্ত্রী বা সঙ্গীকে নিতে হলে ওই ব্যক্তির আয়ের যে সীমা নির্ধারিত ছিল তাও বাড়ানো হয়।
লন্ডনভিত্তিক অভিবাসন আইনজীবী আবদুর রকিব বিবিসি বাংলাকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাজ্যে অভিবাসনবিরোধী জনমত প্রবল। ফলে, এটি রাজনৈতিক অঙ্গীকারেও অগ্রাধিকার পেয়ে আসছে। তিনি বলেন, এখানকার মানুষের বক্তব্য হলো অভিবাসনপ্রত্যাশীরা অবৈধভাবে থেকে কম পারিশ্রমিকে কাজ করবেন, কিছু মৌলিক সুবিধা নেবেন। এতে অন্য ব্রিটিশ বঞ্চিত হবেন।
গত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টি তাদের ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি হিসেবে অভিবাসীর সংখ্যা হ্রাসের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
আইনজীবী রকিব মনে করেন, আগামী নির্বাচনের আগে কনজারভেটিভ পার্টির সরকার দেখাতে চায় যে তারা কাজ করছে।
