ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধের প্রতিবাদে রাজধানীর মিরপুরে সড়ক অবরোধ করে যানবাহন ভাঙচুর, পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনায় আন্দোলনরত চালকদের বিরুদ্ধে চারটি মামলা করেছে পুলিশ। এসব মামলায় বেশ কয়েকজনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতপরিচয়সহ আসামি করা হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার অটোরিকশাচালককে। যাদের মধ্যে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এদিকে গতকালও অটোরিকশা বন্ধের প্রতিবাদে রাজধানীর সড়কে বিক্ষোভ করেছেন চালকরা। তারা ডেমরা, রামপুরা ও মিরপুরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এতে ওই সব সড়কের দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দেখা দেয় তীব্র যানজট। ভোগান্তিতে পড়েন অফিসগামী লোকজন। উপায় না পেয়ে অনেকে হেঁটে আবার কেউ কেউ বিকল্প উপায়ে গন্তব্যস্থলে যান। পুলিশ চালকদের রাস্তা থেকে তুলে দিলে দুপুরের পর থেকে ওই সব সড়কে যান চালাচল স্বাভাবিক হয়।
যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ব পরিস্থিতি ও দ্রব্যমূল্যের কারণে স্বল্প আয়ের মানুষের কষ্টের কথা বিবেচনা করে শুধু ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের অনুমতি দিয়েছেন। তবে এসব রিকশার লাইসেন্সের দাবিতে ফের আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ব্যাটারি রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদ।
এর আগে ১৫ মে রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলতে না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে বিআরটিএ ভবনে সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদের সভায় দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিআরটিএর চেয়ারম্যানকে নির্দেশনাও দিয়েছিলেন তিনি। এরপরই অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে পুলিশ। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধে সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত রবিবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর মিরপুর গোলচত্বর এলাকা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন চালক ও মালিকরা। তারা রাস্তা অবরোধ করে রাজধানীতে অটোরিকশা চলাচলের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান। দুপুরের দিকে পুলিশ তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিতে চাইলে সংঘর্ষ বাধে। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের পর বিক্ষোভকারীরা সরে যান। বিকেলের দিকে বিক্ষোভকারীরা কালশীতে রাস্তা অবরোধ করে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। এতে পুলিশ বাধা দিলে ফের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশের দুটি বক্সেও আগুন দেন আন্দোলনকারীরা।
রবিবার সড়ক অবরোধ করে বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর, পুলিশ বক্সে আগুন, পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে আন্দোলনরত চালকদের বিরুদ্ধে তিন থানায় চারটি পৃথক মামলা হয়েছে। এর মধ্যে পল্লবী থানায় দুটি, কাফরুল থানায় একটি ও মিরপুর মডেল থানায় একটি।
পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. জসীম উদ্দীন মোল্লা বলেন, রবিবার রাতে পল্লবী থানায় দুটি মামলা হয়। একটি মামলা পল্লবী থানা পুলিশ ও অপর মামলাটি পল্লবী ট্রাফিক জোন থেকে করা হয়।
পল্লবী থানার ওসি মাহফুজুর রহমান মিয়া বলেন, পল্লবী থানায় করা পৃথক দুই মামলায় ১৫ চালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মিরপুর মডেল থানার ওসি মুন্সি সাব্বির আহমেদ জানান, তার থানায় করা মামলায় এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে কাফরুল থানার ওসি ফারুকুল আলম জানান, তার থানায় হওয়া মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ১২ জন।
ডেমরা, রামপুরা ও মিরপুরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ : গতকাল সকাল ১০টার আগে রামপুরায় সড়ক অবরোধ করেন ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকরা। তারা রামপুরা বেটার লাইফ হাসপাতালের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। ফলে সড়কটির দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তৈরি হয় তীব্র যানজট। রামপুরা থানার ওসি মো. মশিউর রহমান জানান, ৪০ থেকে ৫০ চালক সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। প্রায় ৪০ মিনিট পর সড়ক থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। বেলা সোয়া ১১টার দিকে বেশ কয়েকজন অটোরিকশাচালক শেওড়াপাড়ায় রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। এতে কিছু সময়ের জন্য ওই সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে আন্দোলকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন। পুলিশ পাল্টা ধাওয়া করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় কয়েকজন চালককে আটক করে পুলিশ।
একই সময়ে রাজধানীর ডেমরা এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন রিকশাচালকরা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে চালকদের সঙ্গে তাদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপে করে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেয়।
আন্দোলনে যাবে সংগ্রাম পরিষদ : ব্যাটারি রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের ঢাকা মহানগর শাখার অর্থ সম্পাদক রোকশানা আফরোজ আশা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা আপাতত আন্দোলন স্থগিত করেছি। তবে ২৭ মে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেব এবং লাইসেন্সের জন্য দাবি জানাব।
ঢাকা জেলা ট্যাক্সি কার, অটো টেম্পো, অটোরিকশা চালক শ্রমিক ইউনিয়নের দপ্তর সম্পাদক শফিকুল মিয়া বলেন, ‘আমরা আন্দোলন তিন দিনের জন্য স্থগিত করেছি। পরে আমরা লাইসেন্সের দাবিতে আন্দোলনে যাব।’
ঢাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধে ডিএমপির উদ্যোগের কী হবে জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ড. খ. মহিদ উদ্দিন বলেন, ‘সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সরকার যে সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা দেবে, সেটিই প্রতিপালন করা হবে। আমরা এখনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাইনি। তবে মূল সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধ থাকবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনার পর আমরা ব্যবস্থা নেব, কোথায় চলবে কোথায় চলবে না।’
