রাইসির মৃত্যু দুর্ঘটনাই

আপডেট : ২৩ মে ২০২৪, ১২:৫৭ এএম

হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি। সোমবার ২০মে দুর্ঘটনার প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর, ইব্রাহিম রাইসিকে বহনকারী হেলিকপ্টারটির ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়া গেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আবদোল্লাহিয়ান ও পূর্ব আজারবাইজানের গভর্নর মালেক রহমতি-সহ হেলিকপ্টারটিতে অবস্থানকারী ৯ জনের কেউই আর বেঁচে নেই। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মুখপাত্র আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ আলি তা নিশ্চিত করেছেন। আজারবাইজানের একটি জলাধার প্রকল্প উদ্বোধনের পর, পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের রাজধানী তাবরিজে যাচ্ছিলেন তারা। একইসঙ্গে তিনটি হেলিকপ্টার ছিল। দুটি হেলিকপ্টার ঠিকঠাক পৌঁছাতে পারলেও, প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমিরকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি ঠিকঠাক পৌঁছাতে পারেনি। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কবলে পড়ে হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়। ৯ জন আরোহীর কেউই বাঁচেননি।

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় দুর্ঘটনাকবলিত, ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমিরকে বহনকারী এই হেলিকপ্টারটি নিয়ে গত তিনদিন থেকে চলছে নানা আলোচনা-পর্যালোচনা, কেচ্ছা-কাহিনি। এর মূল কারণ ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি। পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে আমেরিকা, ইসরায়েলের কাছে ইরানের প্রেসিডেন্ট  ইব্রাহিম রাইসি ছিলেন অনেকটা ‘ভয়ংকর’ ব্যক্তি। আমেরিকার হুমকি-ধমকি এবং নিষেধাজ্ঞা কোনো কিছুরই পরোয়া করেননি ইব্রাহিম রাইসি। অদম্য সাহসিকতায় এগিয়েছেন। সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়াতে ইরানি কনস্যুলেটে ইসরায়েল ভয়ংকর হামলা চালিয়ে ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করে। তার জবাবে ইরান নিজের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলের ওপর আঘাত করে যে শৌর্যবীর্য প্রদর্শন করে, তাতে ইসরায়েল তো বটেই, ইসরায়েলের দোসর আমেরিকাও থমকে যায়। আর এর পুরোটাই হয় ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির উৎসাহ-উদ্দীপনায়। অবশ্য ইরানের এই আঘাত নিছকই ‘নমুনা মাত্র’ বলে উল্লেখ করেছে ইরান। এসব কর্মকাণ্ডের জন্য ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসিকেই বিবেচনা করেছে ইসরায়েল এবং আমেরিকা। এজন্যই ইব্রাহিম রাইসি ইসরায়েলের কাছে যেমন ভীতিকর ব্যক্তি ছিলেন, তেমনি আমেরিকার কাছেও ছিলেন ভয়ংকর। এছাড়া ইব্রাহিম রাইসিকে ইরানের সর্বোচ্চ এবং আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উত্তরসূরিও মনে করা হতো। যে কারণে একজন কট্টরপন্থি নেতাও মনে করত ইসরায়েল ও আমেরিকা।

ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি সম্পর্কে আমরা জানি, রাইসি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। ইব্রাহিম রাইসির জন্ম ১৯৬০ সালে। ২০ বছর বয়সে রাইসি ইরানের কারাজের প্রসিকিউটর নিযুক্ত হন। ২০১৯ সালে হন বিচার বিভাগের প্রধান। ২০২১ সালে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে নির্বাচিত হন ইরানের অষ্টম প্রেসিডেন্ট। অর্থাৎ ইব্রাহিম রাইসি বিচার বিভাগ থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রধান বিচারপতি থাকাকালে রাইসি অনেক মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে ছিলেন বলে বলা হয়ে থাকে। ইব্রাহিম রাইসি জাতিগত বোধ থেকে, দেশপ্রেমের দিক থেকে সন্দেহাতীতভাবে একজন কট্টরপন্থি নেতা ছিলেন। যারা ব্যক্তিগতভাবে রাইসিকে কাছ থেকে জেনেছেন, তাদের ভাষ্য ‘ইব্রাহিম রাইসি একজন অত্যন্ত সজ্জন ও ভদ্র মানুষ ছিলেন।’

হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর পর ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে তুলে ধরার  চেষ্টা চলছে। বলা হচ্ছে, এ নিছকই দুর্ঘটনা নয়। এর পেছনে রহস্য রয়েছে। যে হেলিকপ্টারে রাইসি ভ্রমণ করছিলেন, হেলিকপ্টারটি আমেরিকার তৈরি ‘বেল ২১২ হেলিকপ্টার’ এবং এখানেও রহস্যের আঁধার থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু জানা যায়, ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লবের পর, এটি আমেরিকার বিক্রি করার কথা নয়। সে হিসাবে এটি ৪৫ বছরের পুরনো হেলিকপ্টার। তাছাড়া আমেরিকা এই হেলিকপ্টারের আরও অনেক আধুনিক ও নতুন ‘সংস্করণ’ করেছে। রাইসির মৃত্যু রহস্যের সঙ্গে আবার ইসরায়েলের ‘মোসাদ’কেও জড়ানোর প্রয়াস আছে। তবে এই ২০২৪-এ ইরানের মতো সামরিক দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং বিচক্ষণ বাহিনী থাকার পরও ব্যাপারটি ঠিক ‘ধোপে টেকে না।’

হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর খবরে ইসরায়েলের ধর্মীয় নেতারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। বলেছেন, এটা ‘ঐশ্বরিক শাস্তি’। ইসরায়েলের ধর্মীয় নেতা রাবি মেইর আবু তবুল রাইসিকে ‘তেহরানের জল্লাদ’ বলে গালি দিয়ে উষ্মাও প্রকাশ করেছেন। হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় রাইসির মৃত্যুতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন আমেরিকার সিনেটর ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার, সিনেটর রিক কক। তবে এই সঙ্গে এমন সন্দেহও প্রকাশ করেছেন যে, ইব্রাহিম রাইসিকে নিষেধাজ্ঞা-সহ হুমকি-ধমকি দিয়ে নিবৃত্ত করতে ব্যর্থ হয়ে, রাইসিকে টার্গেট করতে পারে বাইডেন প্রশাসন। এদিকে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তার ভাষ্য, এখনো পর্যন্ত সন্দেহ করার মতো কিছু পাওয়া যায়নি।

দুর্ঘটনায় নিহত ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসিকে নিয়ে যখন বিশ্বময় তোলপাড়, নানা আলোচনা-পর্যালোচনা, গালগল্প তখন ইসরায়েলের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা ‘টাইমস অব ইসরায়েল’ বলছে, ‘প্রেসিডেন্ট মূলত পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী। মূল সিদ্ধান্ত ইরানের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির।’ ‘টাইমস অব ইসরায়েল’-এর কথার সূত্র ধরে যদি এগোনো যায় তো দেখা যায়, ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুতে ইরানের নীতি এবং কর্মের কোনো হেরফের হবে না। ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যু দুর্ঘটনা না কি, এ-ও খতিয়ে দেখতে মোটেই পিছপা হবে না ইরান। ইতিমধ্যে তদন্ত কাজ শুরুও করে দিয়েছে। তদন্তে যদি প্রমাণিত হয়, এটা দুর্ঘটনা নয় তো ইরান তার পরবর্তী পদক্ষেপ কী নিতে পারে তা-ও সহজেই অনুমান করা যায়। এ কারণে ইরানের জন্য ব্যাপারটির অনুসন্ধান এবং সঠিক তথ্য খুঁজে বের করা অপরিহার্য। তদন্তে যা-ই প্রমাণিত হোক না কেন ইরান তা বিশ্ব-সমক্ষে অবশ্যই তুলে ধরবে। যারা মনে করছেন, ইরান এ নিয়ে কোনো লুকোচুরির আশ্রয় নেবে, তারা বোকামি করবেন নিঃসন্দেহে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে এই স্বল্পকালে ইব্রাহিম রাইসি ইরানকে উচ্চতর মর্যাদায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। সদাই দোলাচলে থাকা আরব বিশ্ব তথা মধ্যপ্রাচ্যকে ভারসাম্য এনে দিয়েছিলেন রাইসি। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যকে আমেরিকার প্রভাব বলয় থেকে সরিয়ে আনতে পেরেছিলেন। পেরেছিলেন ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের অভিভাবক করে তুলতে। মার্কিনিদের মাতব্বরিকে দূরে ঠেলে সমগ্র বিশ্বে ইরানের আসনকে উচ্চতর মর্যাদায় নিয়ে গিয়েছিলেন ইব্রাহিম রাইসি।

ইব্রাহিম রাইসি হিজবুল্লাহ, হামাস, হুতিদের বিভিন্ন ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে একটি মজবুত বলয় তৈরি করতে পেরেছিলেন। ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান এখন হিজবুল্লাহ, হামাস, হুতিরা। ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি এসব কারণে সারা বিশ্বেই তাই নন্দিত এবং কারও কারও কাছে নিন্দিতও।

ইব্রাহিম রাইসি মারা গেছেন, এটা যেমন ধ্রুব সত্য তেমনি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায়ই তার মৃত্যু, আপাতত এটাও সত্য। পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় এ কথা সত্যিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওখানকার আবহাওয়া সম্পর্কে যারা জানেন, তারা বলেছেন, আবহাওয়া সম্পূর্ণ অনুকূলে থাকার পরও মুহূর্তেই সেখানকার আবহাওয়া বদলে যায়, ভয়ংকর রূপ নেয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, দুর্ঘটনা তো ঘটতেই পারে। যে কারও বেলায় কোনো দুর্ঘটনা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে নিয়ে আসতে পারে। ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির বেলায়ও তা-ই হয়তো ঘটে থাকতে পারে। ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মতো এমন একজন বরেণ্য ব্যক্তির দুর্ঘটনায় অকাল এবং মর্মান্তিক মৃত্যুতে বিশ্ব নেতারা মর্মাহত। সারা বিশ্ব শ্রদ্ধা জানিয়ে শোক প্রকাশ করেছে। বিলম্বে হলেও, আমেরিকা শোক জানিয়েছে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত