সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

স্বাস্থ্যে বরাদ্দ কম ফেরত বেশি

আপডেট : ২৫ মে ২০২৪, ০১:৪১ এএম

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বাজেট সবচেয়ে কমজিডিপির শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ মাত্র। এ বরাদ্দও ঠিকমতো খরচ করতে পারছে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। প্রতি বছর বরাদ্দের গড়ে ২৮ শতাংশ ফেরত যায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ফেরত গেছে বরাদ্দের ৩৯ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ফেরত যাচ্ছে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ থেকে, বছরে গড়ে ৩২ শতাংশ এবং সেবা বিভাগ থেকে, গড়ে ২৭ শতাংশ।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অধিদপ্তর ও বিভাগের মধ্যে বরাদ্দের টাকা খরচে সবচেয়ে পিছিয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, ন্যাশনাল ইলেকট্রো মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার ও জেলা হাসপাতালগুলো। এসব প্রতিষ্ঠানের ৩৪-৫৭ শতাংশ টাকা ফেরত যাচ্ছে।

চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বা এডিপির বরাদ্দের অর্ধেকও খরচ করতে পারেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। খরচ হয়েছে মোট বরাদ্দের মাত্র ৩১ শতাংশ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং গত বছরের জুনে প্রকাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের ‘অ্যান অ্যাসেসমেন্ট অব অ্যালোকেশন অ্যান্ড ইউটিলাইজেশন অব হেলথ সেক্টর বাজেট’ গবেষণা থেকে স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের এ চিত্র পাওয়া গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাত যদি যথাযথ গুরুত্ব পেত, তাহলে বরাদ্দে ও ব্যয়ে এমন পরিস্থিতি দাঁড়াত না। এর মানে, স্বাস্থ্য খাত গুরুত্ব পাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে দুই ধরনের বাজেট আসেরাজস্ব বাজেট ও উন্নয়ন বাজেট। রাজস্ব বাজেটের ৯০ শতাংশের বেশি ব্যয় হয়। এ বাজেটের বরাদ্দ খরচ করতে না পারার মূল কারণ সময়মতো অর্থ ছাড় না করা। প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো প্রশাসনিকতায় আবদ্ধ থাকে, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাবও রয়েছে। ব্যবস্থাপকরা অডিট ভীতিতে থাকে। মন্ত্রণালয়ের বাইরের স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান যেমন ইডিসিএল, পিডব্লিউডি, হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট, অ্যাম্বুলেন্স ও গাড়ি মেরামতে, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি মেরামতে যুক্ত তাদের দক্ষতা, সক্ষমতা ও সহযোগিতার অভাব রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপকদের সক্ষমতারও অভাব।

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘উন্নয়ন বাজেট খরচ করতে না পারার মূল কারণ যোগ্য প্রকল্প পরিচালকের অভাব, ভবন নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি সরবরাহের যোগ্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করতে না পারা ও প্রকল্প পরিচালককে সহযোগিতা করার মানসিকতার অভাব। এখানেও সময়মতো টাকা ছাড় করা হয় না। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি তো আছেই।’

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বাজেটের টাকা খরচ করতে পারছে না। অথচ স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি ব্যয়ের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি টাকা খরচ হচ্ছে ব্যক্তির পকেট থেকে। ১৯৯৭ সালে স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি ব্যয় ছিল মোট ব্যয়ের ৩৬ শতাংশ, এখন তা কমে ২৩ শতাংশ হয়েছে। আর ব্যক্তির খরচ ৫৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৯ শতাংশ হয়েছে। ঠিকমতো খরচ করতে জানলে বাজেটও বাড়ত। মানুষ সেবা পেত। চিকিৎসক, নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া যেত।

গত বছর ফেরত গেছে ৩৯% টাকা : সরকারের অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩৬ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা।

খরচ করতে না পারায় বছর শেষে ফেরত গেছে ১৪ হাজার ৩২১ কোটি টাকামোট বরাদ্দের ৩৯ শতাংশ। ওই বছর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য বরাদ্দ

ছিল ২৯ হাজার ২৮১ কোটি টাকা। ফেরত গেছে ১১ হাজার ৬০২ কোটি টাকাবরাদ্দের ৪০ শতাংশ। স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল ৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। ফেরত গেছে ২ হাজার ৭১৯ কোটি টাকাবরাদ্দের ৩৬ শতাংশ।

২০১৮-১৯ সালে বরাদ্দ ছিল ২৩ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। খরচ করতে না পারায় ফেরত গেছে ৪ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকাবরাদ্দের ২১ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২৫ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা। ফেরত গেছে ৮ হাজার ৯৯ কোটি টাকাবরাদ্দের প্রায় ৩২ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। ফেরত গেছে ৭ হাজার ৫৫৫ কোটিবরাদ্দের ২৬ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। ফেরত গেছে ৭ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকাবরাদ্দের প্রায় ৩৪ শতাংশ।

উল্লিখিত পাঁচ অর্থবছরে বরাদ্দ বেড়েছে ৩৭ শতাংশ। ফেরত গেছে বছরে গড়ে ২৮ শতাংশ।

খরচে পিছিয়ে শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ : গত পাঁচ অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের চেয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের টাকা বেশি ফেরত গেছে। সেবা বিভাগে বছরে গড়ে ফেরত গেছে ২৭ শতাংশ ও স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ থেকে ফেরত গেছে ৩২ শতাংশ।

শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ করে অর্থ ফেরত গেছে ২০২২-২৩ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে। প্রায় ৩৪ শতাংশ অর্থ ফেরত গেছে ২০২১-২২ অর্থবছরে। ৩০ শতাংশ ফেরত গেছে ২০২০-২১ অর্থবছরে ও ২৪ শতাংশ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের টাকা সর্বোচ্চ ফেরত গেছে ২০২২-২৩ অর্থবছরে, ৪০ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩০ শতাংশ, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৫ শতাংশ, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২১ শতাংশ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২০ শতাংশ।

৭৭ শতাংশের বেশি খরচ করতে পারছে না দুই অধিদপ্তর : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর বরাদ্দের ৭৭ শতাংশের বেশি খরচ করতে পারছে না।

২০১৭-১৮ থেকে ২০২১-২২এ পাঁচ বছরে এ দুই অধিদপ্তরের গড়ে ২৩ শতাংশ অর্থ ফেরত গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জন্য বরাদ্দ ৮৭ শতাংশের ওপর। ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত তিন অর্থবছরের মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাত্র ৫৯ শতাংশ অর্থ খরচ করতে পেরেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বাকি দুই অর্থবছরে খরচ ৮৭-৮০ শতাংশের মধ্যে ছিল।

অন্যদিকে, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের অধীনেই। পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যয় হয়েছিল ২০২০-২১ অর্থবছরে, ৯০ শতাংশ। এর আগের ও পরের অর্থবছরে ব্যয় ছিল ৬৭ শতাংশের ঘরে। শেষ অর্থবছরে ব্যয় আশঙ্কাজনক হারে কমে ৪৭ শতাংশে নামে।

খরচে পিছিয়ে চার প্রতিষ্ঠান : স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, বরাদ্দ খরচে সবচেয়ে পিছিয়ে চারটি প্রতিষ্ঠান। সর্বোচ্চ পিছিয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। গত পাঁচ বছরে এ অধিদপ্তরের গড়ে ৫৭ শতাংশ অর্থ ফেরত গেছে। ন্যাশনাল ইলেকট্রো মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের বছরে গড়ে ফেরত গেছে ৪৩ শতাংশ, জেলা হাসপাতালগুলোর গড়ে বরাদ্দের ৩৪ শতাংশ ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফেরত গেছে ২৫ শতাংশ।

এ ছাড়া ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর ২৪ শতাংশ, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ১৪ শতাংশ ও সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১০ শতাংশ টাকা ফেরত গেছে।

পিছিয়ে বাংলাদেশ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ সবচেয়ে কম। বিশ্বব্যাংকের ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল মোট জিডিপির শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাত পেয়েছে জিডিপির দশমিক ৭৬ শতাংশ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল দশমিক ৬৭ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আমাদের মতো দেশগুলোতে জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দের সুপারিশ করে। গত ১২-১৩ বছর ধরে জিডিপির ১ শতাংশের কম দেওয়া হচ্ছিল। এবার সেটা আরও কমেছে।

চীন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভারত ও পাকিস্তানে বরাদ্দ হয় জিডিপির ১ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে।

খরচ হচ্ছে না এডিপির টাকাও : পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য এডিপির বরাদ্দ হয় ১১ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা। গত মার্চ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৩২ শতাংশ। ৬৮ শতাংশ বরাদ্দে এ সময়ে হাতই পড়েনি। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ খরচ করতে পেরেছে এডিপির বরাদ্দের ৩২ শতাংশ ও স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ ২৯ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে যে মন্ত্রণালয়গুলোকে বেশি অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে সাত নম্বরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এডিপি বাস্তবায়নে সবচেয়ে পেছনে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের খরচ হয়েছে ২৩ শতাংশ অর্থ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত