থ্যালাসেমিয়া মূলত রক্তের রোগ। রোগটি জিনগত হওয়ার কারণে বংশপরম্পরায় পরবর্তী প্রজন্মে প্রবাহিত হতে পারে। এই রোগের কারণে রক্তে ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন তৈরি হয়। ফলে রক্তের লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে যায় এবং লোহিত রক্তকণিকার আয়ু কমে যায়। শরীরে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়।
থ্যালাসেমিয়ার ধরন
থ্যালাসেমিয়া প্রধানত ২ প্রকার :
বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজর : সাধারণত থ্যালাসেমিয়া বলতে থ্যালাসেমিয়া মেজরকেই বোঝায়। বাবা-মা উভয়েরই জিনে সমস্যা থাকে এবং বংশপরম্পরায় সন্তানের মাঝে প্রকাশ পায়।
বিটা থ্যালাসেমিয়া মাইনর : বাবা অথবা মা যে কোনো একজনের দেহে ত্রুটিপূর্ণ জিন থাকে। এরা মূলত রোগী নয় বরং রোগের বহনকারী। উপসর্গ ছাড়াই এরা সাধারণ জীবনযাপন করতে পারে। মাঝে মাঝে এদের রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। সাধারণত কোনো ধরনের চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
লক্ষণ ও উপসর্গ
থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুরা সাধারণত জন্মের প্রথম মাস পর্যন্ত সম্পূর্ণ সুস্থ থাকে। এরপর ধীরে ধীরে তার শরীরে রক্তস্বল্পতা তৈরি হয়, যা পরবর্তী সময় মারাত্মক আকার ধারণ করে। শিশুর বয়স এক বছর হওয়ার আগেই তার মধ্যে থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণদেখা দিতে থাকে। যেমন : শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠা স্বাভাবিক কাজকর্মে অনীহা খেলাধুলায় আগ্রহ না থাকা একা একা ঝিম মেরে বসে থাকা খাবারে অরুচি শিশু অপুষ্টিতে ভুগতে থাকে চোখ হলুদ হয়ে যায় প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হয়পেট ফুলে যায় পেটে চাকা অনুভূত হয় কখনো কখনো পেটে ব্যথা হয় ঘন ঘন অসুখ-বিসুখ হওয়া শরীরের তুলনায় মাথা বড় হওয়া শারীরিক বৃদ্ধি কম হওয়া
রোগ নির্ণয়
হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস পরীক্ষার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া শনাক্ত করা হয়। এ ছাড়া ডিএনএ পরীক্ষা করেও এই রোগ ধরা যায়।
চিকিৎসা
শরীরে রক্ত দেওয়া : থ্যালাসেমিয়া রোগীর প্রধান চিকিৎসা মূলত শরীরে রক্ত দেওয়া বা ব্লাড ট্রান্সফিউশন করা। আক্রান্ত শিশুকে ১ থেকে ২ মাস পরপর রক্ত দিতে হয়। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুকে ফ্রেশ লোহিত রক্ত কণিকা পরিসঞ্চালন করা উত্তম। পাশাপাশি শিশুর দেহে আয়রনের আধিক্য কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ওষুধ দেয়া।
আধুনিক চিকিৎসা : থ্যালাসেমিয়া রোগের আধুনিক ও স্থায়ী চিকিৎসা হচ্ছে :
ক. বোন মেরো ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন
খ. জিন থেরাপি
প্রতিরোধে করণীয়
সচেতনতা বৃদ্ধি : থ্যালাসেমিয়া রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। আত্মীয়ের মধ্য বিয়ে নিরুৎসাহিত করা।
বিয়ের পূর্বে থ্যালাসেমিয়া জিন বহনকারী কি না পরীক্ষা করা : থ্যালাসেমিয়া জিনগত রোগ। বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করে পাত্র ও পাত্রী থ্যালাসেমিয়া জিন বহন করছে কিনা জেনে নেওয়া দরকার। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে থ্যালাসেমিয়া জিন বহনকারী হলে তাদের থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা ২৫ ভাগ। স্বামী বা স্ত্রী যে কোনো একজন থ্যালাসেমিয়া জিন বহনকারী হলে স্বাভাবিক বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ ভাগ ও থ্যালাসেমিয়া জিন বহনকারী শিশু জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা ৫০ ভাগ। এক্ষেত্রে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু জন্ম নেবে না।
গর্ভাবস্থায় থ্যালাসেমিয়ার ঝুঁকি : সন্তান গর্ভে আসার পর বিশেষ উপায়ে গর্ভস্থ শিশুর থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করা যায়। অনাগত সন্তানের থ্যালাসেমিয়া হওয়ার ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে গর্ভাবস্থায় থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করা উচিত। রক্ত পরিসঞ্চালনেই থ্যালাসেমিয়া রোগীর প্রধান চিকিৎসা। স্বাভাবিক ও সুস্থ মানুষের ৩ - ৪ মাস পরপর রক্তদানে উৎসাহিত করার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া রোগজনিত শিশুর অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
