সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ২ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ভোটে বামফ্রন্টের জনভিত্তি ফিরবে

আপডেট : ২৭ মে ২০২৪, ০৪:২০ পিএম

যুক্তি বনাম আবেগের দ্বন্দ্বে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণত আবেগের পাল্লা ভারী থাকে। বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মননে তো বটেই। ফলে আপনি এই মুহূর্তে ভারতের লোকসভা ভোটে বামপন্থি রাজনীতির হালহকিকত নিয়ে প্রশ্ন করলেই, বামপন্থি কর্মী-সমর্থকরা এক বাক্যে বলে উঠবে, এবার গতবারের চেয়ে অনেক বেশি আসন বামেরা পাবেন। এটা অবশ্য আমারও ধারণা, গতবারের চেয়ে এবার সারা দেশে বাম সাংসদ বাড়বে। বিহার, কেরালা, তামিলনাড়ু, হয়তো রাজস্থান সব মিলিয়ে বিভিন্ন বামপন্থি দল কুড়িটির মতো আসন পেলেও পেতে পারে। সিপিআইএম, সিপিআই, সিপিআইএম-এল, আরএসপি, ফরোয়ার্ড ব্লক মিলেমিশে দুই অঙ্কের সংখ্যা পেলে, সংসদে অন্তত কিছুটা হলেও বামস্বর জোরালো হবে। আর নিঃসন্দেহে তা গণতন্ত্রের পক্ষে সুখকর।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, বামদের বড় শরিক সিপিআইএমের শক্ত দুটো ঘাঁটি কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গে ভোটের ফলাফল কী হতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে টানা চৌত্রিশ বছর রাজত্ব করার পর রাজনীতিতে অকুলীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে কোণঠাসা হতে হতে, গত বিধানসভা নির্বাচনে একটিও আসন না জিতে বামেরা, স্বাধীনতার পর প্রথম বিধানসভায় অবিশ্বাস্যভাবে শূন্য হয়ে গেল তা বাম কর্মী-সমর্থকদের কাছে তো বটেই, এমনকি অনেক বামবিরোধীদের কাছেও দুঃস্বপ্ন।

সামগ্রিকভাবে এই ভরাডুবি বামফ্রন্টের হলেও বড় শরিক হিসেবে এর দায় নিশ্চিতভাবেই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) বা সিপিআইএম দলের। কেরালায় টানা চৌত্রিশ বছর ক্ষমতায় কখনোই থাকেনি বামেরা। সেখানকার ট্রেন্ড অনুযায়ী হয় কংগ্রেস বা বামেরা ঘুরে ফিরে কুর্সিতে বসে। সেখানে গত লোকসভা নির্বাচনে বামেরা আসন পেয়েছিল মাত্র একটি। বাকি সব দখল করেছিল কংগ্রেস ও তার শরিকরা। এবারও সেখানে মুখোমুখি ‘ইন্ডিয়া’ জোটের দুই শরিক বাম ও কংগ্রেস। পরিস্থিতি এখনো অবধি যা তাতে এবার সিপিআইএমের নেতৃত্বাধীন জোটের আসন নিশ্চিত বাড়বে।

পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা অনেক বেশি জটিল। একে তো চৌত্রিশ বছরের বাম শাসনের নেতিবাচক অনেক দিক জন মন থেকে এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। পাশাপাশি এখানে বামফ্রন্টবিরোধী রামধনু জোটের ভূমিকা, নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর গণ-আন্দোলনের সময় থেকেই ভীষণভাবে বামবিরোধী। মুখে বলে বটে যে, তারা মূলত সিপিআইএম বিরোধী। কিন্তু তাদের আচরণ দেখলেই এটা স্পষ্ট যে, তারা আদতেই কমিউনিজমের বিরুদ্ধে। এই বিচিত্র রামধনু জোটের সহাবস্থানও বিচিত্র রকমের। এখানে কে নেই! কংগ্রেসের সব থেকে প্রতিক্রিয়ার অংশ, তৃণমূল কংগ্রেসের পাশাপাশি আরএসএসের এক অংশ, বিভিন্ন নকশালপন্থি গোষ্ঠী, সিপিআইএম থেকে সরে আসা পিডিএস, জামায়াতে উলেমা হিন্দ, পুরনো আরএসএস ইত্যাদি বহু মতের মিলনস্থল এই রেনবো কোয়ালিশন। বিচিত্র মতাদর্শ এক জোট হয়েছে, যতনা আদর্শের কারণে, তার চেয়ে ঢের বেশি, কোনো না কোনো স্বার্থের জন্য। এই জোটে একদা মাওবাদী কমিউনিস্টরাও ছিলেন। কিন্তু ২০১১ সালে মাল্লাজুল্লা কোটেশ্বর রাও, কিষান জিকে ক্ষমতায় আসার অল্প দিনের মধ্যেই তৃণমূল সরকারের পুলিশ ভুয়া সংঘর্ষে মারার পর থেকে রামধনু জোট থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে মাওবাদীরা। অনন্য নকশালপন্থিদের সঙ্গে সিপিআইএম দলের মতাদর্শ নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এক ধরনের জ্ঞাতি শত্রুতা তাদের তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। চরম বাম ও চরম দক্ষিণের অদ্ভুত সহাবস্থান পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া আর কোথাও, কোনো রাজ্যে নেই।

তাই পশ্চিমবঙ্গের ছবি সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে লাল পতাকার বিরুদ্ধে যে দুটি শক্তিশালী দল সম্মুখসমরে অবতীর্ণ, তারা মুখে যাই বলুক, নিশ্চিন্তভাবে দুপক্ষই চরম দক্ষিণপন্থি। এ লেখা যেদিন লিখছি, সেদিন ঘটনাচক্রে নকশালবাড়ি দিবস। এই দিনেই পশ্চিমবঙ্গের তরাইয়ের নকশালবাড়ি বলে এক প্রত্যন্ত এলাকায় কৃষক অভ্যুত্থান ঘটেছিল। নকশালবাড়ি রাজনীতির মূল শিক্ষা ছিল অধিকার নিয়ে সোচ্চার, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল থাকা এবং মেরুদণ্ড সোজা রেখে পথচলা। মুশকিল হচ্ছে রাজ্যের তৃণমূল সরকার আদৌ গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল নয়। শ্রমিকদের ধর্মঘটের অধিকার থেকে বাকস্বাধীনতার সবই তার চক্ষুশূল। সে মোটের ওপরে ডোল রাজনীতি, অর্থনীতিতে বিশ্বাসী। বিজেপির সঙ্গে তার কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। তৃণমূল কংগ্রেসের নীতি হচ্ছে চোরকে চুরি করতে বলে গৃহস্থকে সজাগ থাকতে বলা। তবুও অনেক প্রগতিশীল অংশের মধ্যেও ধারণা আছে যে, বিজেপিকে আটকাতে পারে একমাত্র তৃণমূল। এই নির্মাণ সম্ভব হয়েছে চরমপন্থি বামেদের একাংশের দৌলতে। ফলে এ রাজ্যে সিপিআইএমকে একাধিক শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তাও কোনো সন্দেহ নেই। এবারের নির্বাচনে সিপিআইএম আগের তুলনায় অনেক বেশি চনমনে, শক্তিশালী। মহম্মদ সেলিম সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদক হওয়ার পর গোটা দলের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বদলে গেছে।

রোজ নিয়ম করে হরেক ধারার তথাকথিত চরম বাম ও দক্ষিণপন্থিরা সিপিআইএম পার্টির চৌত্রিশ বছরের শাসন নিয়ে তুলোধোনা করলেও তারা তারও আগে বাহাত্তর থেকে সাতাত্তর সালের সময়কালকে ভুলিয়ে দেন। বোধহয় ইচ্ছে করে। বামেরা ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় আসার পর যে জনমুখী কর্মসূচি নিয়েছিলেন তা অস্বীকার করা ইতিহাসের বিচ্যুতি। দল না দেখে রাজনৈতিক বন্দি মুক্তি, অপারেশন বর্গা, ভূমিহীন কৃষকদের হাতে জমি বণ্টন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাধিকার, ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে গ্রামীণ ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ইত্যাদি ইতিবাচক কাজকে ভুলে যাওয়া অপরাধ। পরবর্তী সময় বামেদের একাংশের আত্মম্ভরিতা, ঔদ্ধত্য জনগণের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। রেজিমেন্টেট পার্টি গণ-পার্টিতে পরিবর্তিত হয়। পার্টিতে বেনো জল ও গোষ্ঠী কোন্দল বাড়তে বাড়তে দলের আদর্শ তলানিতে ঠেকে। এই দুর্বলতার সুযোগ নেয় তৃণমূল সুপ্রিমো।

এই মুহূর্তে সিপিআইএম দলেও অনেক পরিবর্তন ঘটে চলেছে। দল নিঃসন্দেহে এক ট্রানজিশনে। নতুন নতুন একাধিক মুখ যেভাবে হক, রুটি-রুজির দাবি নিয়ে মাঠে ময়দানে শামিল হয়েছেন তা যথেষ্ট ইতিবাচক। মীনাক্ষী, দীপ্সিতা, সৃজন, সোনামণি টুডু, প্রতিকূর, সায়ন একঝাঁক তরুণ সামনে থেকে প্রবল পরাক্রমশালী দুটি দল বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়ছে তা সত্যিই কুর্নিশযোগ্য। মহম্মদ সেলিমের দুটি কথা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এক, তিনি মনে করেন, পার্লামেন্টের জোট থাকুক, কিন্তু গণআন্দোলন ছাড়া বামেদের সার্বিক পায়ের তলায় মাটি পাওয়া অসম্ভব। পাশাপাশি বৃত্ত বাড়াবার কথা অহরহ শোনা যাচ্ছে সিপিআইএম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদকের মুখে। নকশালপন্থিদের একাংশ তৃণমূলের সঙ্গী হলেও বাকিদের বড় অংশ কিন্তু অনেক দিন পর সিপিআইএমকে সমর্থনের পক্ষে বার্তা দিয়েছেন। একাধিক সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠন, তারাও দাবি তুলেছেন ভোট ফর লেফটের। সব মিলিয়ে তাই সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট  এবারের ভোটে ডার্ক হর্স। আবেগের বশে অনেক বাম সমর্থকদের ধারণা তারা এবার একাধিক সিট পাবেন। আমার তা মনে হয় না। খুব বেশি হলে এক-দুটো সিট জুটতে পারে। তাও আমি অন্তত পুরো নিশ্চিত না। তবে ভোট বাড়বে, গতবারের চেয়ে বহুগুণ। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট আগের মতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একচেটিয়া পাচ্ছেন না, এটা নিশ্চিত। সেই ভোট বলাই বাহুল্য বাম-কংগ্রেস জোট পাবে।

সব মিলিয়ে সিপিআইএম পুরনো জনভিত্তি অনেকটাই ফিরে পাবে। যা ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাদের আত্মবিশ্বাস ফেরাতে ভূমিকা নেবে। সামনে অনেক পথ, শত্রু মিত্র চিনতে হবে। বন্ধুবৃত্ত বড় করতে হলে অহমিকা, সংকীর্ণতা ছাড়তে হবে। গ্রামের দিকে মুখ ফেরানো ছাড়া বিকল্প রাস্তা নেই। আর বিকল্প নেই গণআন্দোলনের। মোদি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাক বা না পাক, বামেদের রাস্তায় থাকতেই হবে। হক, রুটি-রুজির দাবি কখনো সংসদীয় পথে সফল হতে পারে না। সামনে এগোতে গেলে সিপিআইএমকে নতুন নতুন বিকল্পের কথা ভাবতেই হবে। সবার আগে দরকার শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলা। যা গত কয়েক বছরে একাধিক কারণে প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে গেছে। এ বছর অবশ্য অনেক জায়গায় শত্রুর চোখে চোখ রেখে সিপিআইএম কর্মী-সমর্থকদের লড়তে দেখা গেছে। তবুও মাটি ফেরাতে সংগঠনের কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত