মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে ২০১৭ সালে বিমানে আমার হার্ট অ্যাটাক হয়। মালয়েশিয়ার স্থানীয় একটি হাসপাতালে আমার ইকো ও এনজিওগ্রাম করার পর চিকিৎসকরা আমাকে বিষয়টি জানান। চিকিৎসক আমাকে জানান হার্টে রিং পরাতে হবে। তবে এর আগে আমার শারীরিক অবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য তিনি ১৫ দিনের ওষুধ দেন। এরপর আমি সিঙ্গাপুর যাই এবং সেখানকার চিকিৎসকও আমাকে একই পরামর্শ দেন। সিঙ্গাপুরের চিকিৎসক আমাকে বলেন, ১৫ দিনের মেডিসিনের কোর্স শেষ করার পর আমার ওপেন হার্ট সার্জারি বা রিং পরানোর প্রয়োজন হবে। তবে আমার অপারেশনের সময় যদি বীট ড্রপ করে তবে জীবন ঝুঁকিতে পড়বে। এরপর আমি দেশে ফিরে আসি এবং খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই— রাজধানীর বাংলামোটরে সাওল হার্ট সেন্টারে বসে দেশ রূপান্তরকে এসব কথা বলছিলেন বরগুনা-২ আসন থেকে নির্বাচিত তিনবারের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম মনি।
তিনি বলেন, অপারেশন নিয়ে আমি যখন দুশ্চিন্তায় দিন পার করছিলাম, তখন এক বন্ধুর পরামর্শে সাওল চিকিৎসা পদ্ধতির কথা জানতে পারি। সাওলে এসে জানতে পারি ভারতের বিখ্যাত ও স্বনামধন্য কার্ডিওলজিস্ট অ্যান্ড লাইফস্টাইল স্পেশালিষ্ট ডা. বিমল ছাজেড়ের পরামর্শ ও নির্দেশনায় তারা অপারেশন ছাড়াই জটিল সব হার্টের রোগীর চিকিৎসা করছেন। তবে তাদের কথায় আমি পুরোপুরি আস্থা পাইনি, আমি ভারতে গিয়ে ডা. বিমল ছাজেড়ের সঙ্গে দেখা করে কথা বলি। তার কথায় আস্থা পেয়ে আমি সাওলের চিকিৎসা নেই এবং সুস্থ হই।
কেবল নুরুল ইসলাম মনিই নয় দেশের ১ লাখের ও বেশী হার্টের রোগী সাওলের চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন বলে দাবী প্রতিষ্ঠানটির। সায়েন্স অ্যান্ড আর্ট অফ লিভিং যার সংক্ষিপ্ত নাম সাওল, বাংলায় বলা যায় বিজ্ঞানসম্মতভাবে বাঁচার শিল্পিত কৌশল। এই পদ্ধতিতে বিনা রিং, বিনা অপারেশনে হার্ট ব্লকের চিকিৎসার পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, যোগব্যায়াম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জীবন যাপন পদ্ধতি পরিবর্তনের দ্বারা হৃদরোগীরা সুস্থ হতে পারবেন। আমেরিকার বিখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ডিন অর্নিশ এই চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। তার দেখানো চিকিৎসার আলোকে ভারতের বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট অ্যান্ড লাইফস্টাইল স্পেশালিষ্ট ডা. বিমল ছাজেড় ১৯৯৫ সালে নয়াদিল্লীতে ‘সাওল হার্ট সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করেন। ডা. বিমল ছাজেড় উপমহাদেশের প্রথম নন-ইনভেসিভ কার্ডিওলজির প্রবর্তক। বর্তমানে আমেরিকা, ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশে সাওলের অন্তত ১৩২টি শাখা রয়েছে।
সাওলের চিকিৎসকরা বলেন, হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ হৃদযন্ত্রের রক্তনালীতে চর্বি জমা। প্রচলিত চিকিৎসা অনুযায়ী হার্ট অ্যাটাকের রোগীদের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ‘রিং’ পরানো কিংবা ‘বাইপাস সার্জারি’ করাতে হয়। তবে অস্ত্রোপচার করলেই যে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ থাকবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। হার্ট সুস্থ রাখতে প্রয়োজন লাইফ স্টাইল ও খাওয়া দাওয়ায় পরিবর্তন নিয়ে আসা। কেননা রিং পরানো কিংবা বাইপাস সার্জারির পরও চর্বি জমতে পারে। বাইপাসের মাধ্যমে রক্তচলাচলের জন্য যে রাস্তা করা হয় চর্বি জমলে তা বন্ধ হয়ে জটিলতা তৈরি হয় এবং পুনরায় বাইপাস সার্জারির প্রয়োজন হয়।
তারা বলেন, আমরা রোগীর সমস্যা শুনে তাদেরকে কিছু স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে দেই। এই পরীক্ষার ফলাফল বিবেচনা করে রোগীর পরিস্থিতির তীব্রতা যাচাই করে দুই ধরনের চিকিৎসা দিয়ে থাকি। এই দুধরনের চিকিৎসা হলো— ‘এনহ্যান্সড এক্সটারনাল কাউন্টার পালসেশন (ইইসিপি)’ এবং ‘বায়ো কেমিক্যাল এনজিওপ্লাস্টি (বিসিপি)’।
প্রতি বছর ৭-১২ হাজার হার্টের রোগী তাদের সেন্টার থেকে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম ও সিলেটেও তাদের শাখা রয়েছে। প্রতি শনিবার তারা একটা করে সাপ্তাহিক ফ্রি সেমিনারের আয়োজন করে থাকেন। এসব সেমিনারে প্রচুর মানুষ উপস্থিত থাকেন। কেবল হার্টের রোগীরাই নয় অনেক সুস্থ মানুষও তাদের সেমিনারে অংশ নেন। সাওল বিনা তেলে রান্নার আয়োজন করে এবং বিনা তেলে রান্নার প্রশিক্ষণও দেয়। যেকোনো ধরনের তেল হৃদরোগের জন্য ক্ষতিকর সেখানে এ বিষয়ে সচেতন করা হয়। তেল ছাড়া রান্না করলেও যে খাবারের টেস্টের পরিবর্তন হয় না এ বিষয়ে তারা মানুষকে সচেতন করার কাজ করছে সাওল। দিনে দিনে সাওল চিকিৎসায় মানুষের আস্থা বাড়ছে।
সাওল হার্ট সেন্টারের কার্ডিওলজিস্ট ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. ফাহান আহমেদ ইমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের চিকিৎসা পদ্ধতিতে শতকরা ৯২-৯৫ রোগীকে সুস্থ রাখা সম্ভব। আমার কাছে যেসব রোগী তাদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, একাধিকবার রিং পরানো হয়ে গেছে কারও ক্ষেত্রে বাইপাস হয়ে গেছে দু'বারের বেশী। এই রোগীদের প্রচলিত চিকিৎসায় বাইপাস করা সম্ভব নয় নতুন করে রিং পড়ানোও সম্ভব নয়। তাই তারা আমাদের শরণাপন্ন হন এবং আমাদের পরামর্শ নিয়ে সুস্থ হয়ে জীবনযাপন করেন।
২০০৯ সালে বিশিষ্ট কবি মোহন রায়হানের হাত ধরে সাওল হার্ট সেন্টারের যাত্রা শুরু হয়। মোহন রায়হান সাওল সেন্টার উদ্বোধন করাতে ভারত থেকে উড়িয়ে নিয়ে আসেন ডা. বিমল ছাজেড়কে। কবি মোহন নিজেই হার্টের রোগী। কলকাতায় পরীক্ষা করানোর পর তার হার্টে ব্লক ধরা পড়ে। এ বিষয়ে মোহন রায়হান বলেন, কলকাতায় আমার হৃদযন্ত্রে ব্লক থাকার আশঙ্কা জানিয়ে চিকিৎসকরা অপারেশন করাতে বলেন। মন খারাপ করে বের হয়ে আসার সময় হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বইয়ের দোকানে চোখে পড়ে একটি বই, চিকিৎসক বিমল ছাজেড়ের লেখা ‘হৃদরোগ মুক্তি- ৫টি সহজ পদক্ষেপ’। বইটি পড়ে আমার আগ্রহ জাগে, দেখা করি ডা. বিমলের সঙ্গে। তার পরামর্শ মাফিক চলে তিন মাসেই অনেকটা সুস্থ বোধ করি। আর তারপরেই সাওল পদ্ধতিকে বাংলাদেশে নিয়ে আসার পরিকল্পনা শুরু করি।
তিনি বলেন, সাওল চিকিৎসা পদ্ধতি বাংলাদেশে চালু ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। আমরা সেই চ্যালেঞ্জে বিজয়ী হয়েছি। আমরা বিনা তেলে খাবারের ‘অয়েল ফ্রি কিচেন’ ও ক্যাফে প্রতিষ্ঠা করে স্বাস্থ্যসম্মত ও সুস্বাদু খাবারের হোমডেলিভারী এবং ক্যাটারিংয়ের ব্যবস্থা করেছি। মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে সুস্থ রাখার সামাজিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। এই মানবিক আন্দোলনে আপনারা সবাই এগিয়ে আসুন।
সাবেক স্বাস্থ্য সচিব ও গল্পকার হোসেন আবদুল মান্নান একটি গণমাধ্যমে সাওল চিকিৎসা পদ্ধতির পক্ষে কলাম লিখে সমর্থন জানান। তিনি লিখেন, সাওলের নেতৃত্বে রয়েছেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাহসী মানুষের প্রতিকৃতি ও বরেণ্য কবি মোহন রায়হান। তিনি দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় নিজেকে শতভাগ নিয়োজিত করেন। এটা ইতোমধ্যে ঢাকার নাগরিক স্বাস্থ্যসেবার এক বিকল্প পরামর্শ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দিন দিন মানুষের আস্থা ও আশাভরসার ঠিকানায় রূপান্তরিত হচ্ছে।
অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব এম এ হাকিম মজুমদার সাওলের চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ রয়েছেন। তিনি বলেন, ২০২২ সালে সাওলের পক্ষ থেকে মানুষকে সচেতন করতে পাবনা যাই। সেখানে আমি অসুস্থতা বোধ করলে পরীক্ষার পর আমার হার্টে ৩টা ব্লক ধরা পড়ে। চিকিৎসকরা আমাকে বাইপাস সার্জারির জন্য পরামর্শ দেন। একটি বেসরকারি হাসপাতালে পরিবারের চাপে সার্জারি করাই। কিন্তু সার্জারির পরও আমি পুরোপুরি সুস্থ হইনি। আমার হার্টের জটিলতা বাড়তে থাকে। এরপর আমি সাওলের চিকিৎসা শুরু করি এবং এখন পর্যন্ত সুস্থ আছি।
