দুর্নীতির বৃক্ষ উপড়াবে কে?

আপডেট : ২৮ মে ২০২৪, ১২:৩২ এএম

ষড়রিপুর মধ্যে যে রিপুটি মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকে তার নাম ‘লোভ’। মানুষের এই শত্রু সৃষ্টির আদিকাল থেকেই। যে কারণে তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। অনেকেই পারেন না। যেহেতু অতিরিক্ত অর্থ বা ক্ষমতা লোভের কারণেই যুদ্ধ, হত্যা বা কোনো অপরাধ সংঘটিত হয় ফলে কঠোর আইনের মাধ্যমে করা হয় নিষ্ক্রিয়। জাতীয় বা আন্তর্জাতিক, যে পর্যায়েই হোক না কেন অযাচিত লোভকে দমন করার জন্য অনেক আইন রয়েছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ যদি সুষ্ঠু না হয়, তখনই  দেখা দেয় বিপত্তি। অবধারিতভাবে সেই সমাজ এবং দেশ পরিচিতি পায় লোভাতুর এবং দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে। বিশ্বের কাছে আমরা এই খেতাবে চিহ্নিত হয়েছি, অনেক আগেই। তারপরও কোনো ভাবান্তর নেই। যদিও বলা হয়, দুর্নীতির বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ তবু কোনো এক রহস্যজনক কারণে তা বেড়েই চলেছে।  

প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন ‘যারা ক্ষমতাবান, তারাই দুর্নীতি করে। এ ছাড়া সবাই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত।’ তিনি আরও বলেছিলেন ‘আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। দুর্নীতিতে সবাই নিমজ্জিত। যদি নিমজ্জিত না থাকত তাহলে দুর্নীতি হতো না। যাদের ক্ষমতা আছে, তারাই দুর্নীতি করে। যদি এতে সবাই অংশ না নেয়, তাহলে দুর্নীতি হয় কীভাবে? পরোক্ষভাবে আমরা সবাই দুর্নীতিতে সম্পৃক্ত।’ তখন জনমনে প্রশ্ন উঠেছিল, দুর্নীতি নামের বিষবৃক্ষটির অস্তিত্ব ও ব্যাপকতার কথা জানা সত্ত্বেও সরকার কেন তা নির্মূলের ব্যাপারে উদ্যোগী হচ্ছে না? দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠীর বদনাম কেন দেশের সৎ, ভালো ও নিরীহ রাজনীতিক, আমলা, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, কৃষক-শ্রমিককে বইতে হবে? বহুমাত্রিক দুর্নীতির রাহুগ্রাসে যেমন জনজীবন বিষিয়ে উঠেছে, দুর্নীতিকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করেন এমন লোকের সংখ্যাও সমাজে কম নয়।

একসময় সমাজের অনেক বড় বড় মাথাওয়ালা মানুষকে দুদক অফিসে ডেকে আনা হয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছিল। এদের মধ্যে প্রধানত ছিলেন ব্যবসায়ী,  চোরাকারবারি, রাজনীতিবিদ এবং সাবেক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। তারপর কী হলো? সেই চিরাচরিত নীরবতা। দুদক তখন রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে কার্যকর এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে পারেনি। বাংলাদেশের দুর্নীতির চিত্র এতটাই বৃহৎ যে, একে ছোটখাটো ক্যানভাসে আঁকা সম্ভব নয়। ২ বছর আগে টিআইবি দুর্নীতির জাতীয় খানা জরিপে বলেছিল দেশের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এছাড়া শীর্ষ তিনে থাকা অপর দুটি সংস্থা হলো পাসপোর্ট ও বিআরটিএ। এই অভিযোগের কোনো যাচাই হয়নি। দিন দিন এই রাহুর গ্রাস বিস্তার লাভ করেছে। দুর্নীতি এবং অপরাধের মাত্রা এতটাই প্রকট যে ক্ষমতাসীন সরকারের একজন সাংসদকে দেশের বাইরে হত্যা করে লাশ টুকরো টুকরো করা হয়েছে। কেন হলো, এমন নৃশংসতা? নিহত সংসদ সদস্য সম্পর্কে যে তথ্য জানা যাচ্ছে তা রীতিমতো চমকে ওঠার মতো। ‘ক্ষমতাবানদের দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশের আহ্বান’ শিরোনামে সোমবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। টিআইবির বিবৃতিতে বলা হয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ঘিরে ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্যের হত্যাকাণ্ড, সাবেক সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞা এবং অবসরে যাওয়া র‌্যাব ও পুলিশপ্রধানের ব্যাংক হিসাব, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জব্দের জন্য আদালত নির্দেশনা দিয়েছে। এতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের শূন্য সহনশীলতার ঘোষণার যথার্থতা প্রমাণের বাধ্যবাধকতা অভূতপূর্ব গুরুত্ব লাভ করেছে। বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সরকার ও ক্ষমতাসীন দল শুধু বিব্রতবোধ থেকে বিভিন্নভাবে দায়সারাভাবে ব্যাখ্যা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা যেমন জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না, তেমনি সরকারের জন্যও আত্মঘাতী হবে। ব্যাপক আলোচিত তিনটি ঘটনাই কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। বরং উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের বহিঃপ্রকাশ, যা হিমশৈলের চূড়ামাত্র।’

দায়ী ব্যক্তিদের যদি আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত না হয়, তাহলে অপরাধ দমন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না নেওয়া সরকারের বিষয়। আমরা শুধু বলতেই পারি। ভুলে গেলে অন্যায় হবে বর্তমানই অতীত এবং ভবিষ্যৎ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত