দৈনিক অবৈধ আয় ৩৬ লাখ!

আপডেট : ২৮ মে ২০২৪, ০২:৩৩ এএম

একটি দলিলের হুবহু অনুলিপি (নকল কপি) তুলতে সরকারি ফি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। কিন্তু চট্টগ্রাম রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সদর রেকর্ড রুমে এজন্য আদায় করা হচ্ছে ৩ থেকে সর্বোচ্চ ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। দলিলের নকল তুলতে এই বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ সেবাগ্রহীতাদের। চট্টগ্রাম রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সদর রেকর্ড রুমের সাব-রেজিস্ট্রার মোজ্জাম্মেল হক, রেকর্ডকিপার অঞ্জনা সেন এবং কয়েকজন নকলনবিশ ও উমেদাররা মিলে সরকারি এই দপ্তরটিকে যেন ঘুষ-দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে দলিলের নকল (সার্টিফায়েড কপি) ওঠানো এবং রেকর্ড তল্লাশির নামে ঘুষগ্রহণসহ বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ সেবাগ্রহীতাদের।

জানা গেছে, রেকর্ড কিপার অঞ্জনা সেন ও তার কয়েকজন সহযোগীর বিরুদ্ধে দলিল জালিয়াতি, নকল প্রদানে অতিরিক্ত টাকা আদায়, সূচি ও বালাম বইয়ে নাম পরিবর্তনসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ঢাকা কার্যালয়ের একটি দল। বালাম বইয়ে নাম পরিবর্তনের অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গত রবিবার অঞ্জনা সেনকে তলব করা হয় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে। রেকর্ড কিপার অঞ্জনা সেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান চলছে বলে গতকাল সোমবার বিকেলে দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন দুদকপ্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম।

তবে দলিলের নকল সরবরাহ এবং রেকর্ড তল্লাশি করতে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন সদর রেকর্ড রুমের সাব-রেজিস্ট্রার মোজ্জাম্মেল হক। তিনি গত রবিবার তার কার্যালয়ে বসে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘বালাম বইয়ে নাম পরিবর্তনসহ অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধান করতে রেকর্ড কিপার অঞ্জনা সেনকে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে তলব করা হয়েছে। আটটি বালাম বই নিয়ে তিনি দুদক প্রধান কার্যালয়ে গেছেন।’

অবশ্য সদর রেকর্ড রুমের শীর্ষ এই কর্মকর্তা একটি দলিলের হুবহু নকল পেতে ৩ থেকে ৮ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘দলিলের নকল সরবরাহে কোনো কোনো নকলনবিশ অতিরিক্ত টাকা আদায় হয়তো করতে পারেন। তবে কেউ তো অভিযোগ নিয়ে আমাদের কাছে আসেন না।’

দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রাম রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সদর রেকর্ড রুম থেকে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ দলিলের নকল সরবরাহ করা হয়। এ হিসাবে প্রতিটি নকলে ৩ হাজার টাকা হারে আদায় ধরলেও প্রতিদিন দুর্নীতি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবৈধ আয় হচ্ছে ৩৬ লাখ টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্ট্যাম্প শিডিউলের দফা ২৩ অনুসারে মূল দলিলে স্ট্যাম্প শুল্কের পরিমাণ ১০০০ টাকা বা এর কম হলে ১০০, অন্যান্য ক্ষেত্রে ২০০ (দফাঃ ২৩), জি (এ) ফি ৩০০ শব্দের প্রতি পাতা ২৪, জিজি ফি ৩০০ শব্দের প্রতি পাতা ৩৬ এবং কোর্ট ফি ২০ টাকা।

ভুক্তভোগী হাবিবুর রহমান নামে এক ব্যক্তি জানান, হাটহাজারী ও ফতেয়াবাদ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ১৯৯০ থেকে ১৯৯২ সালে নিবন্ধিত ফটিকা মৌজার চারটি দলিলের নকল পেতে গত রবিবার সদর রেকর্ড রুমের নকলনবিশ সমীর দাশের কাছে যান। এক সপ্তাহের মধ্যে ওই চারটি দলিলের নকল সরবরাহ করার শর্তে তার কাছে ১৪ হাজার টাকা দাবি করেন সমীর দাশ। শেষমেশ সাড়ে ১১ হাজার টাকায় রফা করে অগ্রিম সমীরকে পাঁচ হাজার টাকা পরিশোধ করেন হাবিবুর রহমান।

অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সমীর দাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে অনেক খরচ দিতে হয়। আমি প্রতি দলিলে পাব মাত্র ২০০ টাকা হারে।’

জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রারের নিয়ন্ত্রণাধীন একজন সাব-রেজিস্ট্রার, রেকর্ড কিপার, সহকারী রেকর্ড কিপার ও দুজন পিয়ন নিয়ে প্রশাসনিক কাঠামোয় গঠিত রেকর্ড রুম। বর্তমানে সদর রেকর্ড রুমে ১৮৪ নকলনবিশ আছেন বলে জানিয়েছেন সাব-রেজিস্ট্রার মোজাম্মেল হক। অভিযোগ আছে, সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী তিন বছর পরপর বদলির নিয়ম থাকলেও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন ধরে রেকর্ড কিপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অঞ্জনা সেন। অন্যদের বদলি হলেও বদলি হয় না তার।

সাইফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি রেকর্ড কিপার অঞ্জনা সেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে মহাপরিদর্শক (নিবন্ধন) বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন। এতে ১৯৫২ সালের সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ৫০৬৪ নম্বর জাল দলিল রেকর্ড কিপার অঞ্জনা সেনের নিজ হাতে তৈরি করা বলে দাবি করেন সাইফুল।

দুদকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, তিন বছর আগে অঞ্জনা সেন রেকর্ড কিপার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর রেকর্ড রুমে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়। কিন্তু তার কক্ষে কৌশলে লাগানো হয়নি সিসি ক্যামেরা। রেকর্ড রুমের সহকারী রেকর্ড কিপার ও কয়েকজন নকলনবিশদের নিয়ে সিন্ডিকেট করে বালাম বইয়ে দাগ পরিবর্তন, ঘষামাজা এবং বালাম ও সূচি বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ফেলার মতো অপরাধ করেছেন এই অঞ্জনা সেন। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অঞ্জনা সেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত