নরসিংদীতে আ.লীগ নেতাকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা

আপডেট : ৩০ মে ২০২৪, ০৬:৩২ এএম

নরসিংদীতে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী সুমন মিয়া হত্যাকান্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবুল হাসানকে গুলি করে এবং কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। 

গত মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে নরসিংদী সদর উপজেলার ভগীরথপুর এলাকায় মেসার্স মা-বাবা টেক্সটাইলের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দুজনকে ঢাকায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে ছয়জনকে আটক করেছে।

নিহত মাহবুবুল হাসান (৪০) নরসিংদী সদর উপজেলার মাধবদী থানাধীন ভগীরথপুর গ্রামের মৃত ইমাম উদ্দিনের ছেলে। আহতরা হলেন ভগীরথপুর গ্রামের আবদুল মালেকের ছেলে সাঈদ হাসান পাপ্পু (৩৮) ও ফরহাদ। তাদের গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রতিদিনের মতো মঙ্গলবার রাত ১২টায় নরসিংদী সদর উপজেলার ভগীরথপুর চেয়ারম্যান মার্কেটের নিজ অফিস থেকে ৮ থেকে ১০ জনকে সঙ্গে নিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন মেহেরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হাসান। তারা ভগীরথপুরের মেসার্স মা-বাবা টেক্সটাইলের সামনে পৌঁছালে আগে থেকে ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা ককটেল ছোড়ে। এ সময় মাহবুবুল হাসানের সঙ্গে থাকা সমর্থকরা দিগি¦দিক ছুটতে থাকে। এরই সুযোগে হামলাকারীরা সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হাসানকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে মাহবুবসহ তিনজন আহত হন। তাদের মধ্যে মাহবুব মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তাকে সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। পরে স্থানীয় লোকজন আহত মাহবুবুল হাসানকে উদ্ধার করে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গুলিবিদ্ধ ফরহাদ ও সাঈদ হাসান পাপ্পুকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। মাহবুবুল হাসান ইউনিয়ন ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি ২০১৬ সালে সর্বকনিষ্ঠ জনপ্রতিনিধি হিসেবে মেহেরপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। কিন্তু গত ইউপি নির্বাচনে মেহেরপাড়া ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আজহার অমিত প্রান্তের কাছে দলীয় মনোনয়ন হারিয়ে চেয়ারম্যান পদ থেকে ছিটকে পড়েন। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করতে ভূমিকা রাখেন।

নূরালাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, ‘এই হত্যাকান্ড রাজনীতির জন্য অশনিসংকেত। রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের বিচার না হওয়ায় এই হত্যাকান্ড সংঘটিত হচ্ছে। মাহবুবুল হাসানের জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়েই তাকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা অবিলম্বে এই হত্যাকান্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি।’

মাহবুবুল হাসানের ছোট ভাই হাফিজুল হাসান বলেন, ‘আমার ভাইয়ের জনপ্রিয়তার কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তারা ভয় পেয়েছে মাহবুবুল হাসান বেঁচে থাকলে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারবে না। তারা বহুবার ভাইকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে। তারা ভাইয়ের জন্য মাদক কারবারি, চাঁদাবাজি করতে পারে না। এজন্য তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো। আমরা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে ভাই হত্যার বিচার চাই।’

নরসিংদী সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. আসাদ আবদুল্লাহ খান বলেন, ‘মাহবুবুল হাসানকে আমাদের এখানে মৃত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়। তার ঘাড়ে, পিঠে ও চোয়ালে ধারালো অস্ত্রের কাটা দাগ রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। তবে তাকে গুলি করা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এমন কোনো চিহ্ন আমরা দেখতে পাইনি। তবে ময়নাতদন্তের পরেই এ বিষয়ে নিশ্চিত করে বলা যাবে।’

গতকাল বুধবার দুপুর ১টায় নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে মাহবুবুল হাসানের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। পরে মরদেহ তার নিজ বাড়িতে নিয়ে এলে তাকে একনজর দেখার জন্য হাজার হাজার নারী-পুরুষ ভিড় জমায়। বেলা ৩টায় স্থানীয় খালপাড় শাহি ঈদগাহ মাঠে জানাজা হয়। এ সময় নরসিংদী সদর আসনের সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হিরু (বীরপ্রতীক), পলাশ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলীপ, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জিএম তালেব, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মনির হোসেন ভূঁইয়া, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনসহ জেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী, গ্রামবাসী অংশগ্রহণ করেন।

এ সময় ঈদগাহ মাঠে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। মানুষজন রাস্তায় এসে জানাজা পড়ে। তাকে স্থানীয় খালপাড় শাহি ঈদগাহ কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, নিহত সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবের সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে বর্তমান চেয়ারম্যান আজাহার অমিত প্রান্তের বিরোধ চলে আসছিল। প্রান্তের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী সন্ত্রাসী আতাউর, নূর মোহাম্মদ ও রাসেলের। আতাউরের নেতৃত্বেই ১০ থেকে ১২ জনের একদল সন্ত্রাসী চেয়ারম্যান মাহবুবকে হত্যা করে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

ঘটনার পর পুলিশ রাসেলের বাবা, তিন ভাই ও দুই টেক্সটাইল শ্রমিককে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তবে এতে সন্তুষ্ট নন নিহতের স্বজনরা। তারা ঘটনার নেতৃত্ব দেওয়া সন্ত্রাসী ও নেপথ্যের ষড়যন্ত্রকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।

ময়নাতদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিহতের শরীরে চারটি গুলির চিহ্ন ছিল। এর মধ্যে একটি গুলি মাথায়, দুটি গুলি কোমরে ও একটি গুলি বাম পায়ে লেগেছে। দুটি গুলি তার শরীর থেকে বের করেছেন চিকিৎসকরা।

মাধবদী থানার ওসি কামরুজ্জামান বলেন, এ ঘটনায় সন্দেহভাজন ছয়জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে পুলিশ। এ ঘটনায় এখনো মামলা করা হয়নি।

গত ২২ মে নরসিংদীর রায়পুরায় নির্বাচনী প্রচারে যাওয়ার সময় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী সুমন মিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত