ধাক্কা দিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ৭০ লাখ টাকা ছিনতাই!

আপডেট : ৩০ মে ২০২৪, ০৬:৩৬ এএম

সোনার দোকানের কর্মচারী মহিউদ্দিনের কাঁধে নীল রঙের স্কুলব্যাগ। একা পথ চলছেন। গন্তব্য পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার। হাঁটা শুরু করেছেন কদমতলী খেজুরের গলি থেকে। বিকেল গড়িয়ে তখনো সন্ধ্যা নামেনি। ঘড়ির কাঁটায় ৪টা ৫০ মিনিটের মতো হবে। দিনেদুপুরে চলার পথে তার গায়ে অপরিচিত একজনের ধাক্কা লাগে। ঘটনাস্থল ইসলামপুরের নবনারায়ণ লেনের প্রবেশমুখ। ধাক্কা দিয়ে উল্টো তাৎক্ষণিক মহিউদ্দিনকেই ধাক্কা দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করে অজ্ঞাতপরিচয় ওই ব্যক্তি। মুখ বুজে বিষয়টি হজম করে এগোতে চাইলেন মহিউদ্দিন। তর্কে বা দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে সরি বলে আবার শুরু করেন হাঁটা। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে আশপাশ থেকে ৭-৮ জন এসে তাকে ঘিরে ধরে। তারাও একইভাবে সেই ধাক্কার জন্য মহিউদ্দিনকে অভিযুক্ত করে। চলে বাহাস। হঠাৎ এই আগন্তুকরা মহিউদ্দিনকে কিলঘুসি দিতে থাকে। এর ফাঁকে তাদের কেউ একজন মহিউদ্দিনের চোখে গুল লাগিয়ে দেয়। এরপরই মহিউদ্দিনের কাঁধে থাকা স্কুলব্যাগটি টেনেহিঁচড়ে নিয়ে পালিয়ে যায় তারা। যেই স্কুলব্যাগে ছিল ৭০ লাখ টাকা।

গত ২৬ এপ্রিল ওই টাকা আনা হচ্ছিল কদমতলী খেজুরের গলির মসলা এন্টারপ্রাইজ থেকে। মা বুলিয়ান অ্যান্ড সিলভার জুয়েলার্সের ম্যানেজারের নির্দেশে টাকা আনতে যান কর্মচারী মহিউদ্দিন। কিন্তু সেই টাকা কৌশলে ছিনিয়ে নেয় ‘ধাক্কা পার্টি’ নামে পরিচিত একটি চক্রের সদস্যরা। এ ঘটনায় পরদিন ২৭ এপ্রিল জুয়েলার্স মালিক আকিদুল ইসলাম ডাকাতির মামলা করেন। এর সূত্র ধরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ছায়া তদন্ত শুরু করে। থানা-পুলিশ ও ডিবির তদন্তে এই ডাকাতির হোতাসহ জড়িতদের শনাক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে তিনজনকে চট্টগ্রাম ও খুলনা থেকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। গ্রেপ্তাররা হলেন চক্রটির হোতা খোকন দাস ওরফে বাইল্যা খোকন, চক্রের অপারেশনাল কমান্ডার রেজাউল করিম ও দলের আরেক সদস্য কামাল হোসেন। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা উদ্ধার করেছে ডিবির দল।

গতকাল বুধবার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন ডিবি লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান। তিনি বলেন, ‘এই চক্রটির টার্গেটে থাকেন ব্যবসায়ীরা। তারা ডাকাতির জন্য বিশেষ করে ছুটির দিনগুলো বেছে নেয়। ব্যবসায়ীরা নগদ টাকা বহন করে একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাওয়ার পথে ধাক্কা দিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে চক্রের কোনো এক সদস্য। তখন আশপাশে অবস্থান করা তাদের আরও লোকজন এসে ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রচণ্ড মারধর করে টাকা ভর্তি ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়।’

ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘পুরান ঢাকার ফল, স্বর্ণ ও কাপড় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পাইকারি এবং খুচরা ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন লাখ-লাখ টাকার লেনদেন করেন খুবই ক্যাজুয়ালি এবং ইনফরমালি। মোটা অঙ্কের টাকা বহনের ক্ষেত্রে স্থানীয় পুলিশের সহযোগিতা নেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও কাছাকাছি জায়গায় টাকা স্থানান্তর করা হয় বলে তারা পুলিশকে অবগত করেন না বা সহযোগিতা নেন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুরান ঢাকার এই এলাকাগুলোয় প্রতিদিন শতকোটি টাকার বৈধ লেনদেনের পাশাপাশি অনেকেই হুন্ডির টাকা লেনদেন করে থাকেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ডাকাত/ছিনতাইকারীরা কৌশলে অবস্থান নিয়ে থাকে হুন্ডি কারবারিদের টাকা ডাকাতি করার জন্য। হুন্ডির টাকা লেনদেন করা আইনস্বীকৃত না। সে কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা অধিকাংশ সময় বিষয়টি পুলিশ বা আদালতকে অবগত করেন না। হুন্ডি কারবারিদের এই দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ডাকাত বা ছিনতাইকারীরা অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। ডাকাতদের এই অপতৎপরতায় কখনো কখনো বৈধ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির সম্মুখীন হন।’

ডিবি কর্মকর্তারা জানান, মা বুলিয়ান অ্যান্ড সিলভার জুয়েলার্সের কর্মচারী মহিউদ্দিনের কাছ থেকে ৭০ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনার হোতা খোকন দাস ওরফে বাইল্যা খোকন পুরান ঢাকায় বসবাস করেন। দীর্ঘদিন এই এলাকায় থাকার কারণে কোন ব্যবসায়ী কীভাবে টাকা লেনদেন করেন, সেই সম্পর্কে তার ভালো ধারণা রয়েছে। চক্রের অপারেশনাল কমান্ডার রেজাউল করিম একসময় পুরান ঢাকায়ই ব্যবসা করতেন। আরেকজন কামাল হোসেনের ব্যাপারে খুব বেশি জানা যায়নি। এই তিনজনের বিরুদ্ধে ডাকাতি এবং ছিনতাইয়ের একাধিক মামলা রয়েছে। তারা খুলনা, বরিশাল, চাঁদপুর, মিরপুর ও ময়মনসিংহ থেকে সমমনা ডাকাতদের ঢাকায় এনে টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে মারধর করে চোখে গুল লাগিয়ে ডাকাতি করে। ডাকাতির কাজে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করার জন্য বাটন ফোনে নিবন্ধনহীন সিম লাগিয়ে যোগাযোগ করে থাকে। ঘটনার পর ফোন এবং সিম ভেঙে নদীতে ফেলে দিয়ে বিভিন্ন জেলায় পালিয়ে যায়। এ ব্যাপারে ডিবি কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, ‘তারা ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার টার্গেট করে বের হয়। সাধারণত দিনেদুপুরে যে সময় লোকজনের আনাগোনা কম থাকে, সে সময় ডাকাতি করে। মূলহোতা হিসেবে কাজ করে বাইল্যা খোকন। আরেকটি গ্রুপ বিভিন্ন জায়গা থেকে ডাকাতদের ভাড়া করে ঢাকায় নিয়ে আসে। তাদের একটি গ্রুপে ৫ থেকে ৬ জনের সদস্য রয়েছে। এ পর্যন্ত এই চক্রের ১৫ জনের বেশি সদস্যের খোঁজ পেয়েছে। বাইল্যা খোকনের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা উদ্ধার করতে পেরেছি। বাকিদের কাছে ২-৩ লাখ টাকার খোঁজ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় বাইল্যা খোকনই তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে এবং মূল টাকাটাও পেয়েছে। তারা নানাভাবে ব্যবসায়ীদের অনুসরণ করে। ব্যবসায়ীদের উচিত বেশি টাকা বহন করার সময় পুলিশকে জানানো। কিন্তু অনেকে পুলিশের দ্বারস্থ হন না। থানায় অবগত করলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয় না।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে যারা ছিনতাই, ডাকাতি ও চুরি করে, তারা একাধিকবার করে। যারা মাদক কারবারে জড়িত, তারাও একাধিকবার করে। হাজতবাস করে একটা সময় বের হয়ে আসে। কিন্তু তারা সংশোধন হয় না। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে তাদের পুনর্বাসন হয় না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত