ভৌগোলিক সুবিধা, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি, পর্যটন সম্ভাবনা, বিদেশি বিনিয়োগ, বিশাল জনসংখ্যা ও সারাবিশ্বে কর্মরত প্রবাসী সংখ্যা ইত্যাদি মিলিয়ে এ অঞ্চলের এভিয়েশন হাব হওয়ার সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। আর এই সুযোগটা নেওয়ার চেষ্টা সরকারেরও আছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের মন্ত্রীসহ পদস্থ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে পরিস্কার। এভিয়েশন খাতের জন্য গৃহীত প্রকল্পসমূহ সে বার্তাই দেয়।
এখন কথা হলো, এভিয়েশন হাব হতে যেসব প্রয়োজনীয় উপাদান আমাদের থাকা দরকার তা কতটা নিশ্চিত করা গেছে? আধুনিক বিমানবন্দর, শক্তিশালী আকাশ নজরদারি ব্যবস্থা, দক্ষ জনশক্তি, শ্রমবাজার, বিদেশি বিনিয়োগ, পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও সমৃদ্ধ এয়ারলাইনস কোম্পানি ইত্যাদি এভিয়েশন হাবের জন্য অপরিহার্য। উল্লেখিত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম এয়ারলাইনস খাত দিয়ে শুরু করা যাক। আর সেক্ষেত্রে সবেধন নীলমণি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। যে সংস্থার নাম ভালোর চেয়েও নেতিবাচক কারণে বেশি আলোচিত হয়।
গত ১৪ মে একটি জাতীয় দৈনিকে ‘বিমানের লাভ নিয়ে প্রশ্ন’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন তারই প্রমাণ, যা এভিয়েশন হাবের স্বপ্নে ধাক্কা না হোক, টোকা তো অবশ্যই! বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে তাদের ২৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা লাভ হয়েছে। আর্থিক বিবরণীতে বড় বড় দায়-দেনা অপ্রকাশিত ছিল। তাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি আসলেই লাভে আছে, নাকি কৌশলে লাভ দেখাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কেননা এয়ারলাইনস-বহির্ভূত বিমানের সাবসিডিয়ারি কোম্পানির (নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান) ব্যবসায় যে লাভ হচ্ছে, সেটাই বিমানকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখাতে সহায়তা করলেও মূল ব্যবসায় (এয়ারলাইনসে) প্রকৃত ক্ষতি হয়েছে ২৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা, যা প্রতিষ্ঠার ৫২ বছর পাড়ি দেওয়া সংস্থার কাছে অপ্রত্যাশিত।
প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার একটি দেশ, যার আছে এভিয়েশন ও পর্যটন শিল্প বিকাশের হাতছানি; যে দেশের অর্ধকোটির বেশি মানুষ প্রবাসী, আর ৫০ হাজার বিদেশি দেশে কর্মরত, সে দেশের উড়োজাহাজ কোম্পানির আকাশ পরিবহন ব্যবসার এমন নাজুক অবস্থা কেন? বিমানকে এয়ারলাইনস ব্যবসা থেকেও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, ক্যাটারিং সার্ভিস ও পোলট্রি ব্যবসার আয়ের ওপর নির্ভর করতে হবে কেন? একটি বিশ্বমানের ও লাভজনক এয়ারলাইনস হিসেবে এভিয়েশন দুনিয়ায় পরিচিতি পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করার এ দায় কার?
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের তথ্য বলছে, তাদের বহরে এখন পর্যন্ত ২১টি উড়োজাহাজ রয়েছে, আন্তর্জাতিক রুট সংখ্যা ২৩টি; যা ক্রমবর্ধমান যাত্রী চাহিদার তুলনায় একেবারেই কম। অথচ বহু সূচকে বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে থাকা ইথিওপিয়ার রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের বহরে আছে ১৪৫টি উড়োজাহাজ, যা দিয়ে সারাবিশ্বের ১৫৫ রুটে যাত্রী ও ৬৮ রুটে কার্গো পরিবহন করছে আফ্রিকান দেশটি। গতবছর তাদের আয় ছিল ৬.১ বিলিয়ন ডলার। তাহলে জনসংখ্যা ও অর্থনীতিতে এগিয়ে থেকেও বাংলাদেশ কী করল?
অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, সীমাহীন দুর্নীতি, যাত্রী দুর্ভোগ, টিকেট কালোবাজারি, হাজার কোটি টাকার দেনা, এই হলো বিমানের নিত্যকার ঘটনা। যদিও সংস্থাকে ঢেলে সাজানোর অংশ হিসেবে ২০৩৪ সালের মধ্যে আরও ২৬টি উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা করছে সরকার। তখন উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়াবে ৪৭; যা ওই সময়ের জনসংখ্যা, পর্যটন ও শ্রমবাজার বিকশিত হয়ে যে পরিমাণ যাত্রী বাড়বে তার তুলনায় অপ্রতুল।
এয়ারবাসের জরিপ বলছে, বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশে যাত্রী প্রবৃদ্ধি ৫০ শতাংশ বেশি। এই প্রবৃদ্ধি সামাল দিতে ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশের ১৬০টি উড়োজাহাজের প্রয়োজন হবে।
গত অক্টোবরে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল (আংশিক) উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহনের হাব হবে। সাম্প্রতিককালে যুক্তরাজ্য, এয়ারবাস ও আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইকাও) বাংলাদেশকে এভিয়েশন হাব হতে সবরকম সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে, যা সরকারের পরিকল্পনায় দৃঢ় ভিত্তি দেবে সন্দেহ নেই।
এভিয়েশন হাব হওয়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার বিমানের অবস্থা জানা গেল। এখন অবকাঠামো, শক্তিশালী আকাশ নজরদারি ব্যবস্থা, দক্ষ জনশক্তি, বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা, শ্রমবাজার ও পর্যটন শিল্পের দিকে আলো ফেলা যাক।
অত্যাধুনিক টার্মিনাল, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা, দেশি-বিদেশি এয়ারলাইনস ও আশপাশের অবকাঠামো উন্নয়ন মিলিয়েই গড়ে উঠে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর। এভিয়েশন হাব হিসেবে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত সিঙ্গাপুর চাঙ্গি বিমানবন্দর ও বাংলাদেশের হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তুলনা করা যাক। স্কাইট্র্যাক্স জরিপে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি এয়ারপোর্ট ২০২৩ সালে পৃথিবীর সেরা বিমানবন্দর নির্বাচিত হয়েছে। আর শাহজালালের র্যাংকিং? থাক সে প্রসঙ্গ।
চাঙ্গি থেকে শতাধিক উড়োজাহাজ কোম্পানি ফ্লাইট পরিচালনা করছে, সেখানে আমাদের প্রধান বিমানবন্দর ৩৫ এয়ারলাইনসে আটকে আছে। গতবছর চাঙ্গি বিমানবন্দরে ৩ লাখ ২৮ হাজার ফ্লাইটে ৫ কোটি ৮৯ লাখ যাত্রী আসা-যাওয়া করেছে। আর শাহজালাল বিমানবন্দরে ৪৮ হাজার ফ্লাইটে ৮৮ লাখ ৪৮ হাজার ৪৭ জন যাত্রী (ডিসেম্বরের ১ম সপ্তাহ পর্যন্ত)। এতে চাঙ্গির আয় ১.৮৮ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার (সিঙ্গাপুরের ১ ডলারে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৬ টাকা) এবং শাহজালালের আয় দুই হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ সব সূচকেই এগিয়ে ৭৩৫ বর্গকিলোমিটারের সিঙ্গাপুর।
আশার কথা হলো, দেশের সিভিল এভিয়েশন খাতে সম্প্রতি অনেক অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলমান। তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বছরে ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। আর ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের আকাশসীমা নজরদারি ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্থাপন করা হয়েছে অত্যাধুনিক রাডার। এতে আকাশ নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত হবে এবং বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী উড়োজাহাজ থেকে ফ্লাইং ওভার চার্জ বাবদ সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। তাছাড়া কক্সবাজার বিমানবন্দরে বঙ্গোপসাগরের বুক বিস্তৃত রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজ চলছে। তবে এসবের পাশাপাশি চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ জরুরি।
এদিকে বাংলাদেশে এক হাজার ৫২৯টি পর্যটন স্পটের অস্তিত্ব থাকলেও এ শিল্পে তেমন অগ্রগতি হয়নি। মুন্ডি ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, পর্যটনশিল্পে বিশ্বের ১৮৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪১তম, আর এশিয়ার ৪৬টি দেশের মধ্যে ৪২তম। অথচ ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপে গতবছর ভ্রমণ করেছে ১৮ লক্ষাধিক পর্যটক, সেখানে বাংলাদেশে এ সংখ্যা মাত্র ৬ লাখ। মালদ্বীপের জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ জোগান আসে পর্যটন খাত থেকে, আর বাংলাদেশে জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান সাকুল্যে ৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ সরকার ২৫ বছর মেয়াদি পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে। আর কক্সবাজার ও সুন্দরবন ঘিরে বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব রয়েছে। এ উদ্যোগগুলোর সফল বাস্তবায়ন আর পর্যটন খাতের জন্য বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে।
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত শ্রমবাজার। বর্তমানে বিদেশে কতসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত তা নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জনশুমারি রিপোর্ট অনুযায়ী অর্ধকোটির বেশি বাংলাদেশি দেশের বাইরে কর্মরত আছে। আর ইউনেস্কোর হিসাবে প্রতি বছর ৫০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী দেশের বাইরে পড়তে যায়। ১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশ হিসেবে শ্রমবাজারে জনশক্তির এ সংখ্যা যথেষ্ট নয়। তাই সরকারের উচিত দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে নতুন শ্রমবাজার খোঁজা। বাজার সম্প্রসারণের ফলে আকাশ পরিবহনের যে চাহিদা সৃষ্টি হবে তার সবরকম প্রস্তুতিও থাকতে হবে।
দক্ষ জনবল ও যাত্রীসেবার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিমানবন্দরগুলোয় যাত্রীদের বিশেষত প্রবাসীদের হয়রানির ইতিহাস দীর্ঘ। পাশাপাশি মালামাল হারিয়ে যাওয়া, ধীরগতির সেবা, দুর্নীতি, অপর্যাপ্ত জনবল ও নিরাপত্তা নিত্য সমস্যা। এই সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে সিভিল এভিয়েশন হাবের স্বপ্নপূরণ কঠিন হবে। এ খাতে পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ করতে হবে। তেমনি তাদের সৎ, দক্ষ ও দ্রুত সেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ইমিগ্রেশন, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, নিরাপত্তা, এটিসি, পরিবহন, বিনোদন ইত্যাদি সেবা যথাযথভাবে প্রদান করা যায়। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ, পর্যটন আকর্ষণে প্রচারণা, জেট ফুয়েল ও ভ্রমণ কর সহনীয় পর্যায়ে রাখলে এভিয়েশন হাব গড়ায় সহায়ক হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার যে পরিকল্পনা সরকার নিয়েছে তা বাস্তবায়ন থেকে এখনো অনেক দূরে আমাদের অবস্থান; যা কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। আবার অসম্ভবও নয়। এক্ষেত্রে সরকারের উচিত উল্লেখিত খাতগুলোর উন্নয়নে অগ্রাধিকারভিত্তির প্রকল্প প্রণয়ন করা, যার জন্য প্রয়োজন যথাযথ উদ্যোগ, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন। বিশেষত বিমান ও এয়ারপোর্ট ব্যবস্থা বিশ্বমানের করতে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করতে হবে। এতে সিভিল এভিয়েশন হাবের স্বপ্নপূরণ হবে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হবে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। তবেই আবু হেনা মোস্তফা কামালের মতো আমরাও দৃপ্ত কণ্ঠে বিশ্ববাসীকে বলতে পারব, আসুন, ছবির মতো এই দেশে বেড়িয়ে যান/রঙের এমন ব্যবহার, বিষয়ের এমন তীব্রতা/আপনি কোনো শিল্পীর কাজে পাবেন না। বস্তুত শিল্প মানেই নকল নয় কি?
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
[email protected]
