ঘূর্ণিঝড় রিমালের আঘাতে খুলনাসহ এ অঞ্চলের সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও নড়াইলের বেড়িবাঁধ, কৃষি, মৎস্য ও সড়কে ১ হাজার ২০০ কোটি ২৩ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নিরূপণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কৃষিতে ১৭৯ কোটি ৭১ লাখ, মৎস্য খাতে ৭২২ কোটি ১৩ লাখ, বেড়িবাঁধে ৫৭ কোটি ও সড়কে ২৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। এতে ক্ষতির শিকার হয়েছে ১২ লাখ মানুষ।
মানুষ ও বাড়িঘর : ঘূর্ণিঝড়ে খুলনা বিভাগের চার জেলায় ১২ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয় ১ লাখ ২০ হাজার ১২৫টি। এর মধ্যে খুলনায় ৭২ ইউনিয়নে ৪ লাখ ৮১ হাজার ৫ জন মানুষের ক্ষতি হয়। বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয় ৮২ হাজার ২৩৪টি। বাগেরহাট জেলায় ৭৫ ইউনিয়নে ৫ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিধ্বস্ত হয় ৩৬ হাজার ঘরবাড়ি। সাতক্ষীরায় ৪৩ ইউনিয়নে ২ লাখ ২১ হাজার ১৭৬ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিধ্বস্ত হয় ১ হাজার ৪৬৮ ঘরবাড়ি। নড়াইল ৩৯ ইউনিয়ন ও ৩টি পৌরসভায় ৩০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৪৫০টি বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়।
খুলনা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আবদুল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নগদ অর্থও প্রদান করা হচ্ছে।
কৃষি : খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইল নিয়ে গঠিত খুলনাঞ্চল অফিস। এ চার জেলায় ৩ হাজার ৭৩৩ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টাকায় ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে ১৭৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৭৩ হাজার ৯২২ কৃষক। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মধ্যে রয়েছে আউশ বীজতলা ও আবাদ, পাট, সবজি, তিল, টমেটো, মুগ, মরিচ, আদা, হলুদ, বাদাম, ভুট্টা, আম, লিচু, তরমুজ, পেঁপে, কলা, পান, আখ ও বোনা আমন ইত্যাদি।
খুলনা অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহন কুমার ঘোষ দেশ রূপান্তরকে জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা প্রদানে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রণোদনা পেলে কৃষকদেও দেওয়া হবে।
মৎস্য : বিভাগের তিনটি জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় ৭২২ কোটি ১৩ লাখ টাকার ক্ষতি নিরূপণ করেছে মৎস্য বিভাগ। এর মধ্যে ৭৭০ হেক্টর জমির ৮ হাজার ১০০টি পুকুর প্লাবিত হয়। ৩২ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমির ৪০ হাজার ৫১৫টি মৎস্য ঘের প্লাবিত হয়। প্লাবিত হয় ২ হাজার ৮২৬ হেক্টর জমির ৪ হাজার ৫৫৬টি কাঁকড়ার ঘেরও।
খুলনা বিভাগীয় মৎস্য অফিসের সহকারী পরিচালক রাজ কুমার বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এসব ঘের মালিকদের পুনর্বাসন দরকার। কিন্তু মৎস্য বিভাগে অবর্তক ফান্ড নেই। তাই এ ধরনের ফান্ড দেওয়া জরুরি।
এ সময় ১৫ হাজার ৫৭৮ টন সাদা মাছে ক্ষতি হয় ২৪৭ কোটি ৫০ লাখ, ৭ হাজার ৬৩০ টন চিংড়ি মাছে ক্ষতি ৩২৩ কোটি ৬৫ লাখ, ১১ কোটি ৭১ লাখ সাদা মাছের পোনায় ক্ষতি ৮৫ কোটি ৫৭ লাখ, ১৭২ টন কাঁকড়ায় ক্ষতি ২০ কোটি ৩৯ লাখ, ৫ কোটি ৮০ লাখ চিংড়ি পোনায় ক্ষতি হয়েছে ১৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এ ছাড়া অবকাঠামোগত ক্ষতি ৩০ লাখ ৬১ লাখ টাকা।
বেঁড়িবাধ : খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও নড়াইল নিয়ে গঠিত পানি উন্নয়ন বোর্ডের খুলনা জোন। এ জোনে ২ হাজার ৪০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৮১ কিলোমিটার। যার ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে ৫৭ কোটি টাকা। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দাকোপ ও কয়রা উপজেলা। দাকোপ উপজেলার কামিনীবাসিয়া ও কয়রা উপজেলার দশহালিয়ায় বাঁধ ভেঙে গ্রাম প্লাবিত হয়। বুধবার প্রথম দফায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ও গ্রামবাসী অস্থায়ী বাঁধ দিয়েও লোনা পানি আটকায়। তবে পরে ফের জোয়ারের পানির তোড়ে বাঁধ ভেঙে যায়। এখন জোয়ারের সময় পানি ওঠানামা করছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের উপপরিচালক এএসএম তৌহীদ আলম ও খুলনা নির্বাহী প্রকৌশলী-২-এর মো. আশরাফুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাঁধের ভাঙন স্থান মেরামত করে লোনা পানি আটকানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে অধিকাংশ বাঁধ মেরামত করা হয়েছে। তবে কামিনীবাসিয়া ও দশহালিয়ায় ভাঙন এখনো আটকানো সম্ভব হয়নি। তবে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সড়ক : স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধীন খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় মোট ৬৫৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। টাকায় ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে ২৫০ কোটি। এর মধ্যে খুলনা জেলায় ৪৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। টাকার অঙ্কে ক্ষতি হয়েছে ৩০ কোটি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় দাকোপ, পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলায়। সাতক্ষীরা জেলায় ২১০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। টাকার অঙ্কে ক্ষতি ৭০ কোটি। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শ্যামনগর উপজেলা। বাগেরহাট জেলায় ৪০০ কিলোমিটার সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। টাকার অঙ্কে ক্ষতি নিরূপণ হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা। এ উপজেলায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মোরেলগঞ্জ, মোংলা, রামপাল ও শরণখোলা উপজেলা।
খুলনা ও সাতক্ষীরা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম আনিসুজ্জামান ও মো. কামরুজ্জামান বলেন, গ্রামের সড়কগুলো সংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও পানি উপচে ভেঙে চলে গেছে সড়ক। সড়ক মেরামতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হচ্ছে।
