পাওনা টাকার জন্য দল বেঁধে ধর্ষণ গৃহবধূর আত্মহত্যা

আপডেট : ০১ জুন ২০২৪, ০২:০৬ এএম

ধারে নেওয়া ২০ হাজার টাকা ফেরত দিতে না পারায় এক গৃহবধূকে দুই মাস ধরে দল বেঁধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। বিচার চেয়ে না পেয়ে ওই গৃহবধূ ও তার স্বামী বিষপান করেন। এতে গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ মে ওই দম্পতি একসঙ্গে বিষপান করেন। পাঁচ দিন ধরে বিষক্রিয়ার সঙ্গে লড়াই শেষে ২৯ মে দুপুরে গৃহবধূর মৃত্যু হয়। কুড়িগ্রামের চর রাজীবপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের কলেজপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ওই দম্পতির তিন বছরের এক শিশুসন্তান রয়েছে।

যাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে তারা হলো উপজেলার সদর ইউনিয়নের জহির ম-লপাড়া গ্রামের জয়নাল আলী এবং তার সহযোগী শুক্কুর আলী ও সোলেমান।

ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করা নারীর স্বামী এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংসারের অভাব-অনটনের কারণে বাড়িঘর মেরামতের জন্য জহির মন্ডলপাড়া গ্রামের জয়নাল আলীর কাছ থেকে কয়েক মাস আগে ৪০ হাজার টাকা ধার নেন আত্মহত্যা করা গৃহবধূ ও তার স্বামী। কিন্তু ধারের টাকা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে না পারায় পাওনাদার টাকা চেয়ে বসে। এ সময় টাকা নেই বলে জানান গৃহবধূ। টাকা না থাকায় গৃহবধূ টাকা পরিশোধের জন্য কিছুদিন সময় চেয়ে নেন। কিন্তু পাওনাদার জয়নাল ফের টাকা চেয়ে বসে। টাকা না দিতে পারায় গৃহবধূকে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়ানোর প্রস্তাব দেয় জয়নাল। পরিবার অভাবগ্রস্ত হওয়ায় সেই প্রস্তাব মেনে নিতে গৃহবধূকে বাধ্য করায় জয়নাল। এরপর গত রমজান মাসে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন গৃহবধূ। সুযোগ বুঝে জয়নাল তার সাথে শুক্কুর আলী নামের আরেকজনকে নিয়ে এসে তার সঙ্গেও গৃহবধূকে শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে বাধ্য করে। নিয়মিত তারা দুজন ধর্ষণ করতে থাকে গৃহবধূকে। এ সময় তাদের পরিচিত সোলেমান নামের আরেকজনকে দিয়ে শারীরিক সম্পর্কের ভিডিও ধারণ করার কথা জানানো হয় ভুক্তভোগী গৃহবধূকে। ফেসবুকে সেই ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে সোলেমানও গৃহবধূর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে ধর্ষণের ফলে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন গৃহবধূ। অন্যদিকে তার স্বামী লোকমুখে ধর্ষণের ঘটনা জানতে পেরে স্ত্রীর কাছে বিষয়টি জানতে চান। ভুক্তভোগী গৃহবধূ তখন স্বামীর কাছে সব খুলে বলেন।

স্বামী তার স্ত্রীর মুখে সবকিছু শুনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে স্ত্রীর সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। পরে স্বামী-স্ত্রী মানুষকে মুখ দেখানোর লজ্জায় ঘরে থাকা ফসলে দেওয়া কীটনাশক ২৪ মে দুপুর ২টার দিকে পান করেন।

পরে তাদের দুজনকেই স্থানীয়রা উদ্ধার করে রাজীবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায় এবং চিকিৎসা পেয়ে স্বামী কিছুটা সুস্থ হলেও স্ত্রীর অবস্থার অবনতি হলে তাকে জামালপুর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে তিন দিন চিকিৎসার পর গৃহবধূর অবস্থার আরও অবনতি হলে সেখান থেকে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। কিন্তু পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে তাকে মময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে না নিয়ে ২৮ মে রাতে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। পরদিন দুপুর ২টার দিকে গৃহবধূ বাড়িতেই মারা যান।

এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হলে দুজনই বিষ খেয়ে আত্মাহত্যার চেষ্টা করে। পরে স্ত্রী মারা যায়। মৃত্যুর আগে ওই নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কি না, বিষয়টি আমার জানা নেই। ফেসবুকে কে কী লিখেছে, আমি জানি না।’

এ বিষয়ে অভিযুক্ত জয়নাল বলেন, ‘আমি কিছুই জানি না, সব মিথ্যা কথা।’ তবে তিনি বিষপান করা দম্পতির কাছে টাকা পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। এ ছাড়া ধর্ষণের ঘটনা অস্বীকার করলেও বিষয়টি ২০ হাজার টাকা দিয়ে মীমাংসা করেছেন বলে জানান।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাজীবপুর সদর ইউনিয়নের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. মিরর বলেন, ‘আমি ঢাকায় রয়েছি। গৃহবধূকে ধর্ষণের বিষয়টি শুনেছি। আমি স্থানীয় ইউপি সদস্যকে খোঁজখবর নিতে বলেছি। যারা অপরাধী তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’

এ বিষয়ে রাজীবপুর থানার ওসি আশিকুর রহমান বলেন, ‘মারা যাওয়া নারীর মামার তথ্যের ভিত্তিতে থানায় অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাইনি আমরা। যেহেতু এই মৃত্যু নিয়ে অনেক কথা আসছে। তাই আমাদের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্তে নেগেটিভ কিছু বেরিয়ে এলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত