ভারত-শাসিত কাশ্মীরে থানায় ঢুকে পুলিশের ৫ সদস্যকে বেধড়ক পেটানোর অভিযোগ উঠেছে সেনা সদস্যদের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি দেশটির জম্মু ও কাশ্মীরের কুপাওয়ারার একটি থানায় এ ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ৩ কর্মকর্তাসহ ১৬ সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে।
সেনাবাহিনীর যে ১৬ সদস্যের নামে মামলা করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা, হত্যাচেষ্টা এবং থানা থেকে পুলিশ সদস্যকে অপহরণের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার (২৮ মে) সকালে কুপাওয়ারার বাটপোড়া গ্রামে এক সৈন্যর বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। মূলত একটি মামলার তদন্ত করতে সেখানে যায় তারা। এরপর ওইদিন রাত ৯টা ৪০ মিনিটে সৈন্যরা ওই থানায় যান এবং পুলিশ সদস্যদের মারধর করেন।
এরপর দ্রুত সময়ের মধ্যে বিষয়টি পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়। তখন তারা সেখানে ছুটে যান। উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আসতে দেখে ‘১৬০ টেরিটোরিয়াল আর্মির’ লেফটেনেন্ট কর্নেল অঙ্কিত সুদ, রাজু চৌহান এবং নিখিল ব্রান্দিশেদ ও অন্যান্য সেনারা পুলিশ সদস্যদের অস্ত্র এবং মোবাইল ফোন কেড়ে নেন। যার মধ্যে কুপাওয়ারা পুলিশের এসএইচও পিএস পরিদর্শক মোহাম্মদ ইশাকও রয়েছেন। থানার এক কর্মচারিকে অপহরণ করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ। পরে অবশ্য ওই কর্মচারীকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
কাশ্মীর উপত্যকায় মোতায়েন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১৬ কোর ওই সংঘর্ষের ব্যাপারে যে এফআইআর দায়ের হয়েছে, সে ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে ওই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হয়ে যাওয়ার পরে সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সংঘর্ষের খবরটি ভিত্তিহীন এবং মিথ্যা।
ভারতীয় সেনাবাহিনী এটাও বলেছে যে সেনাবাহিনী ও পুলিশের মধ্যে কাজের ব্যাপারে কিছু বিরোধ দেখা দিয়েছিল, যা বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে সমাধান করা হয়েছে। তবে এই ধরনের ঘটনা এই প্রথম নয়। গত ৩৫ বছরে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে এবং প্রতিবারই তদন্ত ঘোষণা করা হয় কিন্তু দোষীরা শাস্তি পায় না।
শ্রীনগরের বাসিন্দা আলি মুহম্মদ ওয়াতালি ১৯৮০ সালে জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের সিনিয়র সুপারিন্টেডেন্ট অফ পুলিশ বা এসএসপি ছিলেন। সে বছরের ২৬শে জুলাই শ্রীনগরের লাল চকে তার ওপর লোহার রড় ও বন্দুকের বাট নিয়ে হামলা চালায় সেনা সদস্যরা।
আলি মুহাম্মদ ওয়াতালি বিবিসিকে বলছিলেন, সেনাবাহিনীর একটি গাড়ির সঙ্গে একটি অটোরিকশার সংঘর্ষ হলে সেনাবাহিনীর চালক পালিয়ে যায়। এরপরে অটো-চালকের মুখ বন্ধ রাখতে হট্টগোল শুরু করে সেনা সদস্যরা। খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। রাস্তার মাঝখানে সেনাবাহিনীর একটি ট্রাক দাঁড়িয়ে ছিল, তাতে কোনও চালক ছিল না। আমি পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছিলাম। এরই মধ্যে সাইকেল আরোহী এক শিশুকে নির্দয়ভাবে পেটাতে শুরু করে সেনা সদস্যরা।
“আমি বাধা দিলে সেনা সদস্যরা লোহার রড ও বন্দুক দিয়ে আমার মাথায় ও মুখে আঘাত করে। আমি সেখানে দীর্ঘক্ষণ মৃতপ্রায় অবস্থায় পড়ে ছিলাম,” বলছিলেন আলি মুহাম্মদ ওয়াতালি। তার মুখের হাড় এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে তিনি এখনো চিকিৎসা করাচ্ছেন।
তিনি আরও বলছিলেন, শ্রীনগরের বাণিজ্যিক কেন্দ্র লাল চকে সেদিন যত গাড়ি পার্ক করা ছিল, সবগুলোতে সেনা সদস্যরা ভাঙচুর চালায়, নির্বিচারে গুলি চালায় তারা। দুজন মারা গিয়েছিলেন সেদিন।
ঘটনার তদন্তের ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেখ মুহম্মদ আবদুল্লা। ওই তদন্ত কমিটিতে সেনাবাহিনীর কোর কমান্ডার, হাইকোর্টের বিচারপতি ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছিলেন।
আলি মুহাম্মদ ওয়াতালি বলছিলেন, “পরে সেনাবাহিনী একটি বিবৃতি দিয়ে বলে যে আমি গণপিটুনিতে আহত হয়েছি। বিষয়টি সেখানেই থেমে যায়।“
ভারত শাসিত কাশ্মীরে ১৯৮০ সালে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয় এবং এর পরেই সেনাবাহিনী শ্রীনগরের হজরতবাল এলাকায় এক যুবককে মেরে ফেলে। এরকম দাবি করে যে তারা একজন সশস্ত্র চরমপন্থিকে হত্যা করেছে। কিন্তু রিয়াজ রসুল নামের ওই যুবক আসলে জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশের কনস্টেবল ছিলেন।
ওই মৃত্যুর ফলে জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশে বিদ্রোহ হয়ে যায়। উর্দি-ধারী পুলিশ অফিসাররা তাদের অস্ত্র শূন্যে তুলে ধরে শ্রীনগরে একটি মিছিল বের করেছিলেন। পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে ওই মিছিলটির ওপরে নজর রাখা হচ্ছিল।
বেশ কয়েকদিন ধরে উত্তেজনা চলতে থাকে এবং অবশেষে সেনাবাহিনী পুলিশ কন্ট্রোল রুমে প্রবেশ করে বিক্ষুব্ধ পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। পরে বেশ কয়েক ডজন পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
পুলিশ সূত্রে খবর, বেশ কয়েক বছর আগে কাশ্মীরের কোলগাম ও গান্দরবাল জেলাতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। অমরনাথ যাত্রা চলাকালীন ২০০২ সালে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা সম্পর্কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা বলছিলেন, "সেনাবাহিনীর এক মেজর বেশ কয়েকজন সেনা অফিসারকে নিয়ে জোর করে যাত্রীদের শিবিরে অস্ত্র নিয়ে ঢুকতে চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু শিবিরে অস্ত্র নিয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পুলিশ বলেছিল যে সেনা সদস্যদের অস্ত্রগুলি বাইরে জমা রাখতে হবে। সে কথা না শুনে সেনা সদস্যরা পুলিশ কর্মীদের মারধর করে। অনেক পুলিশ অফিসার মার খেয়ে বেশ কয়েক সপ্তাহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
সামরিক বাহিনী, পুলিশ এবং নিরাপত্তা বাহিনীগুলির বাড়াবাড়ি নিয়ে অনেক বছর ধরে মামলা লড়ছেন এমন একজন সিনিয়র আইনজীবী বিবিসিকে বলেছেন, সেনাবাহিনীকে সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যে আইনে, সেখানেই লুকিয়ে আছে পুলিশ আর সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষের মূল কারণ।
তিনি বলেন, “কাশ্মীরে আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট (আফস্পা) কার্যকর রয়েছে। এখানে নিযুক্ত প্রত্যেকটি সৈনিক জানে যে কেউ তার ক্ষতি করতে পারবে না। এ কারণেই কোনো কোনো সময়ে নিজেদের স্বার্থে তারা সাধারণ মানুষ বা পুলিশকেও টার্গেট করে। কারণ তারা জানে যে কোনো আদালত তাদের শাস্তি দিতে পারবে না।“
সূত্র: বিবিসি।
