সৌদি প্রবাসীদের ‘আকামার’ কান্না

আপডেট : ০২ জুন ২০২৪, ০৭:২০ পিএম

সৌদি আরবে কাজের প্রথম শর্ত আকামা তথা কাজের অনুমতিপত্র থাকা। আকামা না থাকলে তাকে অবৈধ ধরা হয়। এ শ্রমবাজারে বড় সমস্যা আকামা নবায়ন। এই জটিলতায় এগিয়ে বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকরা। দালাল ও সিন্ডিকেটের কারণে এই অবস্থা অসহনীয় অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে। দেশটিতে হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক আকামা সমস্যায় ভুগছেন। কারণ নতুনভাবে আকামা করতে গেলে বড় অংকের অর্থের প্রয়োজন।

নড়াইলের আব্দুল আলিম। দুই বছর আগে স্থানীয় দালাল পাঁচ লাখ টাকায় তাকে সৌদিতে পাঠান। চুক্তিমতে রেস্টুরেন্টে কাজ দিবেন। আকামার মেয়াদ থাকবে এক বছর। কিন্তু সৌদিতে যাওয়ার পর দেখলেন উল্টো চিত্র। এক বছরের পবিবর্তে দালাল আকামার মেয়াদ দেন মাত্র তিনমাস। আর রেস্টুরেন্ট নয় তাকে পাঠিয়েছেন ফ্রি ভিসায়। এই খবর শোনার পর তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েন। দালাল নির্দিষ্ট কাজ না দিয়ে তাকে একস্থানে আটকে রাখেন। 

পরে সেই স্থান থেকে পালিয়ে তিনি সৌদির জিজান শহরে যান। পরিচিত একজনের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। কিছুদিন পরেই তার আকামার মেয়াদ শেষ হয়। তিনি ওই দেশে অবৈধ হয়ে পড়েন। ওই দেশের প্রশাসন আকামার মেয়াদ না থাকলে যে কোন সময় গ্রেপ্তার করতে পারেন। তাই দিনের বেলা বাহিরে বের হতেন না। রাতে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কাজ করতেন। তবে সিদ্ধান্ত নিলেন নতুনভাবে আকামা করবেন। পরে পরিবার থেকে জমি বিক্রির ১০০০০ রিয়াল (বাংলাদেশি টাকায় ৩ লাখ ১২ হাজার টাকা) খরচ করে আকামা করেন। 

আব্দুল আলিম হয়তো বাড়িতে জমি থাকায় আকামা করতে পেরেছেন। কিন্তু হাজার হাজার প্রবাসী অর্থের অভাবে আকামা নবায়ন করতে পারেন না। তাই তাদের লুকিয়ে বাঁচতে হয়। এক সময় বাধ্য হয়ে পুলিশের কাছে ধরা দেন। ওই দেশের জেলে কিছুদিন থাকার পর শূণ্যহাতে দেশে ফিরেন। যতই সময় গড়াচ্ছে ততই সৌদিতে বাড়ছে আকামা জটিলতা। এর জন্য কাঁদতে হচ্ছে হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশিকে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বছরের জানুয়ারিতে আকামা নবায়নে নতুন সিদ্ধান্ত জারি করেছে সৌদি সরকার। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সৌদি আরবে প্রবেশের ৯০ দিনের মধ্যেই আকামা করতে হবে। নয়তো মূল টাকার সঙ্গে জরিমানা গুনতে হবে ৫০০ সৌদি রিয়াল। যা বাংলাদেশি সাড়ে ১৫ হাজার টাকা। সৌদিতে ৩ মাস, ৬ মাস, এক বছর ও পাঁচ বছরের জন্য আকামা করা যায়। কাজের ধরণ অনুযায়ী আকামা নবায়নে অর্থ নির্ধারিত আছে। তাই নির্দিষ্ট করে আকামা নবায়নে গড়ে কত টাকা প্রয়োজন এরকম তথ্য নেই।

বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) তথ্যমতে, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ৩৮ লাখ ৮৫ হাজার প্রবাসী রয়েছেন সৌদি আরবে। গত চার বছরে দেশটিতে গেছেন ১৬ লাখ ৬০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি। অন্যদিকে দেশটি থেকে প্রচুর সংখ্যক শ্রমিকরা দেশে ফিরছেন। যাদের অধিকাংশরই আকামা মেয়াদ না থাকায় জেল খেটেছেন। গত ২৭মে সৌদি আরবে জেল খেটে ১০৭ জন শ্রমিক দেশে ফিরেছেন। যাদের অধিকাংশই ফ্রি ভিসায় গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। আকামা মেয়াদ না থাকায় ওই দেশের পুলিশের কাছে আটক হয়ে কয়েক মাস জেলও খেটেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেল খেটে দেশে ফেরা এক শ্রমিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এক বছর আগে ঋণ করে সাড়ে চার লাখ দালালকে দিয়ে সৌদিতে যাই। দালাল আমাকে থাকা-খাওয়া ও কাজের নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু ওখানে যাওয়ার তিনি আমাকে এক কফিলের কাছে বিক্রি করে। ওই কফিল আমাকে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টার মত কাজ করিয়ে নিতেন। কিন্তু তেমন দিতেন না। এভাবে তিন মাস থাকার পর আমার আকামা মেয়াদ শেষ হয়। তখন তিনি আমাকে বের করে দেন। পরে দাম্মাম শহরে লুকিয়ে গাড়ি পরিষ্কারের কাজ করি। একদিন পুলিশ আমাকে আটক করে।

তিনি আর বলেন, শুধু আমি না সৌদির জেলে হাজার হাজার বাংলাদেশি আটক আছেন। যার মূল কারণ আকামা নবায়ন না করা। জেলে ৩ মাস অমানবিক সময় কাটিয়ে দেশে ফিরেছি। বিদেশগামী নতুন ভাইদের প্রতি আমার অনুরোধ, সবকিছু না জেনে বিদেশে যাবেন না।’  

তবে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী গেলেও দেশটি থেকে আয় ধারাবাহিকভাবে কমছে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে ৪৫৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা, যা পরের অর্থবছর ২০২২-২৩-এ ৩৭৬ কোটি ডলারে নেমে আসে। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১০ মাসে এ আয় আরও কমে ২১৬ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।

সৌদি আরবের জিজান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রবাসী এবং অভিবাসীবিষয়ক গবেষক ড. হোসাইন আহমেদ লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিদিন শত শত প্রবাসী আকামা-সংকটের সমাধানে সৌদি আরবে বাংলাদেশের দূতাবাসে ভিড় করেন। কিন্তু দূতাবাস থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা মিলেনা এমনটি অভিযোগ করেন। শ্রমিকদের প্রধান অভিযোগ, ঢাকা থেকে রিক্রুটিং এজেন্সি ও তাদের দালালরা প্রতারণা করে শ্রমিকদের সৌদিতে পাঠান। এখানে ১ হাজার বা তারও বেশি রিয়ালের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও দেওয়া হয় ৫০০ কিংবা ৭০০ রিয়াল। সৌদি আরবের প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের বড় একটি অংশ এখন অবৈধ। এ দেশের পুলিশের অভিযানে প্রায়শই বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হচ্ছেন।’ 

সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, আবাসন, শ্রম ও সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে চলতি মাসের এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজারের মতো বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত দুই বছরের বেশি সময়ের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চসংখ্যক গ্রেপ্তারের ঘটনা। গত ২৯ ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি মাস পর্যন্ত তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, আবাসন আইন লঙ্ঘনের দায়ে ১২ হাজার ৯৫১, সীমান্ত সুরক্ষা আইনে ৬ হাজার ৫৯২ এবং শ্রম আইনের আওতায় ৩ হাজার ৪৯৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর বসবাসের অনুমতিহীনতা এবং শ্রম ও সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের দায়ে ৪ হাজার ৬৯০ জন নারীসহ ৫৯ হাজার ৭২১ জনের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত প্রবাসীদের মধ্যে ৫২ হাজার ৮১৫ জনকে দেশে ফেরত পাঠানোর আগে ভ্রমণের প্রয়োজনীয় নথি জোগাড়ের জন্য কূটনৈতিক মিশনে পাঠানো হয়েছে। আরও ১ হাজার ৯৬৩ জনকে সৌদি আরব থেকে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের ৯ হাজার ১৭৯ জনকে সৌদি আরব থেকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সৌদি শ্রমবাজার যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তা এখনি সমাধান হওয়া জরুরি। কারণ দেশটিতে অবৈধ শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। একইসঙ্গে বাড়ছে জেলে যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শ্রমবাজারটিতে। আমার জানা মতে, ২০১৯ সালে ২৫ হাজার ৭৮৯ বাংলাদেশিকে সৌদি আরব থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। নতুন বছরে গত কয়েক মাসে হাজার হাজার কর্মী দেশে ফিরেছেন। ফেরত আসাদের বিবরণ প্রায় একইরকম। আকামা না থাকা, প্রতারিত হয়ে জেল খেটে দেশে ফেরা। এই অবস্থা থেকে উত্তোরণে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। প্রবাসীদের স্বার্থ সুরক্ষায় আরও বেশি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন।’ 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত