আনার হত্যা মামলা

নেপালে সিয়ামকে জেরা, তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা হঠাৎ বদলি

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৪, ০১:৩৫ এএম

সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনারকে অপহরণের পর হত্যার ঘটনায় ঢাকায় হওয়া মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা এডিসি শাহিদুর রহমানকে হঠাৎ করে বদলি করা হয়েছে। গতকাল রবিবার পুলিশ সদর দপ্তরের আদেশে তাকে বদলি করে বরিশাল জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওয়ারী বিভাগের এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

ডিবির এ কর্মকর্তা যখন আনার হত্যার ঘটনার তদন্তে নেপাল অবস্থান করছেন, তখনই পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তার বদলির প্রজ্ঞাপন হলো। একই প্রজ্ঞাপনে আরও ২২ কর্মকর্তাকে বদলি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর।

কলকাতায় গিয়ে এমপি আনার নিখোঁজের পর থেকেই ডিবি কর্মকর্তা শাহিদুর ঘটনাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন।

ইমিগ্রেশন আইনে সিয়ামকে দেশে ফেরানোর চেষ্টা : ডিবি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শাহিদুর রহমানের বিচক্ষণতা ও কর্মদক্ষতায় আনার হত্যার সঙ্গে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। তদন্তের কাজে ডিএমপির ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের সঙ্গে কলকাতাতেও গিয়েছিলেন। সেপটিক ট্যাংক থেকে মরদেহের খণ্ডিত অংশ উদ্ধারসহ তদন্তে সফলতা নিয়ে ফিরে আসেন তিনি। কলকাতা থেকে ফিরে এক দিনের ব্যবধানে এ ঘটনার তদন্তে গত শনিবার নেপাল গিয়েছেন হারুনের সঙ্গে শাহিদুরও।

এর আগে মতিঝিলে আওয়ামী লীগ নেতা টিপু হত্যার তদন্তেও মুনশিয়ানা দেখিয়েছিলেন ডিবি কর্মকর্তা শাহিদুর। বিদেশ থেকে আসামি ধরে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তিনি দক্ষতার পরিচয় দেন।

আনার হত্যার তদন্ত চলাকালে শাহিদুরের এ বদলি ঘিরে শুরু হয়েছে নানা গুঞ্জন। তবে ঠিক কী কারণে তাকে বদলি করা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, এটা নিয়মিত বদলি।

তবে ডিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বদলির তালিকা অনেক আগেই হয়েছিল। হয়তো সে তালিকাটিই আজ (গতকাল) পুলিশ প্রধান স্বাক্ষর করেছেন। শাহিদুর যে এমপি আনার হত্যার ঘটনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তদন্তে রয়েছেন, তা হয়তো চোখ এড়িয়েছে।’

আরেকটি সূত্র বলছে, এমপি আনারের একই জেলায় এডিসি শাহিদুরের বাড়ি। তার বদলিতে এটি ইস্যু হয়েছে কি না, তাও আলোচনায় রয়েছে।

গতকাল পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, শাহিদুরসহ ১১ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে বদলি করা হয়েছে। এ ছাড়া ১২ জন সহকারী পুলিশ সুপারকে একই আদেশে বদলি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর।

নেপালে সিয়ামকে জেরা ডিবি টিমের : সংসদ সদস্য আনার হত্যা মামলার তদন্তে নেপালে ব্যস্ত সময় পার করেছে ডিএমপির ডিবির তদন্ত দল। তারা সেখানে এমপি আনারের লাশের খণ্ডিত অংশ গুম করায় নেতৃত্ব দেওয়া সিয়ামকে জেরা করেছে এবং সেখানকার পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠকে সিয়ামকে বাংলাদেশে ফেরত আনতে নেপালি পুলিশের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

ডিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার বাসিন্দা সিয়াম হোসেন। কলকাতার নিউ টাউনের সঞ্জিভা গার্ডেনসের বাসা থেকে লাগেজভর্তি মরদেহের অংশ নিয়ে বের হন। হত্যাকাণ্ডের পর সিয়াম নেপালে গিয়ে আত্মগোপন করেন। ইন্টারপোলের মাধ্যমে সিয়ামকে গ্রেপ্তারের চিঠি দেয় বাংলাদেশ। কয়েক দিন আগে সিয়াম নেপালে আটক হন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১ জুন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদের নেতৃত্বে চার সদস্যের দলটি নেপাল পৌঁছায়। নেপালে গিয়ে ডিবির টিম সেখানকার আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে কথা বলেছে। ডিবি পুলিশের সদস্যরা সিয়ামকে দুই দফায় জেরা করেছেন। সেখানে তিনি লাশ গুমে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

তদন্ত দলের প্রধান হারুন অর রশীদ নেপাল থেকে সাংবাদিকদের জানান, নেপালে অবস্থানরত ডিবির তদন্ত দল কাঠমান্ডু পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করেছে। তারা সিয়ামকে দেশে ফেরাতে সহযোগিতা চেয়েছেন।

তদন্ত দলের একজন সদস্য জানান, সিয়াম নেপালের নাগরিক নন, তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্তও নন। তিনি ট্যুরিস্ট ভিসায় সেখানে গেছেন। সেই অনুযায়ী তাকে ফেরত দেওয়ার জন্য নেপাল পুলিশের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

এদিকে এমপি আনার হত্যার তদন্তের অংশ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের সিআইডি পুলিশের একটি দল কলকাতার ইএম বাইপাসসংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়েছে। ওই হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যেতেন এমপি আনার। চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য জানাতে তদন্ত টিম সেখানে যায়। তবে মে মাসে কলকাতায় যাওয়ার পর এমপি আনার ওই হাসপাতালে যাননি বলে কলকাতার পত্রিকা আনন্দবাজার জানিয়েছে।

অন্যদিকে আনার খুনের ঘটনায় তদন্তে রিমান্ডে থাকা কসাই জিহাদকে জেরা চলছে। তিনি বিভিন্ন ধরনের কথা বলে তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করতে চাইছেন। জিহাদ কলকাতার পুলিশকে জানিয়েছেন, আমানুল্লার নির্দেশে সিয়াম ঘটনার মাস দেড়েক আগে তাকে মুম্বাই থেকে রাজারহাটে নিয়ে এসেছিলেন। সেখানে হত্যার পরিকল্পনাকারী শাহীনের ভাড়া করা ফ্ল্যাটে রাখা হয়েছিল। বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হওয়া শিমুল এবং শিলাস্তি রহমানের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জিহাদকে জেরা করা হচ্ছে।

গত ১২ মে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যান ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ) আসনের আওয়ামী লীগের দলীয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার। সেখানেই রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন তিনি। ১৮ মে পশ্চিমবঙ্গের বরানগর থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন তার বন্ধু বরানগরের বাসিন্দা গোপাল বিশ্বাস। ২০ মে কলকাতার একটি ফ্ল্যাটে আনারকে হত্যা করে লাশ টুকরো টুকরো করার তথ্য জানায় ভারতীয় পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া ঘাতকদের স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায়, ১৩ মে দুপুরেই আনারকে হত্যা করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত